রাজনীতি মানেই কি ক্ষমতার লড়াই?
বর্তমানে রাজনীতি শব্দটি শুনলেই সাধারণ মানুষের মনে প্রথম যে ধারণাটি আসে তা হলো ক্ষমতা। ক্ষমতা অর্জন, ক্ষমতা ধরে রাখা এবং ক্ষমতা প্রয়োগ, এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে রাজনীতির প্রায় সব তত্ত্ব ও বাস্তবতা। আদর্শ, নীতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, উন্নয়ন, এসব শব্দ রাজনীতির অলংকার হলেও বাস্তব রাজনীতি প্রায়শই রক্ত-মাংসের ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়। ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ যখনই সংগঠিত সমাজ গঠন করেছে, তখনই রাজনীতি জন্ম নিয়েছে এবং সেই রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল ক্ষমতা। তাই আমি রাজনীতিকে ক্ষমতায় যাওয়ার একটি সিঁড়ি বলে মনে করছি। এটি শুধু একটি মতামত নয়, বরং ইতিহাস, দর্শন ও বাস্তবতার নির্যাস।
প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, মানুষ একটি রাজনৈতিক প্রাণী। কারণ মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে এবং সমাজ পরিচালনার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত কে নেবে, কীভাবে নেবে এবং কার স্বার্থে নেবে, এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই ক্ষমতার জন্ম। প্লেটোর “রিপাবলিক” গ্রন্থে আদর্শ রাষ্ট্রের কথা বলা হলেও সেখানে শাসকের ক্ষমতা প্রশ্নাতীত নয়। বরং তিনি এমন শাসক চেয়েছিলেন যিনি জ্ঞান ও নৈতিকতার মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। এখানেও ক্ষমতা ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়, শুধু তার ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক ছিল।
ক্ষমতার লড়াইয়ের বাস্তব রূপ সবচেয়ে নগ্নভাবে ধরা পড়ে ইতালীয় চিন্তাবিদ নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির লেখায়। তার বিখ্যাত গ্রন্থ “দ্য প্রিন্স”-এ তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, রাজনীতিতে নৈতিকতা নয়, টিকে থাকাই মুখ্য। ক্ষমতা অর্জনের জন্য শাসক প্রয়োজনে প্রতারণা করবে, নিষ্ঠুর হবে, মিথ্যা বলবে, সবই বৈধ, যদি তাতে ক্ষমতা ধরে রাখা যায়। ম্যাকিয়াভেলির এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক রাজনীতির ভিত্তি তৈরি করেছে। আজও বিশ্ব রাজনীতিতে আমরা তার প্রতিফলন দেখি।
ইউরোপের ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়, রাজনীতি ছিল মূলত রাজা-সম্রাটদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। রোমান সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে মধ্যযুগের রাজতন্ত্র, সবখানেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল একটি গোষ্ঠীর হাতে। ক্ষমতা দখলের জন্য যুদ্ধ হয়েছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ফরাসি বিপ্লবের আদর্শকে ব্যবহার করে নিজেই সম্রাটে পরিণত হয়েছিলেন। বিপ্লবের শ্লোগান ছিল স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা গিয়েছিল এক ব্যক্তির ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে।
ক্ষমতার লড়াই শুধু একনায়কতন্ত্রেই নয়, গণতন্ত্রেও বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো গণতন্ত্র বলা হয়, কিন্তু সেখানে রাজনীতি মূলত রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট, এই দুই দলের ক্ষমতার লড়াই। নির্বাচনের সময় আদর্শের কথা বলা হলেও বাস্তবে দেখা যায় লবিং, করপোরেট অর্থায়ন, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ ও জনমত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা।
রাশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, ভøাদিমির পুতিন দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকার জন্য সংবিধান পরিবর্তন করেছেন, বিরোধীদের দমন করেছেন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। এখানে রাজনীতি আর জনকল্যাণের বিষয় নয়, বরং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল। একইভাবে চীনে কমিউনিস্ট পার্টির একদলীয় শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের চূড়ান্ত উদাহরণ। আদর্শিকভাবে সমাজতন্ত্রের কথা বলা হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা একটি সংকীর্ণ গোষ্ঠীর হাতে আবদ্ধ।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিও ক্ষমতার লড়াইয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দাবিতে, কিন্তু বেশিরভাগ দেশেই তা পরিণত হয়েছে নতুন ক্ষমতার দ্বন্দ্বে। মিশরে হোসনি মুবারকের পতনের পর জনগণ ভেবেছিল গণতন্ত্র আসবে, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সামরিক বাহিনী আবার ক্ষমতা দখল করে। লিবিয়া ও সিরিয়ায় ক্ষমতার লড়াই গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়, যার খেসারত দেয় সাধারণ মানুষ।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিও ক্ষমতার লড়াই থেকে মুক্ত নয়। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হলেও সেখানে রাজনীতি ক্রমেই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার আধিপত্যের দিকে যাচ্ছে বলে সমালোচনা রয়েছে। পাকিস্তানের ইতিহাস মূলত সামরিক ও বেসামরিক শক্তির ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইতিহাস। শ্রীলঙ্কায় ক্ষমতার লড়াই গৃহযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল, যেখানে জাতিগত রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতার দ্বন্দ্ব ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।
আফ্রিকার অনেক দেশে রাজনীতি মানেই ক্ষমতার জন্য অস্ত্রধারী সংঘর্ষ। কঙ্গো, সুদান, নাইজেরিয়া, এই দেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। নির্বাচনের বদলে বন্দুক হয়ে উঠেছে ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম। এখানে রাজনীতি আর নীতির বিষয় নয়, বরং টিকে থাকার যুদ্ধ।
ক্ষমতার লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার। পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, এসব প্রতিষ্ঠান আদর্শভাবে জনগণের সেবা করার কথা, কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতাসীনরা এগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই রাষ্ট্রযন্ত্র দলীয়করণ হয়, তখনই রাজনীতি সহিংস ও দমনমূলক হয়ে ওঠে।
মিডিয়াও ক্ষমতার লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আধুনিক যুগে তথ্যই শক্তি। যে পক্ষ মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে পক্ষই জনমত গঠন করতে পারে। তাই দেখা যায়, অনেক দেশে ক্ষমতাসীনরা মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সমালোচকদের দমন করে। এটি প্রমাণ করে, রাজনীতি শুধু সংসদে নয়, বরং মনস্তত্ত্ব ও তথ্যের ক্ষেত্রেও ক্ষমতার লড়াই।
ক্ষমতার লড়াই রাজনীতিকে অনেক সময় নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত করে। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যেতে গিয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেন, ক্ষমতায় গিয়ে তা ভুলে যান। কারণ ক্ষমতা নিজেই এক ধরনের নেশা। লর্ড অ্যাক্টনের বিখ্যাত উক্তি, “ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে, আর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে”, আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
গণতন্ত্রের সংকট মূলত এই ক্ষমতার লড়াই থেকেই জন্ম নেয়। যখন নির্বাচন শুধু ক্ষমতা দখলের যন্ত্রে পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্রের আত্মা হারিয়ে যায়। ভোট কেনা, পেশিশক্তি ব্যবহার, বিরোধী দমন, এসবই ক্ষমতার লড়াইয়ের কুৎসিত দিক। এতে সাধারণ মানুষ রাজনীতির ওপর আস্থা হারায়।
তবুও রাজনীতি থেকে ক্ষমতাকে পুরোপুরি আলাদা করা সম্ভব নয়। কারণ ক্ষমতা ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না। প্রশ্ন হলো, সেই ক্ষমতা কীভাবে অর্জিত হবে এবং কীভাবে ব্যবহৃত হবে। যদি ক্ষমতা হয় জনগণের আস্থার ফল, আর তার ব্যবহার হয় জনস্বার্থে, তাহলে রাজনীতি হতে পারে মুক্তির পথ। কিন্তু যদি ক্ষমতা হয় ষড়যন্ত্র, দমন ও স্বার্থপরতার ফল, তাহলে রাজনীতি হয়ে ওঠে সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার।
অতএব, রাজনীতি মানেই ক্ষমতার লড়াই, এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সেই লড়াই কেমন হবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। ইতিহাস আমাদের শেখায়, অন্ধ ক্ষমতার লড়াই মানুষকে বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যায়। আর নৈতিকতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত ক্ষমতা সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে। রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কোন ধরনের ক্ষমতার লড়াইকে গ্রহণ করি তার ওপর, মানবিক না অমানবিক, গণতান্ত্রিক না স্বৈরাচারী।
বাংলাদেশের রাজনীতি বুঝতে গেলে প্রথমেই যে বাস্তবতাটি সামনে আসে তা হলো, এ দেশের রাজনীতি আদর্শের চেয়ে বেশি ক্ষমতাকেন্দ্রিক। স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্রক্ষমতা কে দখল করবে, কে ধরে রাখবে এবং কে রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করবে, এই প্রশ্নগুলোই রাজনৈতিক সংঘাতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। সংবিধান, গণতন্ত্র, নির্বাচন, উন্নয়ন, এসব বিষয় রাজনীতির ভাষায় বারবার উচ্চারিত হলেও বাস্তবে রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করেছে ক্ষমতার লড়াই।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি আদর্শিক সংগ্রামের মাধ্যমে, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই সেই আদর্শিক রাজনীতি দ্রুত ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র পরিচালনার চেয়ে ক্ষমতা দখলই হয়ে উঠেছিল মুখ্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতো রাষ্ট্রপ্রধান ও জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড শুধু ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার লড়াই কতটা নির্মম হতে পারে তার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক শাসনের পতন হলেও ক্ষমতার লড়াই থেমে যায়নি। বরং তা নতুন রূপ ধারণ করে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, এই দুই প্রধান দলের দ্বিদলীয় রাজনীতি মূলত পরিণত হয় শূন্য-সম ক্ষমতার খেলায়। এক পক্ষ ক্ষমতায় গেলে অন্য পক্ষকে রাজনীতির বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। সংসদ বর্জন, হরতাল, অবরোধ, সহিংস আন্দোলন, এসবই ছিল ক্ষমতা পুনর্দখলের হাতিয়ার। এখানে রাজনীতি আর জনগণের কল্যাণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং “আমরা না থাকলে কেউ থাকবে না”, এই মানসিকতায় পরিণত হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে সেই ব্যবস্থার বিলুপ্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার লড়াইয়ের আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক মূলত এই প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত, ক্ষমতায় কে থাকবে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আদর্শিকভাবে গণতন্ত্রের ভিত্তি হলেও বাস্তবে নির্বাচন অনেক সময় ক্ষমতা বৈধ করার প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। ফলে জনগণের ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, আর রাজনীতির ওপর মানুষের আস্থা ক্রমেই কমেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার ক্ষমতার লড়াইকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, এই প্রতিষ্ঠানগুলো আদর্শভাবে নিরপেক্ষ থাকার কথা হলেও বাস্তবে প্রায়ই ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষার অভিযোগে জড়িয়েছে। বিরোধী দমন, রাজনৈতিক মামলা, গুম-খুনের অভিযোগ, এসব বিষয় রাজনীতিকে নৈতিক সংকটে ফেলেছে। এতে করে রাজনীতি হয়ে উঠেছে ভয় ও দমননির্ভর, যেখানে ক্ষমতা হারানো মানেই অস্তিত্ব সংকট।
মিডিয়া ও সুশীল সমাজও এই ক্ষমতার লড়াইয়ের বাইরে নয়। ক্ষমতাসীনদের অনুকূলে থাকা মিডিয়া যেমন প্রশ্রয় পায়, তেমনি সমালোচনামুখর গণমাধ্যম ও সাংবাদিকরা চাপের মুখে পড়েন, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে রাজনীতি শুধু ক্ষমতার জন্য দলগুলোর মধ্যে লড়াই নয়, বরং সত্য ও তথ্য নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়েও পরিণত হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের রাজনীতি পুরোপুরি অন্ধকার, এ কথা বলা যাবে না। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, সামাজিক আন্দোলন, ছাত্র ও শ্রমিক রাজনীতি, এসব ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ রাজনীতিকে মাঝে মাঝে নতুন দিশা দেখিয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে রাজনীতি শুধু ক্ষমতাসীন দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জনগণও রাজনৈতিক শক্তি হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই গণআন্দোলনগুলো শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে টেকসই পরিবর্তন আনতে পারেনি।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়া। সব ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কুক্ষিগত থাকায় ক্ষমতা দখলের লড়াই চরম রূপ নেয়। যদি স্থানীয় সরকার, সংসদ ও প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হতো, তাহলে ক্ষমতার লড়াই এতটা বিধ্বংসী হতো না। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় রাজনীতি হয়ে উঠেছে সর্বগ্রাসী।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতি আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার দ্বারা বেশি নিয়ন্ত্রিত। এখানে ক্ষমতায় থাকা মানে শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা নয়, অর্থনীতি, প্রশাসন, এমনকি সামাজিক মর্যাদাও নিয়ন্ত্রণ করা। তাই ক্ষমতা হারানোর ভয় রাজনীতিকে সহিংস, অসহিষ্ণু ও প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তোলে।
তবুও ভবিষ্যৎ পুরোপুরি আশাহীন নয়। যদি রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাকে লক্ষ্য নয়, বরং দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে; যদি নির্বাচন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করা যায়; যদি বিরোধী মতকে শত্রু না ভেবে গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখা হয়, তবে বাংলাদেশের রাজনীতি ক্ষমতার লড়াই থেকে ধীরে ধীরে জনকল্যাণের পথে ফিরতে পারে। প্রশ্ন হলো, সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সদিচ্ছা কবে এবং কার মাধ্যমে আসবে।
তবে, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়, সঠিক পথে পরিচালিত হলে এটি একটি জাতির উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। ইতিহাসের প্রতিটি গণতান্ত্রিক অর্জনের পেছনেই ইতিবাচক রাজনীতির ভূমিকা রয়েছে।
প্রথমত, রাজনীতি জনগণের কণ্ঠস্বর প্রকাশের পথ। মানুষের আশা আকাক্সক্ষা, দাবি ও অধিকার রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম রাজনীতি। ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, এসব রাজনীতির মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনায় শৃঙ্খলা ও দিকনির্দেশনা দেয়। আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, প্রশাসনিক কাঠামো গঠন, সবকিছুই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। সঠিক রাজনীতি ছাড়া একটি রাষ্ট্র বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হয়।
তৃতীয়ত, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাজনীতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈষম্য কমানো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা, নারী ও সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়ন, এসবই ইতিবাচক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল।
চতুর্থত, রাজনীতি নেতৃত্ব তৈরি করে। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে দূরদর্শী, সাহসী ও মানবিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। রাজনীতির মাধ্যমেই সেই নেতৃত্ব বিকশিত হয়, যারা সংকটে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং জনগণকে পথ দেখায়।
পঞ্চমত, রাজনীতি উন্নয়ন ও অগ্রগতির চালিকাশক্তি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, শিল্পায়ন, এই সব খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়। উন্নত দেশগুলো প্রমাণ করেছে, সুস্থ রাজনীতি উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
ষষ্ঠত, রাজনীতি গণতান্ত্রিক চর্চা ও সহনশীলতা শেখায়। ভিন্নমতকে সম্মান করা, আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন, এসব গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রাজনীতির ইতিবাচক দিক।
সপ্তমত, রাজনীতি জাতীয় ঐক্য গঠনে ভূমিকা রাখে। সংকটময় মুহূর্তে রাজনীতি মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করাতে পারে। স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম, সবই রাজনৈতিক ঐক্যের ফল।
অষ্টমত, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রের অবস্থান সুদৃঢ় করে রাজনীতি। কূটনীতি, বৈদেশিক সম্পর্ক, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, এসব ক্ষেত্রেও ইতিবাচক রাজনৈতিক নেতৃত্ব অপরিহার্য।
সবশেষে বলা যায়, রাজনীতি খারাপ নয়; খারাপ হলো রাজনীতির অপব্যবহার। নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও জনস্বার্থকে কেন্দ্র করে পরিচালিত রাজনীতি একটি দেশকে আলোকিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে পারে। তাই রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করা প্রয়োজন। বর্তমান অপরাজনীতির খেলার ক্ষমতার লড়াই থেকে বের হয়ে শুদ্ধ ও মানবিক রাজনীতি গড়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।
এমএসএম / এমএসএম
রাজনীতি মানেই কি ক্ষমতার লড়াই?
অধিক আসনের হিসাব না গ্রহণযোগ্য নির্বাচন- তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কোন পথে?
মামদানির ঐতিহাসিক অভিষেক ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ
বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান
ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ
জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো
পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়
ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়
বেগম খালেদা জিয়া: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস
স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে বিবেক ও নৈতিকতা
সংকট কালের স্থিতিশীল নেতৃত্বে তারেক রহমান
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তা: তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি