নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা: সরকার-বিরোধী উভয়েরই কল্যাণকর
জাতীয় বিনির্মাণের নামে যদি কেবল উন্নয়নের পরিসংখ্যান দেখানো হয়, অথচ ক্ষমতার ভুল, অপচয় ও ব্যর্থতাকে প্রশ্ন করা বন্ধ থাকে, তাহলে তা প্রকৃত উন্নয়ন নয়, একটি সাজানো ভাস্কর্য মাত্র। এই বাস্তবতায় স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো বিলাসী আদর্শ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি জরুরি প্রতিরোধব্যবস্থা।
যখন রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের সম্পর্ক ধীরে ধীরে শাসক অধীনতার নিঃশব্দ বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে, তখন সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা আর শুধু খবর পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এই সময়েই সাংবাদিকতাকে ক্ষমতার দরবারে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলতে হয়, তাকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হয়। আজ সেই দায়িত্ব সততা ও সাহসের সঙ্গে বহন করাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের সংবাদ পরিবেশ ছিল গভীর সংকটে। ভয়, স্বার্থ বা অনিচ্ছার কারণে বহু সংবাদমাধ্যম ক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় করে চলেছে। এর ফল ছিল একপাক্ষিক সংবাদচর্চা, যা গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিজ বাসভবন থেকে উচ্ছেদ, কারাবাস, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না দেওয়া, কিংবা তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার না করার মতো মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট গুরুতর বিষয়গুলো জাতীয় গণমাধ্যমে তখন নিরপেক্ষ ও বিচারসাপেক্ষ আলোচনার সুযোগ পায়নি। বাস্তবতা হলো, অনেক সংবাদকক্ষ সত্য অনুসন্ধানের বদলে নিরাপদ নীরবতাকেই বেছে নিয়েছিল।
অথচ স্বাধীন সাংবাদিকতার ভিত্তি হলো সত্য বলা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশ। এই দায় এড়ালে সাংবাদিকতা তার নৈতিক বৈধতা হারায়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে কিছুটা মত প্রকাশের সুযোগ তৈরি হলেও আরেকটি সমস্যার উত্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। একই সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ এখন খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামী কিংবা হেফাজত ইসলামীকে নিয়ে নিয়মিত প্রশংসামূলক লেখা প্রকাশ করছে। এটি ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হতে পারে, কিন্তু একে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বলা যায় না। নিরপেক্ষতার অর্থ কোনো পক্ষের প্রশংসা বা বিরোধিতা নয়; বরং তথ্য যাচাই, প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ এবং যে কোনো ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন রাখা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা সবসময়ই ক্ষমতার মুখোমুখি প্রশ্ন তোলে, সে ক্ষমতা রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকুক, বিরোধী রাজনীতিতে থাকুক কিংবা কোনো দল, সংগঠন বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হোক। ক্ষমতার উৎস যেখানেই হোক, তাকে যাচাই ও জবাবদিহির আওতায় আনাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। শক্তিশালী ও কার্যকর গণতন্ত্র গড়ে তুলতে এই দৃষ্টিভঙ্গির কোনো বিকল্প নেই।
অনেকেই মনে করেন, সরকারের সমালোচনা করলেই সাংবাদিকতা স্বাধীন হয়। এটি ভুল ধারণা। স্বাধীন সাংবাদিকতা মানে হলো যে কোনো ক্ষমতার মুখোমুখি সত্য বলার সাহস। সরকার বা বিরোধী দল যখন বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত দাবি জনগণের সামনে তোলে, তখন সাংবাদিকতার দায়িত্ব সেটিকে যাচাই ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভেঙে দেওয়া। কারণ জাতীয় বিনির্মাণের ভিত্তি হলো তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, ন্যায্যতা এবং জবাবদিহি। এই ভিত্তি দুর্বল হলে গণমাধ্যমই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি।
বর্তমান সংবাদপরিবেশ একটি স্পষ্ট চাপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, মব জাস্টিস, নির্বাচনকেন্দ্রিক মেরুকরণ এবং ডিজিটাল আইনের প্রয়োগ সংবাদপ্রবাহকে ক্রমশ সংকুচিত করে তুলছে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা, সাংবাদিক গ্রেপ্তার, সংবাদ প্রত্যাহার কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মুখে নীতিমালার পরিবর্তন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না; এগুলো একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে সংবাদকক্ষে সতর্কতা ও আত্মসংযম বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশের সক্ষমতাকে সীমিত করে দেয়।
এর ক্ষতি শুধু গণমাধ্যমের নয়, পুরো সমাজের। তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকলে দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবিক অবহেলা আড়ালেই থেকে যায়। তখন উন্নয়ন হয় কাগজে, বাস্তবে নয়। আর জাতির আস্থার ভিত্তি ভেঙে পড়ে।
এখানেই স্বাধীন সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দায়বদ্ধতা ছাড়া স্বাধীনতা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত হলো তথ্য যাচাই। গুজব ও অপপ্রচারের এই সময়ে যাচাইহীন সংবাদ শুধু বিভ্রান্তি বাড়ায় এবং সামাজিক বিভাজনকে তীব্র করে।
এই প্রেক্ষাপটে হলুদ সাংবাদিকতার ঝুঁকি আরও প্রকট। ক্লিক ও দর্শক বাড়ানোর প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অতিরঞ্জনের প্রবণতা অনেক সংবাদমাধ্যমকে নাটকীয় শিরোনাম ও অর্ধসত্যে ঠেলে দিচ্ছে। এটি শুধু পেশাগত অবক্ষয় নয়; এটি একটি সামাজিক বিপর্যয়। কারণ হলুদ সাংবাদিকতা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার শক্তিকে দুর্বল করে এবং সমাজে ভয়, ঘৃণা ও বিভাজন ছড়ায়।
তবে এই সংকটের দায় এককভাবে সাংবাদিকদের ওপর চাপানো যায় না। মালিকানার রাজনৈতিক সংযোগ, আর্থিক চাপ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা একটি কাঠামোগত সমস্যা তৈরি করেছে। চাকরি হারানো বা মামলার ভয়ে অনেকেই সত্য বলার ঝুঁকি নিতে পারেন না। ফলে সংবাদকক্ষগুলো সত্যের বদলে সুবিধাজনক ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়।
জাতীয় বিনির্মাণের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এমন সমাজ গড়া, যেখানে সত্যের মূল্য আছে। যেখানে ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন তোলা যায়, ভুল হলে সংশোধন সম্ভব, এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ গুরুত্ব পায়। এই দায়িত্ববোধ ছাড়া উন্নয়ন কেবল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে।
বিশ্বের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা কখনোই শুধু বিরোধী পক্ষের হাতিয়ার নয়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করেছিল। ব্রিটেনে বিবিসি সরকার ও বিরোধী উভয়ের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, এটাই তার নিরপেক্ষতার প্রমাণ। এসব উদাহরণ দেখায়, স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো পক্ষের শত্রু নয়; এটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলিত করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সরকার ও বিরোধী উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। কারণ সত্য কোনো পক্ষের সম্পত্তি নয়। সত্যই গণতন্ত্রের আসল শক্তি।
সত্য, নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতা- এই তিনের সমন্বয়েই স্বাধীন সাংবাদিকতা জাতীয় বিনির্মাণের দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে। এই ভিত্তি না থাকলে রাষ্ট্র কেবল শাসনের কাঠামো হয়ে ওঠে, গণতন্ত্র নয়।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক
এমএসএম / এমএসএম
গণমানুষের আস্থার ঠিকানা হোক গণমাধ্যম
নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা: সরকার-বিরোধী উভয়েরই কল্যাণকর
শবে মেরাজের তাজাল্লি ও জিব্রাইল (আ.) এর সীমা: এক গভীর ও বিস্ময়কর সত্য!
অকুতোভয় সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা: ২২ বছরেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল পরিকল্পনাকারীরা
বিতর্ক থেকে বিবর্তন: তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তর
কুয়েত দূতাবাস সহ মধ্যপ্রাচ্য দূতাবাস গুলো সংস্কার অতি জরুরি
রাজনীতি মানেই কি ক্ষমতার লড়াই?
অধিক আসনের হিসাব না গ্রহণযোগ্য নির্বাচন- তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কোন পথে?
মামদানির ঐতিহাসিক অভিষেক ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ
বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান
ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ
জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো