সাংবাদিকদের গ্রুপিং জাতির জন্য দুঃসংবাদ
সাংবাদিকতা শুধুমাত্র একটি পেশা নয়, সাংবাদিকতা একটি জাতির বিবেক। সত্য, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোই একজন সাংবাদিকের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের দর্পণ, গণতন্ত্রের প্রহরী এবং জনগণের কণ্ঠস্বর। ইতিহাসের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে সাংবাদিকরা ছিলেন সামনে, যুদ্ধের ময়দান থেকে আদালতের কাঠগড়া, রাজপথের আন্দোলন থেকে ক্ষমতার অলিন্দ পর্যন্ত। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, অন্যায়ের মুখোশ খুলে দেওয়া এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার দায়িত্ব সাংবাদিকতার মৌলিক আত্মা। কিন্তু এই আত্মা যখন ভেঙে যায়, যখন সাংবাদিকতা নিজেই বিভক্ত হয়ে পড়ে দল, গোষ্ঠী ও স্বার্থের ভিত্তিতে, তখন শুধু সাংবাদিকতা নয়, পুরো জাতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাংবাদিকদের গ্রুপিং জাতির জন্য যেমন দুর্ভাগ্য তেমন কলঙ্কজনকও।
গ্রুপিং মানে কেবল মতের ভিন্নতা নয়। মতভিন্নতা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, সাংবাদিকতার শক্তি। গ্রুপিং হলো সেই অবস্থা, যেখানে পেশাগত নীতি, সত্য ও জনস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতার সান্নিধ্য ও সুবিধাবাদ প্রাধান্য পায়। যখন সাংবাদিকরা সাংবাদিক হিসেবে নয়, বরং কোনো না কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন, তখন সংবাদ আর সংবাদ থাকে না, তা হয়ে ওঠে প্রচারণা, গুজব কিংবা চরিত্রহননের হাতিয়ার।
একটি জাতি সাংবাদিকতার ওপর বিশ্বাস রাখে এই কারণে যে, সাংবাদিকরা নিরপেক্ষভাবে সত্য তুলে ধরবেন। কিন্তু যখন একই ঘটনার একাধিক সংবাদ ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে উপস্থাপিত হয়, তখন সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। সে বুঝতে পারে না কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা। এই বিভ্রান্তি শুধু তথ্যগত নয়, এটি নৈতিক বিভ্রান্তি। মানুষ তখন সব সংবাদকেই সন্দেহের চোখে দেখে, সাংবাদিকতাকে অবিশ্বাস করতে শেখে। অবিশ্বাসের এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
সাংবাদিকদের গ্রুপিংয়ের অন্যতম বড় কারণ হলো রাজনৈতিক মেরুকরণ। রাজনীতি সমাজের একটি বাস্তবতা, সাংবাদিকরা রাজনীতির বাইরে নন। কিন্তু সাংবাদিকতা আর রাজনীতির সীমারেখা মুছে গেলে বিপর্যয় অনিবার্য। যখন কোনো সাংবাদিক পরিচয়ের আগে নিজেকে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সৈনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার কলম স্বাধীন থাকে না। সে তখন আর প্রশ্ন করে না, বরং নির্দেশ পালন করে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার অবস্থান বদলায়, সংবাদ বদলায়, নীতিও বদলায়। এই পরিবর্তনশীল নৈতিকতা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করে দেয়।
গ্রুপিংয়ের আরেকটি বড় উৎস হলো অর্থনৈতিক স্বার্থ। বিজ্ঞাপন, মালিকানা, কর্পোরেট চাপ, অবৈধ সুবিধা, এসব সাংবাদিকতার বাস্তব চ্যালেঞ্জ। কিন্তু যখন সাংবাদিকরা ব্যক্তিগত লাভের জন্য গোষ্ঠী গড়ে তোলেন, একে অপরকে দমন করেন, ব্ল্যাকমেইলকে পেশার অংশ বানান, তখন সংবাদমাধ্যম জনস্বার্থের জায়গা ছেড়ে ব্যক্তিস্বার্থের বাজারে পরিণত হয়। এই বাজারে সত্যের দাম কম, ক্ষমতার দাম বেশি।
সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো হওয়ার কথা ছিল পেশাগত অধিকার রক্ষার প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এসব সংগঠনও গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে বিভক্ত। একই শহরে, একই পেশার মানুষের একাধিক সংগঠন, একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা, অপপ্রচার, এসব দৃশ্য এখন অস্বাভাবিক নয়। সাংবাদিকদের এই অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তোলে: যারা নিজেদের মধ্যে ঐক্য রাখতে পারে না, তারা সমাজকে কীভাবে সঠিক পথ দেখাবে?
গ্রুপিং সাংবাদিকদের নৈতিক সাহসও দুর্বল করে দেয়। কোনো সাংবাদিক যদি নিজের গোষ্ঠীর অনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখেও নীরব থাকেন, তবে তিনি পেশাগত বিশ্বাসঘাতকতা করেন। আবার ভিন্ন গোষ্ঠীর কেউ একই অপরাধ করলে সেটিকে বাড়িয়ে তুলে ধরেন। এই দ্বিমুখী মানদণ্ড সত্যের সঙ্গে প্রতারণা। ফলে সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাংবাদিকদের গ্রুপিং সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় সংকটকালে। নির্বাচন, গণআন্দোলন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের সময় নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এই সময়েই যদি সাংবাদিকরা বিভক্ত হয়ে পড়েন, কেউ ক্ষমতার ভাষ্য, কেউ বিরোধী পক্ষের ভাষ্য, কেউ আবার গুজব ছড়াতে ব্যস্ত হন, তাহলে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। ভুল তথ্য মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে, সহিংসতা উসকে দিতে পারে। এই দায় ইতিহাস কখনো ক্ষমা করে না।
গ্রুপিং সাংবাদিকদের নতুন প্রজন্মের জন্যও ভয়ংকর বার্তা দেয়। তরুণ সাংবাদিকরা যখন দেখেন, সততা নয় বরং গোষ্ঠীগত আনুগত্যই টিকে থাকার শর্ত, তখন তারা আদর্শ হারায়। তারা শেখে, ভালো রিপোর্ট নয়, সঠিক পক্ষ বেছে নেওয়াই সাফল্যের চাবিকাঠি। এভাবে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
একটি জাতির দুর্ভাগ্য তখনই চূড়ান্ত হয়, যখন সাংবাদিকদের গ্রুপিং ক্ষমতাবানদের জন্য সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। বিভক্ত সাংবাদিক সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। কাউকে সুবিধা দিয়ে, কাউকে ভয় দেখিয়ে, কাউকে মামলা দিয়ে চুপ করানো যায়। ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ হলে ক্ষমতা জবাবদিহির মুখে পড়ে, বিভক্ত হলে ক্ষমতা বেপরোয়া হয়। তাই সাংবাদিকদের গ্রুপিং কেবল পেশাগত সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় শাসনের ভারসাম্য নষ্ট করে।
এই অবস্থার দায় শুধু সাংবাদিকদের নয়; মালিকপক্ষ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সমাজও দায় এড়াতে পারে না। সংবাদমাধ্যমের মালিকানা যদি রাজনৈতিক ও কর্পোরেট স্বার্থে আবদ্ধ থাকে, তাহলে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা কাগুজে হয়ে যায়। রাষ্ট্র যদি সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখে, তাহলে সাংবাদিকরা নিরাপত্তার জন্য গোষ্ঠীর আশ্রয় নেয়। সমাজ যদি হলুদ সাংবাদিকতা পছন্দ করে, দায়িত্বশীল সংবাদকে উপেক্ষা করে, তাহলে গ্রুপিং আরও উৎসাহ পায়।
তবু দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ সাংবাদিকতা একটি নৈতিক পেশা। এখানে ব্যক্তিগত সাহস ও বিবেকের ভূমিকা অপরিসীম। একজন সাংবাদিক চাইলে গোষ্ঠীর চাপ উপেক্ষা করে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন। ইতিহাসে এমন উদাহরণ অগণিত। তারা হয়তো স্বল্পসংখ্যক, হয়তো নিপীড়িত, কিন্তু তারাই সাংবাদিকতার মানচিত্র বদলে দিয়েছেন।
সাংবাদিকদের গ্রুপিং থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম শর্ত হলো নীতিগত ঐক্য। সব বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু সত্য, ন্যায়, মানবাধিকার ও পেশাগত স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনো আপস চলতে পারে না। এই মৌলিক বিষয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে না পারলে সাংবাদিকতা দুর্বলই থাকবে।
দ্বিতীয় শর্ত হলো পেশাগত সংগঠনগুলোর সংস্কার। সাংবাদিক সংগঠন মানে যেন রাজনৈতিক দলের ছায়া না হয়। নেতৃত্ব নির্বাচন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শৃঙ্খলা, সবকিছুতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সংগঠনগুলোকে সদস্যদের নৈতিক প্রশিক্ষণ ও আইনি সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে, ক্ষমতার লেজুড়বৃত্তিতে নয়।
তৃতীয় শর্ত হলো সাংবাদিক শিক্ষার মান উন্নয়ন। সাংবাদিকতা শেখাতে হবে কেবল কারিগরি নয়, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ। নতুন প্রজন্মকে বোঝাতে হবে, সংবাদ মানে প্রভাব নয়, সেবা; কলম মানে অস্ত্র নয়, দায়িত্ব।
চতুর্থ শর্ত হলো সমাজের সমর্থন। নাগরিকদের বুঝতে হবে, স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিকতা তাদেরই স্বার্থ রক্ষা করে। সাংবাদিকদের বিভক্তি দেখে উল্লাস নয়, উদ্বেগ প্রকাশ করতে হবে। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে সমর্থন করতে হবে পাঠক, দর্শক ও শ্রোতাদের মাধ্যমে।
সবশেষে বলতে হয়, সাংবাদিকদের গ্রুপিং কোনো তুচ্ছ অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এটি জাতির বিবেককে ক্ষতবিক্ষত করে। যখন সাংবাদিকরা একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন অন্যায় শক্তিশালী হয়, সত্য দুর্বল হয়। একটি জাতি তখন দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাই সাংবাদিকদের নিজেদের স্বার্থে নয়, জাতির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মতভিন্নতা থাকবে, বিতর্ক থাকবে, কিন্তু গ্রুপিং নয়। কারণ সাংবাদিকদের গ্রুপিং মানেই সত্যের পরাজয়, আর সত্যের পরাজয় মানেই জাতির দুর্ভাগ্য।
একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার সংবাদমাধ্যম সত্যনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও ঐক্যবদ্ধ থাকে। সাংবাদিকদের গ্রুপিং শুধু পেশার নয়, এটি জাতির জন্যই এক গভীর দুঃসংবাদ।
লেখক: সাংবাদিক ও কবি, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।
Aminur / Aminur
সাংবাদিকদের গ্রুপিং জাতির জন্য দুঃসংবাদ
"রাজনীতির মারপ্যাঁচে স্মৃতির কারাগারে আজীবন বন্দী সাদ্দামের করুন আর্তনাদ"
ইসলামের নামে রাজনীতি, নাকি মদিনা সনদের আলোকে ৩১ দফার বাস্তবায়ন: রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা কোন রাজনৈতিক দর্শনে?
এমন একটা সরকার চাই
পবিত্র শবে বরাত: হারিয়ে যেতে বসা আত্মার জন্য এক গভীর ডাক : মোহাম্মদ আনোয়ার
ঘুষ, দালাল ও হয়রানি: জনগণের রাষ্ট্রে জনগণই সবচেয়ে অসহায়!
সুস্থ জীবনের স্বার্থে খাদ্যে ভেজাল রোধ জরুরী
আস্থার রাজনীতি না অনিবার্যতা: তারেক রহমান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক শূন্যতা!
রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কঠিন পরীক্ষায় ত্রয়োদশ নির্বাচন
নির্বাচনী ট্রেইনে সব দল, ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিক জনগণ!
ঈমানের হেফাজতের নগরী মদিনা: মক্কার চেয়ে দ্বিগুণ বরকতের অন্তর্নিহিত রহস্য!
বিপ্লবের আশা-আকাঙ্ক্ষার যেন অপমৃত্যু না হয়