অধিক আসনের হিসাব না গ্রহণযোগ্য নির্বাচন- তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কোন পথে?
বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, অনাস্থা ও সংঘাতমুখর রাজনীতি পেরিয়ে দেশ এখন একটি সংবেদনশীল অন্তর্বর্তী সময় অতিক্রম করছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যেই প্রায় ৫১টি রাজনৈতিক দল মনোনয়ন জমা দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই নির্বাচন কি সত্যিকার অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে বিএনপি শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোয়, তার ওপর।
এটি ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ফলে জাতীয় রাজনীতি ও সামগ্রিক শান্তি পরিস্থিতির নিরিখে নির্বাচনটি কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে, সে বিষয়ে দেশ-বিদেশের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।
বাস্তবতা হলো, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি আর কোণঠাসা কোনো বিরোধী দল নয়। মাঠের রাজনীতি, জনসমর্থনের বিস্তার এবং ১৭ বছর পর তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনের পর দলটির জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি একটি শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
এই অবস্থান থেকেই রাজনীতির ভাষা ও কৌশলে পরিবর্তন আনা জরুরি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনপ্রিয়তার এই ধারা ধরে রাখতে হলে বিএনপিকে মেধা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ওপর ভর করেই এগোতে হবে। মনে রাখতে হবে, আন্দোলনের ভাষা আর সম্ভাব্য শাসক দলের ভাষা এক হতে পারে না। এখানে উত্তেজনার চেয়ে পরিমিতি, সংঘাতের চেয়ে দায়িত্বশীল আচরণই বেশি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য।
এই মুহূর্তে বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনআস্থা। মানুষ পরিবর্তন চায়, কিন্তু সেই পরিবর্তন যেন অস্থিরতা বা অনিশ্চয়তা ডেকে না আনে, এটাই সাধারণ মানুষের মূল প্রত্যাশা। তাই বিএনপির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও আস্থাভিত্তিক পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বিএনপি যদি স্বাভাবিক প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনআস্থার ভিত্তিতে ক্ষমতায় আসে, তাহলে দলটি প্রায় ২০০টির মতো আসনে জয়ী হতে পারে। কিন্তু যদি দলীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে মনোনীত প্রার্থীদের যেকোনো উপায়ে নির্বাচিত হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়, তাহলে আসনসংখ্যা হয়তো ২৪০–২৫০ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রশ্নে গুরুতর সংকট তৈরি হবে।
এখানেই নেতৃত্বের দূরদর্শিতার পরীক্ষা। তারেক রহমানের উচিত হবে জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে দলের প্রার্থীদের নির্বাচিত হয়ে আসার ওপর জোর দেওয়া। এতে বিএনপির কোনো ক্ষতি নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে এতে দলের রাজনৈতিক বৈধতা, জনআস্থা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তি আরও শক্ত হবে।
প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট করা কতটা প্রয়োজনীয়। বাস্তবতা হলো, একসময় এসব জোট আন্দোলনকে বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তখন বিএনপি মূলত রাজনৈতিক টিকে থাকার সংগ্রামে ছিল। কিন্তু আজ বাস্তবতা ভিন্ন।
বর্তমানে বিএনপি আর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেই; বরং সরকার গঠনের সম্ভাবনার খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। এই পর্যায়ে অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত জোট অনেক সময় সহায়তার চেয়ে চাপ হয়ে উঠতে পারে। আদর্শগতভাবে অস্পষ্ট বা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল দলগুলোর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সমঝোতা ভবিষ্যৎ সরকার পরিচালনায় নীতিগত ও কাঠামোগত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
এ কারণে জোটের প্রশ্নে এখন আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তববাদী, সংযত ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। নির্বাচনী কৌশল এবং সম্ভাব্য রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থ বিবেচনায় রেখে, কোন জোট কার্যকর এবং কোনটি দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে সতর্ক মূল্যায়নই হওয়া উচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক। এ নিয়ে আবেগী অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই। সহযোগিতা মানেই আত্মসমর্পণ- এই ধারণা রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর। বরং নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ন্যূনতম সহযোগিতা দেখানো বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় হবে। নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা- এই বিষয়গুলোতে সহযোগিতা করলে বিএনপির অবস্থান আরও শক্ত হবে।
এখানে নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমানের দিকে এখন কেবল দলীয় কর্মী-সমর্থকরাই নয়, সাধারণ মানুষ এবং আন্তর্জাতিক মহলও গভীরভাবে নজর রাখছে। সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার আচরণ, বক্তব্য ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তিনি যদি সংযত ও দায়িত্বশীল ভাষায় কথা বলেন, সংঘাতের পথ এড়িয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেন, তাহলে তা বিএনপির জন্য একটি শক্ত রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজ করবে। এতে শুধু দলের গ্রহণযোগ্যতাই বাড়বে না, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আস্থাও আরও দৃঢ় হবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত তারেক রহমানের নেতৃত্ব দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়িত হচ্ছে, যা বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে।
অনেকেই বলছেন, যেহেতু বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা বেশি, তাই এত সতর্ক হওয়ার দরকার কী? এখানেই মূল ভুলটা হয়। শক্ত অবস্থানে থাকা দলই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকে। কারণ বিতর্কিত নির্বাচন থেকে ক্ষমতায় এলে প্রথম দিন থেকেই সরকার বৈধতার সংকটে পড়ে। অন্যদিকে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করলে সেই সরকারের নৈতিক ভিত্তি অনেক শক্ত হয়। তখন বিরোধীদের প্রশ্ন তোলার সুযোগ কমে যায়, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থাও বাড়ে।
আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও এখানে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো বহুমুখী চাপে রয়েছে। বৈদেশিক সহায়তা, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি বাজার অনেকটাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে উন্নয়ন অংশীদাররা স্বস্তি পায়। তারা জানে, যে সরকার এসেছে সেটি জনগণের ভোটে এসেছে। এতে ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য কাজ করা সহজ হয়।
বিএনপির জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। দীর্ঘদিন পর দলটি এমন অবস্থানে এসেছে যেখানে ক্ষমতায় যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার বলে অনেকেই মনে করছেন। এই সুযোগ যেন অতি আত্মবিশ্বাসে নষ্ট না হয়। রাজনীতিতে ইতিহাস বলে, যারা জয়ের আগেই সংযম হারায়, তারা শেষ মুহূর্তে ভুল করে বসে।
জনগণ এখন আর প্রতিশোধের রাজনীতি চায় না। মানুষ চায় স্বস্তি, স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর শাসন। বিএনপি যদি এই বাস্তবতাটা বুঝে আচরণ করে, তাহলে দলটি শুধু ক্ষমতায়ই আসবে না, বরং একটি শক্তিশালী সরকারও গঠন করতে পারবে।
সবশেষে বলা যায়, এই সময়ে বিএনপির করণীয় খুব পরিষ্কার। উত্তেজনা কমানো, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আস্থা তৈরি করা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখা। যদি বিএনপি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে সহায়ক ভূমিকা রাখে, তাহলে সেই নির্বাচনের কৃতিত্ব শেষ পর্যন্ত বিএনপির ঝুলিতেই যাবে। ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক বৈধতাও আসবে।
রাজনীতিতে ক্ষমতা আসে-যায়, কিন্তু ইতিহাস মনে রাখে কে গণতন্ত্রকে শক্ত করেছে আর কে দুর্বল করেছে। বিএনপির সামনে এখন সেই ইতিহাসে ইতিবাচকভাবে নাম লেখানোর সুযোগ।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক।
Email: dubai.correspondent.kalbela@gmail.com
এমএসএম / এমএসএম
রাজনীতি মানেই কি ক্ষমতার লড়াই?
অধিক আসনের হিসাব না গ্রহণযোগ্য নির্বাচন- তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কোন পথে?
মামদানির ঐতিহাসিক অভিষেক ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ
বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান
ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ
জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো
পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়
ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়
বেগম খালেদা জিয়া: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস
স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে বিবেক ও নৈতিকতা
সংকট কালের স্থিতিশীল নেতৃত্বে তারেক রহমান
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তা: তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি