ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

অকুতোভয় সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা: ২২ বছরেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল পরিকল্পনাকারীরা


মানিক লাল ঘোষ photo মানিক লাল ঘোষ
প্রকাশিত: ১৪-১-২০২৬ দুপুর ২:৫৪

​শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় উচ্চারিত এক অকুতোভয় কলমযোদ্ধার নাম মানিক সাহা। তিনি একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং নিবেদিতপ্রাণ মানবাধিকারকর্মী। ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবের অদূরে পৈশাচিক বোমা হামলায় জীবনপ্রদীপ নিভে যায় সময়ের এই সাহসী সন্তানের। তাঁর প্রয়াণে দেশবাসী হারিয়েছে এমন এক দেশপ্রেমিক নাগরিককে, যার চিন্তা ও চেতনার পুরোটাই জুড়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধ, সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।
​​মানিক সাহা ছিলেন আন্তর্জাতিক সততা পুরস্কারে (Transparency International) ভূষিত দেশের একমাত্র সাংবাদিক। মৃত্যুকালে তিনি দৈনিক সংবাদ ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর খুলনার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এবং বিবিসি বাংলার খণ্ডকালীন সংবাদদাতা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কেবল সংবাদকর্মী হিসেবেই নয়, সাংবাদিকদের নেতা হিসেবেও তিনি ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য। খুলনা প্রেসক্লাব ও খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে তিনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গণমাধ্যমকর্মীদের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়াও দেশের প্রথম বেসরকারি টেলিভিশন ‘একুশে টেলিভিশন’-এর যাত্রা লগ্ন থেকে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এর খুলনা বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।
​​মানিক সাহার সাহসিকতার শিকড় ছিল ছাত্র রাজনীতিতে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত, তখন জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসন উপেক্ষা করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত পোস্টার লাগানোর কর্মসূচি নেয়। খুলনার বিএল কলেজ চত্বরে পোস্টার লাগানোর সময় আটক হন মানিক সাহা। সামরিক আদালতের বিচারে তাকে ২২ মাস কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেই তিনি স্নাতক পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও তিনি চরম নির্যাতন ও দীর্ঘ কারাবাসের শিকার হন।
​​আইন শাস্ত্রে ডিগ্রি ও বার কাউন্সিলের সনদ থাকা সত্ত্বেও তিনি বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশাকে। দুই দশকের পেশাগত জীবনে তিনি বারবার লোনা পানির পরিবেশবিনাশী চিংড়ি চাষ এবং ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। প্রভাবশালী মহলের কোনো প্রলোভন বা রক্তচক্ষু তাকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। ২০০১-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের লোমহর্ষক চিত্র বিবিসি রেডিওতে তাঁর কণ্ঠেই দেশবাসী নিয়মিত শুনেছে।

​হত্যাকাণ্ডের এক যুগ পর ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর আদালত ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেও সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ রয়েই গেছে। জনশ্রুতি রয়েছে, তৎকালীন তদন্তকারী সংস্থা ও পুলিশের ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থের জোগানদাতা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের নাম বাদ পড়ায় এই রায়কে প্রকৃত বিচার হিসেবে গ্রহণ করতে পারছেন না সাংবাদিক সমাজ ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

​মানিক সাহা বিশ্বাস করতেন, সাংবাদিকরা সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল। আজ তাঁর ২২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশবাসীর দাবি—নতুনভাবে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা ‘রাঘববোয়ালদের’ আইনের আওতায় আনা হোক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অতন্দ্র প্রহরী মানিক সাহার খুনিরা মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াবে, এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাঁর স্মৃতি অম্লান থাকুক আগামীর সাহসী সাংবাদিকতার অনুপ্রেরণা হয়ে।

​( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)

এমএসএম / এমএসএম

সীমান্তে রক্তপাত ও পুশইন আর মুখে বন্ধুত্বের বুলি: এই দ্বিচারিতার শেষ কোথায়?

বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও টেকসই উন্নয়ন

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়

​বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?

লেখকের কষ্ট

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান