নির্বাচনী ট্রেইনে সব দল, ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিক জনগণ!
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি বড় পরীক্ষা। আজ থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে, এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি কোনো দল বা প্রার্থীকেন্দ্রিক নয় বরং নির্বাচনের আচরণ, অন্তর্ভুক্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে।
নির্বাচনী সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের আশঙ্কা সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনকে কঠোর ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কোনো ধরনের শৈথিল্য বা পক্ষপাত নির্বাচন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যা দেশ ও জনগণের প্রত্যাশার পরিপন্থী।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আচরণবিধি লঙ্ঘন নতুন কিছু নয়। ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক প্রভাব, অর্থ ও উপহারের ব্যবহার, ভয়ভীতি বা সামাজিক চাপ-এসবের উপস্থিতি নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। অথচ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন মানে শুধু ভোটকেন্দ্র খোলা থাকা নয়; বরং ভোটার যেন ভয় ও প্রলোভনের বাইরে থেকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন-সেটিই মূল বিষয়।
এই স্বাধীনতা যখন ক্ষুণ্ন হয়, তখন তার প্রভাব শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আস্থার ওপর।
একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন- আজকের বিশ্বে নির্বাচন আর শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে অর্থ বিনিয়োগ করার আগে কেবল করনীতি বা শ্রমবাজার দেখেন না; তারা দেখেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন মানে বিনিয়োগের ঝুঁকি বৃদ্ধি। নীতির স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা নিয়ে সন্দেহ।
বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যে দেশে রাজনৈতিক রূপান্তর নিয়মতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য, সেখানে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি হয়। আর যেখানে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকে, সেখানে বিনিয়োগ হয় ক্ষণস্থায়ী বা জল্পনাভিত্তিক। সুতরাং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও পূর্বশর্ত।
এই বাস্তবতায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন মানে কেবল আইন ভাঙা নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। নির্বাচনের দিন হয়তো পার হয়ে যায়, কিন্তু তার প্রভাব বছরের পর বছর বহন করতে হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হলো প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত কোটি কোটি প্রবাসী কেবল রেমিট্যান্স প্রেরক নন; তারা দেশের ভাবমূর্তির নীরব দূত। তারা যেখানে কাজ করেন, বিনিয়োগ করেন বা বসবাস করেন, সেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হন। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তাদের গর্ব বাড়ায়, একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন তাদের অবস্থানকে অস্বস্তিকর করে তোলে।
বেশীরভাগ প্রবাসীরা দেশে ভোট দিতে পারেন না, কিন্তু দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অটুট। তারা দেশে বিনিয়োগ করেন, পরিবার চালান, সম্পত্তি গড়েন। একটি অস্থির বা অবিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলে। ফলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু দেশের ভেতরের নাগরিকদের জন্য নয়; এটি দেশের বাইরের নাগরিকদের সঙ্গেও রাষ্ট্রের এক ধরনের নৈতিক চুক্তি।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন মানে কেবল অংশগ্রহণের সুযোগ নয়; মানে সব পক্ষের জন্য সমান মাঠ। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, প্রচারণার সুযোগ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা- এসব নিশ্চিত না হলে নির্বাচন সংখ্যায় পূর্ণ হলেও বিশ্বাসে খালি থেকে যায়।
এখানে প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আচরণবিধি প্রয়োগ যদি নির্বাচনী সময়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তার কার্যকারিতা থাকে না। নিয়ম প্রয়োগে নিরপেক্ষতা না থাকলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় আস্থার।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য নিজেকে প্রমাণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই প্রমাণ কোনো একটি দলকে জয়ী করানো নয়, বরং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াটিকেই বৈধ ও গ্রহণযোগ্য করা। একটি নির্বাচন যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক, শান্তিপূর্ণ এবং বিশ্বাসযোগ্য হয়, তার সুফল শুধু একটি সরকারের মেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা রাষ্ট্রের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের আস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে।
ভোটের ক্ষমতা জনগণের হাতে- এটি শুধু একটি বাক্য নয়, একটি দায়িত্ব। এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হলে আচরণবিধি মেনে চলা, প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করা এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া অপরিহার্য। কারণ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের মাধ্যম নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ভিত্তি।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক
আরমান / আরমান
নির্বাচনী ট্রেইনে সব দল, ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিক জনগণ!
ঈমানের হেফাজতের নগরী মদিনা: মক্কার চেয়ে দ্বিগুণ বরকতের অন্তর্নিহিত রহস্য!
বিপ্লবের আশা-আকাঙ্ক্ষার যেন অপমৃত্যু না হয়
গণমানুষের আস্থার ঠিকানা হোক গণমাধ্যম
নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা: সরকার-বিরোধী উভয়েরই কল্যাণকর
শবে মেরাজের তাজাল্লি ও জিব্রাইল (আ.) এর সীমা: এক গভীর ও বিস্ময়কর সত্য!
অকুতোভয় সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা: ২২ বছরেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল পরিকল্পনাকারীরা
বিতর্ক থেকে বিবর্তন: তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তর
কুয়েত দূতাবাস সহ মধ্যপ্রাচ্য দূতাবাস গুলো সংস্কার অতি জরুরি
রাজনীতি মানেই কি ক্ষমতার লড়াই?
অধিক আসনের হিসাব না গ্রহণযোগ্য নির্বাচন- তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কোন পথে?
মামদানির ঐতিহাসিক অভিষেক ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ