বিতর্ক থেকে বিবর্তন: তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তর
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা। প্রায় ১৭ বছর প্রবাসে থাকার পর দেশে তাঁর ফেরা কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের পুনর্মূল্যায়নের এক অনন্য মুহূর্ত। ২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর, এক অস্থির সময়ে ষড়যন্ত্রের ছায়ায় মাতৃভূমির মাটি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন তিনি। এরপর কেটে যায় ১৭ বছর ৩ মাস ১৪ দিন, যেখানে দূরত্ব থাকলেও বাংলাদেশ ছিল তাঁর শ্বাসে, জনগণ ছিল তাঁর স্বপ্নে, গণতন্ত্র ছিল তাঁর অঙ্গীকারে।
অবশেষে, অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর গুনে ও সংগ্রামের ইতিহাস বয়ে নিয়ে, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তিনি ফিরে আসেন বাংলার বুকে, এক নেতা, এক প্রত্যয়, এক অসমাপ্ত স্বপ্নের উত্তরাধিকারী হিসেবে। এই প্রত্যাবর্তন নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে: তারেক রহমান কি সত্যিই রাজনৈতিকভাবে রূপান্তরিত হয়েছেন, নাকি এটি কেবল সময় ও বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি সূক্ষ্ম কৌশল?
তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ঘটে ২০০১–২০০৬ সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়। সে সময়ে তিনি দলীয় কাঠামোর বাইরে থেকেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছিলেন- এমন অভিযোগ তার বিরোধীদের পাশাপাশি কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মধ্যেও ছিল। ‘হাওয়া ভবন’কে ঘিরে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব এবং দুর্নীতির অভিযোগ তার রাজনৈতিক পরিচয়কে বিতর্কিত করে তোলে। এই সময়ে তাকে প্রায়শই ১৯৭০-এর দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করা হত, যখন শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর এক ধরনের কেন্দ্রীয়কৃত রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই তুলনায়, তারেক রহমানের সময়কার ক্ষমতার ব্যবহারকে অনেকেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং দলীয় প্রাধান্যবোধমূলক হিসেবে দেখেন।
২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা, গ্রেপ্তার এবং একাধিক মামলার মধ্যে দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। বিদেশে চিকিৎসার অজুহাতে অবস্থান শুরু করার পর দীর্ঘ নির্বাসন শুরু হয়। এই নির্বাসন শুধুমাত্র ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির সরাসরি বাস্তবতা থেকে এক ধরনের বিচ্ছেদও। বিএনপির কর্মকাণ্ড ও সংগঠন তখন একে একে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। ২০০৮ সালে নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলটির কার্যক্রম সীমিত এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়।
নির্বাসিত অবস্থায় তারেক রহমান দল পরিচালনার জন্য প্রযুক্তি ও ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন। স্কাইপ, জুম ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখেন। যদিও এটি কার্যকর নেতৃত্বের বিকল্প নয়, তবু এটি দলের ভেঙে পড়া রোধ এবং রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রসঙ্গে অনেকে ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির রাজনৈতিক পুনর্গঠনকে স্মরণ করেন, যখন দলের অনেক নেতা দেশের বাইরে অবস্থান করেও দলীয় নেতৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন এখানে প্রতিফলিত হয়।
নির্বাসনের সময় তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আগের সময়ের বিতর্কিত ঘনিষ্ঠজনদের জায়গায় ধীরে ধীরে গবেষণা, নীতি বিশ্লেষণ ও কৌশলভিত্তিক পরামর্শদাতা দলের উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়। তার বক্তব্যে তুলনামূলক সংযত ভাষা, প্রাতিষ্ঠানিক শব্দচয়ন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর লক্ষ্য করা যায়। এটি রাজনৈতিক বিবর্তনের ইঙ্গিত, নাকি কেবল ইমেজ পুনর্গঠনের কৌশল, প্রশ্নটি এখনও উন্মুক্ত। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে দেখা যায়, দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা নেতাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন ১৯৯০-এর দশকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পতনের পর দেশের অনেক প্রাক্তন নেতা সংযমী রাজনৈতিক চর্চার দিকে এগিয়েছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনের দিক থেকে এই সময়টি তারেক রহমানের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। ভাই আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু, মায়ের দীর্ঘ অসুস্থতা ও কারাবাস এবং পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যু, এগুলি তার রাজনৈতিক আচরণে প্রভাব ফেলেছে। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা মনে করেন, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি একজন রাজনীতিককে সংযত, বাস্তববাদী এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় দক্ষ করতে পারে। এই দিক থেকে তারেক রহমানের বর্তমান আচরণকে একটি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় হিসেবে দেখা যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সংযত রাজনৈতিক শিষ্টাচার, মূল্যবোধ এবং দেশের জনগণের কল্যাণে পরিকল্পনার দৃষ্টিভঙ্গি তার পারিবারিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পর্কিত। জন্মকাল থেকেই তিনি এমন পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন যেখানে তার বাবা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, কঠোর নীতি ও শৃঙ্খলার প্রতি গুরুত্বারোপকারী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, এবং তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, নীতিনিষ্ঠা ও দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এই প্রভাব তারেক রহমানের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের ধারা আংশিকভাবে গঠন করতে সাহায্য করেছে, যা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার ভূমিকার প্রাসঙ্গিকতা বাড়িয়ে দেয়।
দেশে ফিরে বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের কিছু আচরণ রাজনৈতিক মহলে সরাসরি নজর কাড়ে। বিমানবন্দরে প্রথমেই রাষ্ট্রের প্রধান উপদেষ্টাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানান, যা বিনয় ও কৃতজ্ঞতার একটি পাঠ হিসেবে ধরা হচ্ছে। মাতার অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রথমে জনগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, প্রমাণ করে নেতৃত্বে জনসেবাকে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। এরপর ৫০ লাখেরও বেশি জনতার উপস্থিতিতে মঞ্চে সাধারণ চেয়ারে বসে বক্তৃতা দিয়ে ঐক্যের আহ্বান জানান এবং দেশের জন্য পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি দেন।
মায়ের জানাজায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং অতীত নিয়ে প্রতিহিংসামূলক মন্তব্য এড়িয়ে চলা, এসব পদক্ষেপ রাজনৈতিক কৌশলের পাশাপাশি সচেতন বার্তা হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, এই আচরণ ১৯৭২ সালের শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে তুলনীয়।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে আচরণগত পরিবর্তন সবসময় স্থায়ী হয় না। ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান, জনসমর্থনের চাপ এবং দলীয় বাস্তবতা নেতার সিদ্ধান্ত ও আচরণ পুনরায় প্রভাবিত করতে পারে। এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিএনপি কতটা প্রতিষ্ঠাননির্ভর হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কতটা স্বচ্ছ ও সমষ্টিগত হবে, এবং ভিন্নমতের জন্য কতটা জায়গা থাকবে, এসবই তার রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারণ করবে।
সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সহনশীল ও সংলাপনভিত্তিক ভাষা ছাড়া বড় কোনো রাজনৈতিক শক্তির গ্রহণযোগ্যতা অর্জন কঠিন। অন্যদিকে সমর্থকরা যুক্তি দেন, দীর্ঘ নির্বাসন ও অভিজ্ঞতা তাকে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে শিখিয়েছে।
সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, তারেক রহমান বর্তমানে একটি রূপান্তরপর্বে অবস্থান করছেন। অতীতের বিতর্ক, বর্তমানের সংযম এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা- এই তিনটি উপাদান মিলেই তার রাজনৈতিক পরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করছে। এই পরিবর্তন কৌশলগত না বাস্তব, তা নির্ভর করবে তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নেতৃত্বের ধরন এবং ক্ষমতার প্রয়োগের পদ্ধতির ওপর।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নেতৃত্বের প্রভাব দীর্ঘ। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব এবং খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পথচলার উদাহরণ থেকে দেখা যায়, ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক সংস্কার না থাকলে বৃহৎ জনপ্রিয়তাও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। সেই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের বর্তমান বিবর্তন যদি সত্যিই প্রতিষ্ঠাননির্ভর, সংযমী ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় রূপ নেয়, তবে তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তর বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ধরা হবে। ইতিহাস, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তিনি যে নতুন রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা গ্রহণ করেছেন, তা আগামী বছরগুলোতে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও নেতৃত্বের মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক।
এমএসএম / এমএসএম
বিতর্ক থেকে বিবর্তন: তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তর
কুয়েত দূতাবাস সহ মধ্যপ্রাচ্য দূতাবাস গুলো সংস্কার অতি জরুরি
রাজনীতি মানেই কি ক্ষমতার লড়াই?
অধিক আসনের হিসাব না গ্রহণযোগ্য নির্বাচন- তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কোন পথে?
মামদানির ঐতিহাসিক অভিষেক ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ
বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান
ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ
জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো
পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়
ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়
বেগম খালেদা জিয়া: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস
স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে বিবেক ও নৈতিকতা