আস্থার রাজনীতি না অনিবার্যতা: তারেক রহমান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক শূন্যতা!
তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে ঘিরে যে আস্থার আবহ তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কেউ এটিকে রাজনৈতিক ধারায় একটি গুণগত পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি সময়সাপেক্ষ এক সাময়িক রাজনৈতিক আবরণ। চূড়ান্ত মূল্যায়নে পৌঁছাতে সময় লাগবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে রাজনীতির ভবিষ্যৎ সব সময় ভবিষ্যতেই ধরা দেয় না; অনেক ক্ষেত্রে নেতার বর্তমান অবস্থান, ভাষা ও আচরণেই আগাম ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে ‘পরিবর্তনের অঙ্গীকার’ নতুন নয়। সংলাপ, সহনশীলতা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অতীতেও এসেছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো স্থায়ী হয়নি। সে অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই বর্তমান পরিস্থিতিকে আবেগ নয়, নির্মোহ বিশ্লেষণের আলোকে বিচার করা জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে গত ১০ জানুয়ারি দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্পাদক সমাজ কেবল সংবাদ পরিবেশক নয়; তারা জনমত গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই সম্পাদকদের মূল্যায়নে যে সুর উঠে এসেছে, তা ব্যক্তি প্রশংসার চেয়ে রাজনৈতিক প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবেই বেশি তাৎপর্য বহন করে।
যেমন মানবজমিন পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেছেন, “আজকের বাংলাদেশ যে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, সেই সংকট থেকে উগ্রবাদ যেভাবে আমাদের গ্রাস করার চেষ্টা করছে, সেই উগ্রবাদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে তারেক রহমান ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প নেই। ২৩ বছর আগে আমি এক ভিন্ন তারেক রহমানকে চিনতাম। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকারটি আমিই নিয়েছিলাম। এখন ২৩ বছর পর আমি দেখছি, তারেক রহমান বদলে গেছেন, তাঁর মধ্যে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, একটি গভীর রূপান্তর দেখা যাচ্ছে।” এই বক্তব্য নিছক সৌজন্য নয়; বরং দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ফল বলে অনেকে মনে করছেন।
একইভাবে নিউজ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর বিষয়টিকে আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে দেখেছেন। তিনি বলেছেন, “একটি পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পড়ে ভেঙে গেছে। শত শত মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনের পরই আজ তারেক রহমান আমাদের সামনে আসতে পেরেছেন। মানুষের আত্মদান ও সংগ্রামের ভিত্তিতে যে বাংলাদেশ গড়ে ওঠার কথা ছিল, সেই প্রক্রিয়াটি এখনও অসম্পূর্ণ। অর্থাৎ সমস্যার কেন্দ্র ব্যক্তি নয়, বরং ব্যবস্থাগত শূন্যতা।” নূরুল কবীরের বক্তব্য থেকে যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তা হলো এই শূন্যতা পূরণে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পুনর্গঠন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর এসব কাজ বাস্তবায়নের জন্য যে নেতৃত্বের প্রয়োজন, সেটিই তিনি তারেক রহমানের মধ্যে দেখতে পান।
বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী তারেক রহমানের বক্তব্যে পরিকল্পনার উপস্থিতি লক্ষ করেছেন। আর ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম স্পষ্ট করে বলেছেন- গণতন্ত্র, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সুশাসনই এখন মানুষের প্রধান চাওয়া।
অর্থাৎ দেশের মানুষ অলংকারমূলক রাজনীতি নয়, কার্যকর গণতন্ত্র ও সুশাসন চায়। এই সম্মিলিত মূল্যায়ন থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে আপাতত মধ্যপন্থী ও উদার সমাজ তারেক রহমানের দিকেই তাকিয়ে আছে। এটি আবেগতাড়িত আস্থা নয়; বরং বিকল্পহীনতার বাস্তব ফল।
তবে এই আস্থার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি গুরুতর ঝুঁকি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার সম্ভাবনা দেখা দিলেই সুবিধাবাদী শক্তির সক্রিয়তা বাড়ে। তারেক রহমানকে ঘিরে সমর্থনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির চারপাশে যেভাবে নতুন মুখ ও গোষ্ঠীর ভিড় বাড়ছে, তা নিছক রাজনৈতিক জাগরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এদের একটি অংশের অতীত ভূমিকা ও রাজনৈতিক আচরণ বিএনপির ঘোষিত সংস্কার ও শুদ্ধাচারের বক্তব্যের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।
এখানে একটি বাস্তবতা স্মরণ করা জরুরি। মাত্র কয়েক মাস আগেও তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিএনপিকে কার্যত নেতৃত্ব সংকটে ফেলেছিল। দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হয়েও বিএনপি তখন দিশাহীন ছিল। সেই অনিশ্চয়তায় সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে পড়েছিল মধ্যপন্থী ও উদার রাজনৈতিক শক্তিগুলো। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগে জর্জরিত একটি দল কীভাবে উদার শক্তির শেষ ভরসা হয়ে উঠল?
উত্তরটি যতই কঠিন হোক, তা বাস্তবতারই প্রতিফলন। কারণ বিকল্প প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। গত কয়েক বছরে দক্ষিণপন্থী ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক পরিসর ক্রমে সংকুচিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের চোখে বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপিকেই সবচেয়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এটি একদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠিন স্বীকারোক্তি, অন্যদিকে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তারই ইঙ্গিত। এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি স্পষ্ট: এটি কোনো স্বীকৃতি নয় যে বিএনপি একমাত্র সমাধান, বরং এটি বর্তমান রাজনৈতিক বিন্যাসে প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক অবস্থান খুঁজে পাওয়ার যে সংকট, তারই ইঙ্গিত।
তারেক রহমানের অনুপস্থিতির সময়কালে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক তৎপরতা তুলনামূলকভাবে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্ররাজনীতি, আন্তর্জাতিক পরিসরে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে তাদের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ অনেক পর্যবেক্ষকের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক, মুক্তিযুদ্ধের বয়ান পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা এবং সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি একটি অস্বস্তিকর প্রবণতার দিকেই ইঙ্গিত করে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ও মূলধারার রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে সময়োপযোগী ও কার্যকর প্রতিক্রিয়ার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানকে ঘিরে যে আস্থা তৈরি হয়েছে, তা ব্যক্তিপূজার ফল নয়; এটি রাজনৈতিক অনিবার্যতার ফল। কিন্তু এই আস্থা নিঃশর্ত নয়। বরং এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা নিহিত।
সাম্প্রতিক নির্বাচনী তৎপরতা, বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৭ সহ কয়েকটি আসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডে একটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট। যাঁরা দীর্ঘদিন ত্যাগী রাজনীতির অংশ ছিলেন না, তাঁরাই অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়ে উঠছেন। এতে একদিকে তৃণমূলে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে পরিকল্পিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজনীতির যে বার্তা তারেক রহমান দিতে চাইছেন, তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
এই প্রবণতা কোনোভাবেই শুধু বিএনপির ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। একই ধরনের সুবিধাবাদী চক্র এখন অন্যান্য রাজনৈতিক জোটেও সক্রিয়ভাবে ঢুকে পড়ছে। যারা অল্পদিন আগেও আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বেনিফিসিয়ারি ছিল, তারাই আজ নতুন রাজনৈতিক মুখোশ পরে হাজির হচ্ছে। আদর্শ নয়, সুবিধাই যাদের একমাত্র পরিচয়, তারা এখন রাজনৈতিক রূপান্তরের সুযোগকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করছে।
আরও গুরুতর বিষয় হলো, অনুকূল রাজনৈতিক বাতাসে দায়িত্ব পাওয়া কিছু নির্বাচন সমন্বয়কারী ভোটার জোয়ারের অজুহাতে এসব টাউট ও বাটপারদের মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিচ্ছেন। এতে তাৎক্ষণিকভাবে শক্তি প্রদর্শনের ভ্রম তৈরি হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এটি সংগঠনকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দেয়। আদর্শহীন ও সুবিধানির্ভর লোকদের হাতে নির্বাচনী কাঠামো তুলে দেওয়া মানে রাজনৈতিক আত্মহননের পথ খুলে দেওয়া। কোনো দল বা জোটের জন্যই এটি শুভ লক্ষণ নয়।
তাৎক্ষণিক সংখ্যার হিসাব এতে সুবিধাজনক মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি যে কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শুদ্ধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে হলে শুধু ক্ষমতার পালাবদল যথেষ্ট নয়; মানুষ ও পদ্ধতির ক্ষেত্রেও স্পষ্ট সীমারেখা টানতে হয়। অন্যথায় পুরোনো সংস্কৃতিই নতুন নামে ফিরে আসে।
রাজনীতির শূন্যতা কখনো দীর্ঘদিন শূন্য থাকে না। সেই শূন্যতা কখনো গণতান্ত্রিক শক্তি দিয়ে পূরণ হয়, কখনো আবার উগ্রতা সেখানে জায়গা করে নেয়। তারেক রহমানকে ঘিরে যে আস্থার আবহ তৈরি হয়েছে, তা তাই কেবল ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন নয়; এটি এই শূন্যতা কোন পথে পূরণ হবে, তারই ইঙ্গিত। এখন প্রশ্নটি আর বিমূর্ত নয়, বরং গভীরভাবে রাজনৈতিক- তিনি কি এই আস্থাকে একটি দায়িত্বশীল, গণতান্ত্রিক ও বিশ্বাসযোগ্য বিকল্পে রূপ দিতে পারবেন, নাকি এটি ইতিহাসের আরও এক ক্ষণস্থায়ী আবরণের মতোই থেকে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তাঁর রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বাংলাদেশের রাজনীতির দিকনির্দেশও সেখানেই স্থির হবে।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক
Aminur / Aminur
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ঐতিহাসিক বিজয়
মহাশিবরাত্রি: পরম চেতনার জাগরণ ও শিবত্বে উত্তরণ
ক্ষমতা হাতে, প্রত্যাশার চাপ সামনে: সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি তারেক রহমানকে জাতীয় নেতৃত্বের আইকনে পরিণত করবে?
হ্যাঁ জয় মানেই কি লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সচুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডারের অধিকার আইনগত হবে?
জাতির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে আর কোন ধর্মঘট নয়
নির্বাচন সফল হোক, গণতন্ত্র ফিরে আসুক
তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় জাতীয় নির্বাচন
ঐক্য সরকার নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রয়োজন স্বাধীন ও শক্তিশালী বিরোধী দল!
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে?
পে স্কেল আন্দোলন: সংখ্যার সত্য, রাষ্ট্রের সাহস, আর ‘দুনিয়ার মজদুর
আধিপত্যবাদের ধরন বদলেছে, কিন্তু স্বভাব বদলায়নি
এ নির্বাচন ফ্যাসিবাদকে কবরস্থ করার নির্বাচন—যশোরে হাসনাত আব্দুল্লাহ