ঢাকা শুক্রবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৫

টেকসই কৃষির জন্য চাই জৈব বালাইনাশক


তুষার কান্তি রায়  photo তুষার কান্তি রায় 
প্রকাশিত: ২৮-৩-২০২৫ বিকাল ৫:৫৪

দেশের আঠারো কোটি জনগণের খাদ্য যোগান আসে কৃষি থেকে। কৃষিই আমাদের বড় সম্পদ বলার অপেক্ষা রাখেনা। বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে অল্প জমিতে অধিক ফসল উৎপাদনে নানামুখী প্রচেষ্টা চলছে। পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষা করতে ফসলের মাঠে প্রতিনিয়তই রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারে একদিকে যেমন ফসলের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশের উপস্থিতি পরিবেশ ও জনস্বাস্থের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়েছি। রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে মানুষের নানা ধরনের শারিরীক সমস্যা দেখা দিচ্ছে যা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক।দ জীববৈচিত্র্য হুমকীর সম্মুখীন হচ্ছে ফলে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক প্রজাতির জীব ও বিভিন্ন প্রকারের মাছ।

তাই ঘরোয়া পদ্ধতিতে সাশ্রয়ী উপায় জৈব বালাইনাশক তৈরি করে টেকসই কৃষির সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবী। হাতের কাছেই সমাধান আছে, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশের কৃষকে চিন্তা করার সাহস দিতে হবে যাতে দীর্ঘমেয়াদি ফসল সুরক্ষা নিশ্চিত সহ পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। "কৃষি বাঁচলে, বাঁচবে কৃষক, বাঁচবে এদেশের মানুষ। এমন ভাবনা কৃষক ও কৃষি সম্পৃক্ত সকলের প্রধান উপজীব্য হওয়ার উচিত। 

জৈব বালাইনাশক কীভাবে তৈরি করবেন? 

১. বিষ কাটালীর বিষে, পোকা মরবে নিমিষে?
কী কী উপকরন? 
বিষ কাটালী গাছ ১ কেজি, পাতাসহ নিসিন্দা গাছ ১ কেজি, কালোমেঘ গাছ ১/২ কেজি, নিম পাতা ১ কেজি, নিমের ছাল ১/২ কেজি, ভাটির পাতা ১ কেজি। মেহগনির ফল ১ কেজি, গরমর চুনা ১ কেজি, পানি ৫ কেজি।

প্রস্তুত পদ্ধতি:-
উপকরণগুলো কুচি কুচি করে কেটে পর্যায়ক্রমে নিসিন্দা, কালোমেঘ, বিষকাটালী, নিমপাতা ও ছাল, ভাটির পাতা, মেহগনির ফল মাটির পাত্রে ঢুকিয়ে তারপর ১ কেজি গরমর চুনা ও ৫-৭ কেজি পানি দিয়ে পলিথিন দিয়ে মুখ বেধে দিতে হবে। এরপর পাত্রটি ছায়া ও ঠান্ডাযুক্ত স্থানে ১৪ দিন রেখে দিতে হবে যাতে করে উপকরণ গুলো ভালভাবে পঁচে যায়। ৭ দিন পর প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি জৈব বালাইনাশকটি ব্যবহার উপযোগি হবে। প্রাকৃতিক গাছপালা দিয়ে তৈরি জৈব বালাইনাশক উপকরণগুলো ১৪ দিন পাত্রে পঁচানোর পর সেটা সংগ্রহ করে ছাকুনি দিয়ে ছেঁকে নিতে হবে। ছেঁকে নেওয়া রস বা জৈব বালাইনাশক সবজি বা ফসলে ব্যবহার করা যাবে। তবে নিদৃষ্ট মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। ৯ লিটার পানির সাথে ১ লিটার জৈব বালাইনাশক মিশিয়ে ফসলে বা সবজি জ়োতে ব্যবহার করতে পারবে।

কোন ধরনের পোকার উপর কাজ করবে?
সবজির কাটুই পোকা, ফল ও ডগাছিদ্রকারী পোকা।

২. মেহগনির ক্যারামতি

কী কী উপকরণ? 
২ থেকে ৩ কেজি মেহগনির বীজ, ১০ গ্রাম তুত, ৫ গ্রাম সোহাগা, কয়েকটি রসুনের কোয়া, ২০ গ্রাম ডিটারজেন্ট

তৈরি পদ্ধতি:-
৪০০-৫০০ গ্রাম মেহগনির ফল হতে প্রাপ্ত বীজ দশ লিটার পানিতে মিশিয়ে তাতে ১০ গ্রাম তুতিয়া, ৫ গ্রাম সোহাগা ও কয়েকটি রসুন কোয়ার গুড়া মিশ্রণ করে ৪০-৪৫ মিনিট উচ্চ তাপে ফুটিয়ে নিতে হবে। এমনভাবে ফুটাতে হবে যাতে ১০ লিটার মিশ্রণ কমে গিয়ে অর্ধেকে পরিনত হয। এরপর মিশ্রণটি ঠান্ডা করে নিতে হবে। এবার ছেকে নিয়ে ৫০ গ্রাম ডিটারজেন গুড়া মিশিয়ে দিতে হবে। এরপরে ২৫ লিটার পানির সাথে ৪০ শতক ব্যবহার করতে হবে। দুই থেকে তিন দিন পর ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

কোথায় প্রয়োগ করবেন? 
ধান ক্ষেতে সাত দিন পর পর তিন বার প্রয়োগ করলে ধানের মাজরা, পাতা মোড়া, শীষ কাটা লেদা পোকা নির্মূল করা সম্ভব। এছাড়াও ফুলকপি, বাঁধাকপি , ভুট্টা, টমেটো, শিম ও বরবটি ইত্যাদির লেদা পোকা, উইপোকা, পিঁপড়া, মশা দমন করা সম্ভব। এটা প্রয়োগে ক্ষেতে ইদুরের বিচরণ কমে যায়।

২. নিমের পাতা, নিমের ছাল ধরবে কৃষকের ফসলের হাল

কি কি উপকরণ?
নিমপাতা ৫০০ গ্রাম, নিমের ছাল ২৫০ গ্রাম, ১০ তুত, ৫ গ্রাম সোহাগা

তৈরি পদ্ধতি : 
নিম ভিত্তিক নির্যাস প্রস্তুত করতে হলে ৭৫০ গ্রাম পাতা এবং পরিত্যাক্ত ডালের ২৫০ গ্রাম ছাল বা বাকল ভালভাবে থেতলে নিতে হবে। তারপর ৫-৭ লিটার পানিতে থেতলানো নিমপাতা ছাল আগুনে গরম করতে হবে। পানি ফুটতে শুরু করলে ৫০ গ্রাম সাধারণ কাপড় কাঁচা সাবান, ১০ গ্রাম তুঁত, ৫ গ্রাম সোহাগা পর্যায়ক্রমে ঐ ফুটান্ত মিশ্রণে মিশাতে হবে। মিশ্রণটি ৪০-৫০ মিনিট ফোটানোর পর ঐ মিশ্রণ ঠান্ডা করে ছেঁকে নিতে হবে।
মিশ্রনের বিশ গুণ পরিমাণ পানির সাথে মিশিয়ে স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
কোথায় প্রয়োগ করবেন? 

এ বালাইনাশকটি পাতার যে কোন পোকা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনে বিশেষ ফলদায়ক।

খ। নিমের বীজ

উপকরণ:-
নিম বীজ ১ কেজি, ৭৫ গ্রাম গুড়া সাবান

প্রস্তুত পদ্ধতি :-
এক কেজি নিম বীজ ছায়ায় শুকিয়ে খোসা ছাড়িয়ে নিন। বীজ পিষে মলমের মত তৈরী করুন। এর সাথে ৭৫ গ্রাম গুড়া সাবান মিশান। মিশ্রণটি ১ শত লিটার পানি মিশালে ১% দ্রবণ তৈরি হবে। দ্রবণ এক রাত রেখে দিন। এরপর ৭০-৮০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ২/৩ ঘন্টা ফুটিয়ে ঠান্ডা করে ছেঁকে জমিতে ব্যবহার করুন। মিশ্রনটি সরাসরি স্প্রে করা যাবে।

কোথায় প্রয়োগ করবেন
এতে পাতা মোড়ানো পোকাসহ বিভিন্ন ধরণের কীড়া ও গান্ধী পোকা দমন করা যায়। এটি কৃমিনাশকের কাজ করে।

৪. মরিচের গুঁড়োর ঝাল, বাহক পোকার নাজেহাল। 

কি কি উপকরণ? 
শুকনা মরিচ গুড়া ১ শত গ্রাম, ৫০ গ্রাম গুড়া সাবান।

কীভাবে তৈরি করতে হবে? 
বিশ (২০)গ্রাম শুকনা মরিচের গুড়া ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ভিজিয়ে রাখুন। এতে ৫০ গ্রাম গুঁড়া সাবান মিশিয়ে ৫ লিটার পানি যোগ করুন এবং ছেকে স্প্রে করুন। মিশ্রনটি সরাসরি ব্যবহার করা যাবে

কারা দমন হবে?
শশার মোজাইক ভাইরাস রোগের বাহক, পিঁপড়া, জাব পোকা দমন হয

৫. "গাদা গাছের মূলের জালায়, গাছের কৃমি দুরে পালায়"
 
কী লাগবে? 
১ কেজি গাদা ফুলগাছের মূল

তৈরি পদ্ধতি:-
পরিস্কার শিকড় ১ কেজি সংগ্রহ করে টুকরো টুকরো করে কাটতে হবে। চুর্ন যন্ত্র দিয়ে এ শিকড় চুর্ন করার সময় সামান্য পানি মেশান যেতে পারে যাতে শিকড়ের রস সহজে বের হয। একটি কাপড়ে চিপে রস বের করতে হবে। ১ কেজি শিকড়ের রস ১০ লিটার পানি মিশাতে হবে।

প্রয়োগের স্থান:-
এ রস মেশানো পানি জমির মাটিতে সরাসরি স্প্রে (বীজ বপনের আগে জমিতে স্প্রে করা ভালো) করার উপযোগী। 

কার্যকারীতা: শিকড়ের গিট উৎপাদনকারী নিমাটোড


৬. ইপিল ইপিল ও জবার তেলেসমাতি , ছত্রাকের যাবে শশুর বাড়ী। 

উপকরণ:-
ইপিল ইপিল পাতা ১ কেজি, জবা ফুলের পাতা ১ কেজি

প্রস্তুত প্রণালী:-
এক (১) কেজি পরিস্কার ইপিল-ইপিল পাতা সংগ্রহ করে চুর্ণ করতে হবে। পাতার রস সহজে বের করার জন্য প্রয়োজনে সামান্য পানি মেশানো যেতে পারে। পাতার চুর্ণ একটি কাপড়ে নিয়ে চিপে রস সংগ্রহ করতে হবে। ইপিল ইপিল পাতার রস সংগ্রহের মতো জবা পাতার রস সংগ্রহ করতে হবে।

প্রয়োগ মাত্রা:-
১ কাপ ইপিল ইপিল পাতার রস ও ১ কাপ জবা পাতার রস ৩ লিটার পানিতে মিশাতে হবে। উল্লেখিত হারে মিশ্রন তৈরী করে স্প্রে করতে হবে।

প্রয়োগের ক্ষেত্র:-
ঝলসে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া, পাতায় দাগ লাগা, গাছে কালো দাগ রোগে কার্যকর।

৭. তামাক পাতা, শোষক পোকার হবে মাথা ব্যাথা।

কী কী উপকরণ? 
তামাক পাতা ১ কেজি

প্রস্তুত পদ্ধতি:-
এক কেজি তামাক পাতা ১৫ লিটার পানিতে সারা রাত ভিজিয়ে রেখে কচলিয়ে নিন। ছেকে ব্যবহার করুন অথবা বড় আকারের ১০ টি শুকনা পাতা ১০ লিটার পানিতে সারারাত ভিজিয়ে ছেকে নিয়ে ব্যবহার করুন। মিশ্রনটি সরাসরি ব্যবহার করা যাবে

কার উপর প্রয়োগ করবেন? 
শোষক পোকা- মাইট ও জেসিড দমন করা যায়।

কৃষিকে এগিয়ে নিতে জৈব বালাইনাশকের বিকল্প নেই বলে এদের প্রয়োগ বাড়ানো আসুগুরুত্বপূর্ণ। কৃষিকে সুরক্ষা দিন কৃষি আপনাকে সুস্থতা ও সচ্ছলতা৷ এনে দিবে।

লেখক:-তুষার কান্তি রায় 
সহকারী অধ্যাপক 
এগ্রিকালচারাল কেমিস্ট্রি বিভাগ
খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,খুলনা।

এমএসএম / এমএসএম