ঢাকা রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬

ইসলামের নামে রাজনীতি, নাকি মদিনা সনদের আলোকে ৩১ দফার বাস্তবায়ন: রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা কোন রাজনৈতিক দর্শনে?


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ১-২-২০২৬ রাত ৯:৩৮

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। কখনো উন্নয়ন ছিল মুখ্য আলোচ্য, কখনো দুর্নীতি, কখনো শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা, কখনো নেতৃত্বের প্রশ্ন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। এই প্রথমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় ইস্যু সরাসরি প্রধান নির্ধারক ফ্যাক্টর হিসেবে সামনে এসেছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্রবণতা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে একটি গভীর ও ঝুঁকিপূর্ণ মোড়।
এই পরিবর্তন হঠাৎ নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা, নির্বাচন ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে আস্থার সংকট, এসব মিলেই রাজনীতিকে আবেগনির্ভর পথে ঠেলে দিয়েছে। যখন রাষ্ট্র কাঠামোগত সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাজনীতি সহজ ভাষা ও শক্ত স্লোগানের আশ্রয় নেয়। ধর্ম সেই স্লোগানের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও শক্তিশালী উপাদান হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তুলনা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এটি কোনো দলীয় পক্ষপাতের প্রশ্ন নয়, কিংবা কে কাকে পছন্দ করে তার হিসাবও নয়। মূল প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন কী, সেই দর্শন কতটা গণতান্ত্রিক, বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক, এবং একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আদৌ কার আছে।
বিএনপির রাজনীতির মূল ভিত্তি ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনব্যবস্থাকে ঘিরে। দলটি একাধিকবার সরকার পরিচালনা করেছে, প্রশাসনিক কাঠামো সচল রেখেছে এবং নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতির বাস্তব ও জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এই দলে যেমন আছেন প্রাক্তন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা, তেমনি আছেন আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন, চিন্তাশীল ও সৃজনশীল নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক এমপি প্রার্থীরাও। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা বিএনপির একটি বড় শক্তি। সে কারণেই তাদের প্রস্তাবিত ৩১ দফা কোনো তাত্ত্বিক বা আবেগনির্ভর ঘোষণা নয়; বরং একটি অস্থির ও সংকটগ্রস্ত রাষ্ট্রকে পুনরায় স্থিতিশীল করার জন্য একটি কাঠামোগত ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ। এখানে নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার মতো মৌলিক রাষ্ট্রীয় প্রশ্নগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা একটি কার্যকর ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য।
এর বিপরীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল, যার রাজনৈতিক দর্শনের মূল উৎস মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর চিন্তাধারা। দলটির রাজনীতিতে একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামোকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। এখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ধর্ম নয়; বরং একটি আধুনিক, বহুত্ববাদী ও সাংবিধানিক রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নীতিগত স্পষ্টতা এবং বাস্তব সক্ষমতার প্রশ্ন। রাষ্ট্র পরিচালনা একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে নৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা একমাত্র নির্ধারক নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কার্যকারিতা, জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক ভিন্নমত ও সামাজিক বৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনার মতো জটিল ক্ষেত্রগুলো। এই প্রেক্ষাপটে, একটি বৃহৎ ও জনবহুল দেশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা, সংসদীয় কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের ইতিহাস নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে উঠে আসে।
এই আলোচনায় মদিনা সনদের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মদিনা সনদ কোনো ধর্মীয় শাসন ঘোষণাপত্র ছিল না; বরং এটি ছিল একটি লিখিত, চুক্তিভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রাথমিক রূপরেখা। সেখানে মুসলিম ও অমুসলিম সম্প্রদায় সমান নাগরিক মর্যাদা ভোগ করত এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হতো আইন, পারস্পরিক চুক্তি ও স্পষ্ট দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে। ধর্ম এখানে নৈতিক ও মূল্যবোধগত প্রেরণা হিসেবে উপস্থিত ছিল, কিন্তু শাসনব্যবস্থার কাঠামো দাঁড়িয়েছিল নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির ওপর। এই দর্শনের সঙ্গে বিএনপির প্রস্তাবিত ৩১ দফার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। ৩১ দফায় নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক ভারসাম্য, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা মূলত একটি চুক্তিভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকেই ইঙ্গিত করে। মদিনা সনদের মতোই এখানে রাষ্ট্রকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা আদর্শিক আধিপত্যের অধীন না রেখে আইন, সংবিধান ও জবাবদিহির মাধ্যমে পরিচালনার ধারণা প্রাধান্য পেয়েছে। এই কারণেই ৩১ দফাকে কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং একটি বহুত্ববাদী ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাঠামোগত প্রস্তাব হিসেবে দেখা যায়।
আজকের বাংলাদেশে প্রশ্নটি তাই পরিষ্কার- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা কি আদর্শনির্ভর আবেগে বেশি সুরক্ষিত, নাকি প্রতিষ্ঠাননির্ভর শাসনব্যবস্থায়? ইতিহাস বলে, যেসব রাষ্ট্রে ধর্ম সরাসরি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, সেখানে ভিন্নমত সংকুচিত হয়েছে, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ধর্ম তখন ন্যায় প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার না হয়ে ক্ষমতার ঢাল হয়ে ওঠে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর নির্বাচন এই বাস্তবতায় একটি সক্ষমতা পরীক্ষার নাম। ভোটারদের নিজেদেরকে কিছু কঠিন প্রশ্ন করতে হবে। বাংলাদেশ কি আরও রাজনৈতিক অস্থিরতা বহন করতে পারবে? একটি ধর্মীয় আবেগনির্ভর রাজনীতি কি অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক চাপ ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে সামাল দিতে পারবে? কোন দল প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও কূটনীতিকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার প্রমাণিত অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রাখে?
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও টিকে থাকার মৌলিক শর্ত। বিনিয়োগ আসে স্থিতিশীলতার ভেতর দিয়ে, কর্মসংস্থান তৈরি হয় পূর্বানুমেয় রাষ্ট্রব্যবস্থায়, এমনকি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক সহাবস্থানও টিকে থাকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভর করে। যে রাষ্ট্র বারবার পরীক্ষামূলক ও অপরিণত রাজনৈতিক ধারণার মুখোমুখি হয়, সে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নাগরিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
এই বাস্তবতায় আসন্ন নির্বাচন কেবল সরকার বা দল পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়। এটি একটি রাজনৈতিক দর্শন বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। এটি নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে কি না অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও জবাবদিহিমূলক শাসনের ভিত্তিতে, নাকি এমন এক আদর্শিক অনিশ্চয়তার পথে, যার রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব পরীক্ষিত রেকর্ড অনুপস্থিত। প্রতিটি ভোটারকে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ভাবতে হবে, সে কি পরীক্ষিত প্রশাসনিক সক্ষমতা, কাঠামোগত চিন্তা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রদর্শনের পক্ষে দাঁড়াবে, নাকি একটি অস্থির বাস্তবতায় ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষাকে সুযোগ দেবে।
ধর্ম রাষ্ট্রের নৈতিক আলো হতে পারে, মূল্যবোধের প্রেরণা হতে পারে। কিন্তু একটি ভঙ্গুর ও সংকটগ্রস্ত রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করতে হলে প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্পষ্ট সংবিধানিক কাঠামো এবং বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব। নৈতিকতা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা আইন, প্রতিষ্ঠান ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত থাকে, ঠিক যেমনটি মদিনা সনদের দর্শনে দেখা যায়, এবং যার প্রতিফলন একটি কাঠামোগত রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচিতে প্রত্যাশিত।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর ভোট সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে প্রায় ১২.৭৭ কোটি ভোটারকে। ৩০০ সংসদীয় আসনে ৫১টি রাজনৈতিক দল ও ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণে এই নির্বাচন মূলত একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে, বাংলাদেশ কি এগোবে স্থিতিশীল, প্রতিষ্ঠাননির্ভর ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে, নাকি আবারও অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরীক্ষার ঝুঁকি নেবে। এই সিদ্ধান্তের দায় ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ভোটারদের ওপরই রেখে যাবে।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক।

এমএসএম / এমএসএম

তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক দর্শন: উসকানির জবাবে পেশিশক্তি নয়, ধৈর্য ও শৃঙ্খলা!

টেকসই উন্নয়নের জন্য সুশাসন, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য

গুরু পূর্ণিমা: ঐতিহ্য, ইতিহাস ও গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাহাত্ম্য

ঢাকা শহরের বর্জ্যজনিত দুর্ভোগ প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন

স্বাগতম অ্যান্ডি বার্নহাম বিদায় কিয়ার স্টার্মার

রথযাত্রা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি

অপরিকল্পিত নগরায়ণে ডুবছে চট্টগ্রাম, জনসচেতনতা ছাড়া উত্তরণ সম্ভব নয়

বাধ্যতামূলক বাংলা কিউআর : স্মার্ট ইকোনমির আড়ালে ‘ডিজিটাল দাসত্ব’ ও নজরদারির এক নীল নকশা

সামাজিক অবক্ষয়রোধে নান্দনিক দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ অপরিহার্য

কর্মচারী নিয়োগে একাডেমিক সনদের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিৎ

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন অপরিহার্য

পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ

ব্রেক্সিট পরবর্তি ব্রিটিশ রাজনীতি এবং স্টারমারের বিদায়