ঢাকা শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬

শবে মেরাজের তাজাল্লি ও জিব্রাইল (আ.) এর সীমা: এক গভীর ও বিস্ময়কর সত্য!


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ১৬-১-২০২৬ দুপুর ৩:৫২

পবিত্র শবে মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে এক অতুলনীয় অধ্যায়। এটি শুধু একটি অলৌকিক সফরের বর্ণনা নয়, বরং নবুয়তের মর্যাদা, ফেরেশতাদের সীমা এবং মানুষের জন্য নির্ধারিত আল্লাহর নৈকট্যের সম্ভাবনা সম্পর্কে গভীর সত্যের প্রকাশ। এই রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন এক স্তরে পৌঁছান, যেখানে প্রধান ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.)-ও থেমে যান। এখানেই প্রকাশ পায় শবে মেরাজের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক, তাজাল্লি ও সীমার পার্থক্য।

ইসলামি চিন্তাবিদ ও আহলে সুন্নাত আলেমদের ভাষায়, শবে মেরাজের তাজাল্লি বলতে বোঝানো হয় আল্লাহ তায়ালার এমন এক বিশেষ নূরানি প্রকাশ, যা সৃষ্টিজগতের স্বাভাবিক নিয়ম ও উপলব্ধির বহু ঊর্ধ্বে। এটি কোনো সাধারণ নূর বা প্রতীকী আলো নয়; বরং এটি ছিল আল্লাহর কুদরত, মহিমা ও নৈকট্যের এক অতুলনীয় প্রকাশ, যেখানে মানব বোধগম্যতা থমকে যায়। মানব ইতিহাসে এই সম্মান একমাত্র নবী মুহাম্মদ ﷺ-ই লাভ করেছেন। মেরাজের সফরে তিনি সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত প্রধান ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.)-এর সঙ্গেই অগ্রসর হন, কিন্তু এরপর এমন এক স্তরে উপনীত হন, যেখানে প্রবেশ করার ক্ষমতা কোনো ফেরেশতার নেই। সেই মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি কেবল নবুয়তের মর্যাদা নয়, বরং আল্লাহর বিশেষ নির্বাচনের সর্বোচ্চ প্রকাশ।

সাধারণ মুসলমানের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তাহলে “জিব্রাইল কিসের তেজে পুড়িয়া যাইবে?”
এ কথা কখনোই আক্ষরিক আগুনে দগ্ধ হওয়া বোঝায় না। এটি মূলত একটি গভীর তাত্ত্বিক ও মারেফতী বাস্তবতার ইঙ্গিত। জিব্রাইল (আ.) নূরের সৃষ্টি হলেও তিনি সৃষ্টিজগতের অন্তর্ভুক্ত। আর মেরাজের সেই স্তরে ছিল আল্লাহ তায়ালার যাতী তাজাল্লি, অর্থাৎ এমন এক সত্তাগত নূরানি প্রকাশ, যা কোনো মাখলুক তার নিজস্ব অস্তিত্ব বজায় রেখে সহ্য করতে পারে না। তাই জিব্রাইল (আ.) বলেন, “আমি এখান থেকে এক কদমও এগোলে জ্বলে ছাই হয়ে যাব।” এর অর্থ এই নয় যে তিনি ধ্বংস হয়ে যাবেন, বরং তাঁর সত্তা সেই স্তরের তাজাল্লি ধারণের ক্ষমতার বাইরে।

মারেফতী আলেমরা বলেন, এখানে “পুড়ে যাওয়া” বলতে বোঝানো হয়েছে সৃষ্টিগত সীমার বিলয়। অর্থাৎ সেই নৈকট্যে প্রবেশ করলে ফেরেশতার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব টিকে থাকবে না। আর আল্লাহ যাকে নিজ বিশেষ অনুগ্রহে রক্ষা করেন, কেবল তাকেই সেখানে পৌঁছার অনুমতি দেন।

এইখানেই মেরাজের ঘটনা রাসূল ﷺ-এর মর্যাদার অনন্য প্রমাণ হয়ে ওঠে। তিঁনি মানুষ হয়েও এমন এক নৈকট্য লাভ করেছেন, যা ফেরেশতাদের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। কারণ নবীজি ﷺ কেবল একজন মানুষ নন, বরং তিনি নূরে মুহাম্মদী-এর বাহক, সেই প্রথম নূর যার মাধ্যমে আল্লাহ সৃষ্টি জগতের সূচনা করেছেন। মারেফতের ভাষায় বলা হয়, ফেরেশতা নূরের সৃষ্টি হলেও তারা সীমাবদ্ধ নূর, আর মুহাম্মদ ﷺ হলেন সেই নূর, যাকে আল্লাহ নিজের নৈকট্যের জন্য বিশেষভাবে নির্বাচিত করেছেন। এখানেই মেরাজ মানুষের মর্যাদা নয়, বরং মুহাম্মদী সত্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ।

এ বিষয়ে আরও সংক্ষেপে বললে, বলা যায় শবে মেরাজের তাজাল্লি হলো আল্লাহর সর্বোচ্চ নূরানি প্রকাশ, আর জিব্রাইল (আ.) “পুড়ে যাওয়ার” কথা বলেছেন সেই অসীম তাজাল্লির সামনে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা বোঝাতে।

ইসরা ও মেরাজ হযরত মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও মুজিজা। এক রাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে প্রথম মসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়া হয়, মসজিদুল আকসা থেকে উর্ধ্বজগৎ ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হয়। মক্কা থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত নবিজির (সা.) রাতের ভ্রমণ ইসরা নামে এবং মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে উর্ধ্বাজগৎ ভ্রমণ মেরাজ নামে পরিচিত।

মক্কার কাফেরদের অসহযোগিতা, অত্যাচার ও নির্যাতনে তিনি তখন পর্যুদস্ত। অল্প সময়ের ব্যবধানে শ্রদ্ধেয় চাচা আবু তালিব ও প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজার (রা.) মৃত্যুতে শোকাহত ও অসহায় হয়ে পড়েছেন। এ রকম সময় এক রাতে জিবরাইল (আ.) তাকে বোরাকে চড়িয়ে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যান। তখনকার সাধারণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় মসজিদুল আকসায় যেতে কয়েক দিন লেগে যেতো। কোরআনে সুরা ইসরায় এ ঘটনার বর্ণনা এসেছে এভাবে, 
“পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সুরা ইসরা: ১)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায় ইসরা ছিল মহান আল্লাহর এক অলৌকিক নিদর্শন ও ক্ষমতার প্রকাশ। তিনি রাতের বেলা তার বান্দাকে মক্কা থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে গিয়েছিলেন তার বিভিন্ন নিদর্শন দেখাতে। এ আয়াত থেকে আরও বোঝা যায় মসজিদুল আকসা সংলগ্ন অঞ্চল বরকতময়।

ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে মেরাজ কোনো কল্পনা বা স্বপ্ন নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে বাস্তব ও নিয়ন্ত্রিত এক মহান নিদর্শন।

সুফি দার্শনিক আল্লামা জালালুদ্দিন রুমী (রহ.) মেরাজের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করেছেন প্রেম ও নৈকট্যের দৃষ্টিকোণ থেকে। তার মতে, জিব্রাইল (আ.) ছিলেন জ্ঞান ও নূরের প্রতিনিধি, আর মুহাম্মদ ﷺ ছিলেন ইশক ও আল্লাহর নৈকট্যের প্রতিনিধি। জ্ঞান একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত নিয়ে যায়, কিন্তু ইশক সেই সীমা অতিক্রম করে।

রুমীর ভাষায় ভাবার্থ দাঁড়ায়, “ফেরেশতা ডানা দিয়ে উড়ে একটি সীমা পর্যন্ত যেতে পারে, কিন্তু প্রেমিক হৃদয় নিয়ে সীমাহীন পথ অতিক্রম করে।”

তাহলে দেখা যাচ্ছে শবে মেরাজ আমাদের শেখায় যে, আল্লাহ যাকে চান, তাকেই তাঁর নৈকট্যের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছান। এটি মানবজাতির জন্য আশার বার্তা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফরজ হওয়াও প্রমাণ করে যে, মুমিনের দৈনন্দিন ইবাদতেই মেরাজের প্রতিফলন রয়েছে।

শবে মেরাজের তাজাল্লি আল্লাহর সর্বোচ্চ নূরানি প্রকাশের প্রতীক। জিব্রাইল (আ.)-এর থেমে যাওয়া ফেরেশতার সীমা ও রাসূল ﷺ-এর মর্যাদার পার্থক্য স্পষ্ট করে। এই ঘটনা শুধু অতীতের কাহিনি নয়, বরং এটি আজও মুমিনের জন্য দিকনির্দেশনা। আল্লাহর নৈকট্য জ্ঞান, পদমর্যাদা বা সৃষ্টিগত শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ ও নির্বাচনের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।

পবিত্র শবে মেরাজের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এই রাতের ঘটনা আমাদের নবুয়তের মর্যাদা, আল্লাহর মহিমা এবং মানবজাতির প্রতি তাঁর নৈকট্যের অনন্য প্রকাশকে স্পষ্ট করে। মেরাজের রাতে নবিজি ﷺ ষষ্ঠ বা সপ্তম আকাশে অবস্থিত সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছান। সেখানে তিনি জিব্রাইল (আ.)-কে তাঁর আসল নূরানি আকৃতিতে দেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা নবীকে এমন কিছু নিদর্শন প্রদর্শন করেছেন, যা মানুষের ধারণার বাইরে এবং যা তিনি নিজ নবী ﷺ-কে দেখাতে ইচ্ছা করেছিলেন। নবীজির দৃষ্টি কখনো বিচলিত হয়নি, তিনি সীমা অতিক্রম করেননি এবং আল্লাহর প্রকাশিত মহিমার সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতি রেখেছেন।

এভাবে বলা যায়, মেরাজ হলো আল্লাহর তাজাল্লি, আল্লাহর নূর ও মহিমার সরাসরি প্রকাশ, যা কেবল নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর জন্যই সম্ভব হয়েছিল। এটি নবিজির মর্যাদা প্রমাণ করে এবং মানবজাতির প্রতি আল্লাহর বিশেষ নির্বাচিত নৈকট্যের চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবে চিরন্তন মর্যাদা অর্জন করে। মেরাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহর নৈকট্য কোনো শক্তি বা সৃষ্টির মাধ্যমে নয়, বরং তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ ও নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জন করা যায়।

লেখকঃ
প্রধান নির্বাহী উপদেষ্টা 
বাংলাদেশ রেজভীয়া তালিমুস সূন্না বোর্ড ফাউন্ডেশন

এমএসএম / এমএসএম

শবে মেরাজের তাজাল্লি ও জিব্রাইল (আ.) এর সীমা: এক গভীর ও বিস্ময়কর সত্য!

অকুতোভয় সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা: ২২ বছরেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল পরিকল্পনাকারীরা

বিতর্ক থেকে বিবর্তন: তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তর

কুয়েত দূতাবাস সহ মধ্যপ্রাচ্য দূতাবাস গুলো সংস্কার অতি জরুরি

রাজনীতি মানেই কি ক্ষমতার লড়াই?

অধিক আসনের হিসাব না গ্রহণযোগ্য নির্বাচন- তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কোন পথে?

মামদানির ঐতিহাসিক অভিষেক ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ

বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান

ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ

জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো

পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়

ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়

বেগম খালেদা জিয়া: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস