পবিত্র শবে বরাত: হারিয়ে যেতে বসা আত্মার জন্য এক গভীর ডাক : মোহাম্মদ আনোয়ার
আজকের ব্যস্ত জীবন, ক্যারিয়ার, বাজারদর, রাজনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা- সবকিছু আমাদের মন দখল করে রেখেছে। অথচ এক অপরিসীম প্রশ্ন থাকে প্রায় চুপচাপ: “আমি আল্লাহর সঙ্গে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?” ঠিক এই মুহূর্তে ইসলাম আমাদের সামনে খুলে দেয় এক বিশেষ রাত, যা আত্মার জন্য যেন ‘রিসেট বাটন’। শা‘বান মাসের পনেরোতম রাত, পবিত্র শবে বরাত, সেই গভীর এবং মহিমান্বিত রজনী।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য শবে বরাত শুরু হবে রাত ০৩ ফেব্রুয়ারি সূর্যাস্তের পর থেকে ফজর পর্যন্ত। মধ্যপ্রাচ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে শুরু হবে একদিন আগে, অর্থাৎ রাত ০২ ফেব্রুয়ারি থেকে ফজর পর্যন্ত। এই রাত শুধু সময় নয়- এটি রহমত, মাগফিরাত এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। নফল নামাজ, দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত, নবী করিম ﷺ এর উপর দরুদ ও সালাম পাঠ, এই সব অনুশীলন আমাদের ঈমানকে জাগিয়ে, অন্তরকে আলোকিত করে।
ইসলামী গবেষক ও হক্কানী আলেমদের মতে, শবে বরাত কেবল একটি ধর্মীয় তারিখ নয়। এটি এক বার্তা, এক সুযোগ, এক ডাক“এখনো কি ফিরে আসবে না?” মানুষের জীবনের তাড়াহুড়ো, ব্যস্ততা আর দুনিয়ার হিসাব-নিকাশে কখনো আমরা আমাদের আত্মার দিকে তাকাই না। ঠিক এই রাতে আল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দেন, দরজা এখনো খোলা, রহমত এখনো প্রবাহমান, এবং প্রত্যাবর্তনের সুযোগ এখনও হাতে।
আরবি পরিভাষায় এই রাতকে বলা হয় লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান, শা‘বান মাসের মধ্যরজনী। ইসলামের ভাষায় এটি মুক্তির রাত, নাজাতের রাত। এমন এক সময়, যখন আল্লাহ তাআলা নিজেই বান্দাকে ডাকেন।
হাদিসের বর্ণনায় আমরা পাই, এই রাতে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন- আছে কি কেউ ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আছে কি কেউ রিজিক প্রার্থনাকারী? আছে কি কেউ বিপদগ্রস্ত?
এই প্রশ্নগুলো আসলে আল্লাহর নয়; এগুলো আমাদের জন্য। কারণ আল্লাহ জানেন কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্নটা আমাদের বিবেকের কাছে।
শবে বরাতকে অনেক সময় ‘সাধারণ ক্ষমার রাত’ বলা হয়। হাদিসে এসেছে- এই রাতে অসংখ্য মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। সংখ্যার দিক থেকে যা মানুষের কল্পনার বাইরে। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে। বিদ্বেষ, হিংসা ও শির্কে লিপ্ত ব্যক্তি এই ক্ষমার আওতায় আসে না, যতক্ষণ না সে নিজেকে সংশোধন করে। অর্থাৎ, শবে বরাত শুধু সিজদার সংখ্যা বাড়ানোর রাত নয়; এটি মন পরিষ্কার করার রাত।
আজকের সমাজে যেখানে সম্পর্ক ভাঙা সহজ, ক্ষমা করা কঠিন, সেখানে শবে বরাত আমাদের সামনে আয়না ধরে। প্রশ্ন তোলে: আমার অন্তরে কি কারও প্রতি ঘৃণা জমে আছে? আমি কি কাউকে কষ্ট দিয়ে নিশ্চিন্তে ইবাদতে দাঁড়াতে চাই?
উলামায়ে কেরামের মতে, এই রাতে আগত বছরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জীবন, মৃত্যু, রিজিক- সবই আল্লাহর ইলমে নির্ধারিত।
এই বিশ্বাস মানুষকে ভীত করে না; বরং নম্র করে। কারণ তখন মানুষ বুঝতে পারে, আজ যে সুস্থ, ব্যস্ত ও আত্মবিশ্বাসী, আগামীকাল তার নাম তালিকায় থাকবে কি না, সে জানে না। শবে বরাত তাই অহংকার ভাঙার রাত।
শবে বরাত নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও সুন্নি উলামাদের অবস্থান বরাবরই ভারসাম্যপূর্ণ। চার মাজহাবই এই রাতের ফজিলত স্বীকার করেছেন। ইবাদত করা মুস্তাহাব, প্রশংসনীয়। তবে নির্দিষ্ট আমলকে ফরজ বানানো বা লোকদেখানো আয়োজন ইসলামসম্মত নয়। ইবাদত হোক নীরব, ব্যক্তিগত এবং আন্তরিক। কারণ আল্লাহ শব্দের চেয়ে হৃদয়ের ভাষা বেশি বোঝেন।
শবে বরাত কোনো উৎসবের রাত নয়। আবার একেবারে উপেক্ষার রাতও নয়। এটি থেমে দাঁড়ানোর রাত। নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, ইস্তিগফার, দরুদ ও সালাম এসব আমল বড় কিছু নয়। কিন্তু এগুলো আন্তরিক হলে ফল বড় হয়। সামর্থ্য থাকলে পরদিন নফল রোজা রাখা— সেটিও একটি সুন্দর প্রস্তুতি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় আমল হলো, নিজেকে প্রশ্ন করা। আমরা জানি না, জীবনের পথে আরেকটি শবে বরাত আমাদের কপালে লেখা আছে কি না। সময় কাউকে আগাম বার্তা দেয় না, সুযোগের দরজায় কড়াও নাড়ে না। তাই এই রাতকে নিছক একটি তারিখ ভেবে পার করে দেওয়া মানে, নিজের আত্মার সঙ্গে প্রতারণা করা।
শবে বরাত আমাদের নিঃশব্দে মনে করিয়ে দেয়:- আল্লাহ এখনো ডাকছেন। বান্ধার ফিরে আসার পথ এখনো বন্ধ হয়নি। এই রাত যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার উদ্দেশে এক শেষবারের মতো কোমল প্রশ্ন- তুমি কি আরেকবার চেষ্টা করবে না? শবে বরাত আমাদের আশ্বস্ত করে- আল্লাহ এখনো আশা ছাড়েননি। তাই বান্দা হিসেবে আমাদেরও হতাশ হওয়ার অধিকার নেই।
আসুন, এই মহিমান্বিত রজনীতে অহংকার নামিয়ে রাখি, ভারাক্রান্ত অন্তর নিয়ে আল্লাহর দরবারে ফিরে যাই। চোখের ভাষায় ক্ষমা চাই, নীরব সিজদায় নিজেদের ভেঙে দিই। রহমত চাই, মাগফিরাত চাই, আর আজ থেকেই নিজেকে বদলে ফেলার দৃঢ় অঙ্গীকার করি।
কারণ শবে বরাত কেবল একটি রাত নয়- এটি ঈমান জাগার আহ্বান, আমলে ফেরার ডাক এবং আল্লাহমুখী হওয়ার এক অনন্য সুযোগ।
লেখকঃ
প্রধান নির্বাহী উপদেষ্টা
বাংলাদেশ রেজভীয়া তালিমুস সূন্না বোর্ড ফাউন্ডেশন
Aminur / Aminur
”আলোর খোঁজে” আধাঁর পথে ঘুরছি শুধু দিনে রাতে
হিংসা নয়, মেধা, শ্রম ও ভালো কাজের প্রতিযোগিতা-ই সফলতা এনে দেয়
ডা. জুবাইদা রহমানের সফট পাওয়ার কূটনীতির উত্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত!
ঈদ জামাতের সময় মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন-মিসাইল সতর্কতা; মুসল্লিদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিস্ময়!
প্রধানমন্ত্রীর ২৮ দিনে ২৮ পদক্ষেপ: দ্রুত বাস্তবায়নে নতুন দৃষ্টান্ত, সুশাসনে জোর!
নীরব কৌশলের রাজনীতি: রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে তারেক রহমানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
ঈদ-উল-ফিতর সৌহার্দ্য ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
লাইলাতুল কদরের ইবাদত: বান্দার গুনাহ মাফের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আত্মসমর্পণ অপরিহার্য!
আল-কুরআন বিজ্ঞান ও রমজান
ঈদযাত্রা আনন্দময় ও নিরাপদ হোক
ঈদের প্রহর গুনছে দেশ, পে-স্কেলহীন বাস্তবতায় তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের আনন্দ কতটুকু?
গণতান্ত্রিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ