ঢাকা সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬

গণমানুষের আস্থার ঠিকানা হোক গণমাধ্যম


এসএম পিন্টু photo এসএম পিন্টু
প্রকাশিত: ১৮-১-২০২৬ বিকাল ৬:৪৫

গণমাধ্যম কেবল সংবাদ পরিবেশনের একটি যন্ত্র নয়, এটি একটি সমাজের বিবেক। মানুষ যখন বিভ্রান্ত হয়, যখন সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করতে হিমশিম খায়, তখন সে গণমাধ্যমের দিকে তাকায়। এই তাকিয়ে থাকার ভেতরেই লুকিয়ে আছে আস্থা। কিন্তু যদি সেই আস্থা ভেঙে যায়, তবে মানুষ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, সত্যকেই অবিশ্বাস করতে শেখে। তাই গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো মানুষের আস্থার ঠিকানা হয়ে ওঠা।
রাষ্ট্রের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের মতো গণমাধ্যমও ভুল করতে পারে। কিন্তু পার্থক্য হলো, গণমাধ্যমের ভুল শুধু একটি দপ্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজজুড়ে। একটি ভুল সংবাদ মানুষের মানসিকতা বদলে দিতে পারে, একটি পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। তাই গণমাধ্যমের দায়িত্ব অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
মানুষ গণমাধ্যমের কাছে আসে প্রশ্ন নিয়ে, এই দেশে কী হচ্ছে, কারা সত্য বলছে, কারা ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি গণমাধ্যম সৎভাবে না দেয়, তবে মানুষের আস্থার ভিত নড়ে যায়। মানুষ তখন বিকল্প খোঁজে, গুজব, ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব বিশ্লেষণ। এতে সমাজ আরও বেশি বিভ্রান্ত হয়। গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা তৈরি হয় ধারাবাহিকতায়। আজ একটি সত্য সংবাদ প্রকাশ করলেই আস্থা জন্মায় না। বছরের পর বছর ধরে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হয়, চাপের মুখেও নত না হয়ে থাকতে হয়। ক্ষমতার রক্তচক্ষু, বিজ্ঞাপনের চাপ, মালিকের স্বার্থ, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে গণমাধ্যমকে প্রমাণ করতে হয়, সে মানুষের পক্ষে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজ অনেক গণমাধ্যম আস্থার জায়গা থেকে সরে গেছে। সংবাদ নয়, সংবাদ বানানো হচ্ছে। সত্য নয়, সুবিধাজনক সত্য পরিবেশন করা হচ্ছে। এতে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, ক্ষুব্ধ হচ্ছে, আর ধীরে ধীরে গণমাধ্যম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
গণমাধ্যম যখন রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বী হয়ে পড়ে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। কারণ সাধারণ মানুষের কোনো পক্ষ নেই, তার পক্ষ হলো ন্যায়, সত্য ও ন্যায্যতা। একটি সংবাদমাধ্যম যদি এক পক্ষের চোখ দিয়ে সবকিছু দেখে, তবে অন্য পক্ষের কণ্ঠ চাপা পড়ে যায়। এতে সমাজে ভারসাম্য নষ্ট হয়, আর আস্থা ভেঙে পড়ে।
সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা কোনো দলের কাছ থেকে নয়, কোনো কর্পোরেট স্বার্থের কাছ থেকেও নয়, এই স্বাধীনতা জনগণের কাছ থেকে আসে। জনগণ বিশ্বাস করে বলেই গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারে। কিন্তু যখন গণমাধ্যম এই বিশ্বাসের অপব্যবহার করে, তখন সে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারে। মানুষ চায় না গণমাধ্যম নিখুঁত হোক, মানুষ চায় গণমাধ্যম সৎ হোক। ভুল হলে স্বীকার করুক, সংশোধন করুক। কিন্তু ভুল ঢাকতে গেলে, সমালোচনা দমাতে গেলে, প্রশ্নকারীদের শত্রু বানাতে গেলে আস্থা দ্রুত ভেঙে যায়। একটি সংবাদ ভুল হতে পারে, কিন্তু ইচ্ছাকৃত মিথ্যা কখনো ক্ষমাযোগ্য নয়।
আজকের ডিজিটাল যুগে গণমাধ্যমের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। কারণ এখন সংবাদ শুধু ছাপা কাগজ বা টিভির পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই। এক ক্লিকেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এই দ্রুততার সুযোগে যদি যাচাই ছাড়াই সংবাদ প্রকাশ হয়, তবে ক্ষতি হয় বহুগুণ। আস্থা হারানোও হয় তত দ্রুত।
গণমাধ্যমের ভাষা মানুষের আস্থার বড় নিয়ামক। উত্তেজক শব্দ, বিভ্রান্তিকর শিরোনাম, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উপস্থাপন মানুষকে সন্দিহান করে তোলে। মানুষ বুঝতে পারে, এখানে তথ্যের চেয়ে প্রভাব তৈরির চেষ্টা বেশি। অথচ মানুষ গণমাধ্যমের কাছে আসে প্রভাবিত হতে নয়, অবগত হতে।

গণমাধ্যম যখন দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখনই সে আস্থার ঠিকানা হয়ে ওঠে। শ্রমিকের মজুরি না পাওয়ার খবর, নির্যাতিত নারীর কণ্ঠ, প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনা, এসব তুলে ধরাই সাংবাদিকতার আসল সৌন্দর্য। কিন্তু যখন গণমাধ্যম কেবল ক্ষমতাবানদের বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখন সাধারণ মানুষ নিজেকে পরিত্যক্ত মনে করে। সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নৈতিকতাও আস্থার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাংবাদিক যদি ব্যক্তিগত স্বার্থে সংবাদকে ব্যবহার করে, তবে পুরো পেশার ওপর প্রশ্ন ওঠে। মানুষ তখন একজন সাংবাদিককে নয়, পুরো সাংবাদিকতাকেই সন্দেহের চোখে দেখে। এই ক্ষতি অপূরণীয়।
গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামোও আস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। যখন সংবাদমাধ্যম ব্যবসার পণ্যে পরিণত হয়, তখন খবরও পণ্য হয়ে যায়। পণ্যের মূল লক্ষ্য লাভ, সত্য নয়। এই বাস্তবতা মানুষ বুঝতে পারছে, আর সেখান থেকেই আস্থার সংকট গভীর হচ্ছে।
তবুও গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা শেষ হয়ে যায়নি। কারণ ইতিহাস বলে, অন্ধকার যত ঘন হয়, মানুষের আলোর প্রয়োজন তত বাড়ে। মানুষ এখনো চায় এমন একটি গণমাধ্যম, যাকে বিশ্বাস করা যায়, যার ওপর ভরসা রাখা যায়। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে গণমাধ্যমকে আবার মানুষের কাছে ফিরতে হবে। ক্ষমতার দরবার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে নির্ভয়ে, ভুল স্বীকার করতে হবে সাহসের সঙ্গে, আর সত্যের সঙ্গে আপস না করার অঙ্গীকার করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমের অস্তিত্ব টিকে থাকে প্রযুক্তিতে নয়, বিশ্বাসে। মানুষের আস্থা হারালে গণমাধ্যম থাকে, কিন্তু সাংবাদিকতা মরে যায়।
আর মানুষের আস্থার ঠিকানা হয়ে উঠলেই গণমাধ্যম সত্যিকার অর্থে সমাজের বাতিঘর হতে পারে।


লেখক: কবি, সাংবাদিক ও সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

এমএসএম / এমএসএম

গণমানুষের আস্থার ঠিকানা হোক গণমাধ্যম

নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা: সরকার-বিরোধী উভয়েরই কল্যাণকর

শবে মেরাজের তাজাল্লি ও জিব্রাইল (আ.) এর সীমা: এক গভীর ও বিস্ময়কর সত্য!

অকুতোভয় সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা: ২২ বছরেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল পরিকল্পনাকারীরা

বিতর্ক থেকে বিবর্তন: তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তর

কুয়েত দূতাবাস সহ মধ্যপ্রাচ্য দূতাবাস গুলো সংস্কার অতি জরুরি

রাজনীতি মানেই কি ক্ষমতার লড়াই?

অধিক আসনের হিসাব না গ্রহণযোগ্য নির্বাচন- তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কোন পথে?

মামদানির ঐতিহাসিক অভিষেক ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ

বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান

ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ

জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো

পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়