ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞায়, স্পিকার শূন্যতার পরও ১৩তম সংসদের শপথে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত!


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ৫-২-২০২৬ দুপুর ১:২২

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ৩০০ সংসদীয় আসনে ৫১টি রাজনৈতিক দল এবং ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন বেশ সরগরম। প্রায় ১২.৭৭ কোটি ভোটারের মধ্যে নানা ধরনের বিশ্লেষণ চলছে, কারা কোন নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী, কোন দল ১৩তম নির্বাচনে বিজয়ী হবে, বিএনপি না বাংলাদেশ জামাতে ইসলামীর জোট, এবং কে হতে পারে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী। এদিকে দলীয়ভাবে এক দল আরেক দলকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার প্রতিযোগিতাও তুঙ্গে।
তবে ভোট কেন্দ্র, প্রতিদ্বন্দ্বী দল এবং নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নও উঠেছে, কে নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ করাবেন? স্পিকারের শূন্যতা এবং নতুন সংসদের শপথ প্রক্রিয়া কিভাবে সম্পন্ন হবে, তা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ছাত্র–জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেন এবং ৮ আগস্ট প্রফেসর ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস কে প্রধান উপদেষ্টা করে অর্ন্তবর্তী সরকারের সকল উপদেষ্টাগন শপথ নেয়। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের ২৭ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। এ কারণে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার পদ শূন্য কিনা, এবং আগামী নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ কে করাবেন, এসব প্রশ্ন উঠেছে। শিরীন শারমিন চৌধুরী ২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, পদত্যাগের পরও নতুন স্পিকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত শিরীন শারমিন চৌধুরীই স্পিকার হিসেবে গণ্য হবেন। অর্থাৎ ত্রয়োদশ সংসদের নির্বাচিত স্পিকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তিনিই নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ করাবেন।
তবে এই প্রক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। রংপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন (৩৮) নিহত হওয়ার ঘটনায় ২৭ আগস্ট শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক (টুকু) ১৫ আগস্ট গ্রেপ্তার হন। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি হত্যা মামলার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনি বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে আছেন।
এই অবস্থায় সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, “পরবর্তী সংসদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার তার পদে বহাল থাকেন। এখন যেহেতু স্পিকার পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার বন্দী, সংবিধান মেনে চললেও এতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।”
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্রের একমাত্র সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা। সংবিধান অনুযায়ী (অনুচ্ছেদ ১৪৮[১]), যদি স্পিকার না থাকেন বা শপথ প্রদান করতে অক্ষম হন, তখন রাষ্ট্রপতি বা তার মনোনীত ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের শপথ করান। এছাড়াও সংবিধান (অনুচ্ছেদ ৭২[১]) রাষ্ট্রপতিকে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করার ক্ষমতা দেয়। এই মধ্যস্থতার মাধ্যমে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং শপথের পর সংসদের কার্যক্রম, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন, আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং সরকারের ওপর নজরদারি- সুনিশ্চিত হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও সংসদবিষয়ক গবেষক নিজাম উদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, শিরীন শারমিন চৌধুরীর পদত্যাগের ফলে স্পিকার পদে কী হবে, সেটা সংবিধানে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে। নতুন কেউ দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তিনিই স্পিকার রয়েছেন বলে গণ্য হবে। নিজাম উদ্দিন বলেন, নতুন নির্বাচন ছাড়া স্পিকার নির্বাচনের সুযোগ সংবিধানে নেই। সংবিধান বাতিল হলে সেটা ভিন্ন কথা।
বাংলাদেশের সংবিধান নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট। অনুচ্ছেদ ৬৫(২) অনুযায়ী, “জাতীয় সংসদের মেয়াদ প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসর অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবসান হইবে।” এছাড়াও, অনুচ্ছেদ ১২৩(৩) বলে, “সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার পর অনধিক নব্বই দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।”
নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংবিধানে কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নেই। ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার পর নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৯(১) অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের নির্বাচন আয়োজন, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
নির্বাচনের পর সংসদ গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো শপথ গ্রহণ। এ বিষয়ে সংবিধান স্পষ্ট। অনুচ্ছেদ ১৪৮(১) অনুযায়ী, স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান। শপথ গ্রহণের আগে কেউ সাংবিধানিকভাবে সংসদ সদস্য হিসেবে কার্যকর হন না। এখানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা রাজনৈতিক নয়, বরং সাংবিধানিক দায়িত্ব।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(১) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে, যেমন শপথ গ্রহণ করানো, রাষ্ট্রপতি সরাসরি সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। শপথের পর সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭২(১) অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির হাতে থাকে। প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হলে সংসদ পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয় এবং আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন ও নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারি শুরু করে।
উল্লেখ্য, ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নেওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্রপতির ভূমিকে নিয়ে দেশি-বিদেশি বিতর্ক দেখা দেয়। তখন কিছু মহল আন্দোলন ও ভবন ঘেরাও করে দাবি করেছিল, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনকে বাদ দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া হোক। যদি তা করা হতো, তা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক হতো এবং রাষ্ট্রে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হতো। সেই সংকটময় সময়ে এই সম্ভাব্য শূন্যতা এড়াতে বিএনপি, তাদের অতীত রাষ্ট্রক্ষমতার অভিজ্ঞতার আলোকে, সংবিধানকেন্দ্রিক অবস্থান নিয়েছিল এবং রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা অক্ষত রাখতে প্রকাশ্যে সমর্থন প্রদান করেছে। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রপতিকে স্বপদে বহাল রেখে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। এর ফলে আসন্ন নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ এবং সংসদ অধিবেশন আহ্বানে কোনো ধরনের সাংবিধানিক শূন্যতা দেখা দিচ্ছে না। এই কৃতিত্বের দাবীদার নিশ্বন্দেহে বিএনপি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিএনপির এই সময়পোগী সমঝোতা দেশের জন্য বড় ধরনের সাংবিধানিক বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বাদ দিলে শপথ, সংসদ আহ্বান এবং স্পিকার নির্বাচন- এই পুরো প্রক্রিয়া আইনি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতো। বিএনপির সরাসরি সমর্থন সেই ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়েছে।”
বিগত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা না থাকলে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় অচলাবস্থা দেখা দেয়। তাই ১৩তম সংসদ সংবিধানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে যদি- নির্বাচন কমিশন সংবিধান অনুযায়ী কাজ করে। শপথ প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রপতির মধ্যস্থতায় সংসদের প্রথম অধিবেশন সম্পন্ন হয়। স্পিকার নির্বাচন এবং সংসদের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে সংবিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও, রাষ্ট্রপতিকে সংবিধানের ভেতরে রাখার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা অক্ষত রাখা সম্ভব হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির। ভোটের দিন শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরীক্ষা নয়, শপথ থেকে সংসদ কার্যক্রম শুরু হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই হবে সংবিধান মানার পরীক্ষা।
১৩তম সংসদ কেবল নির্বাচনের প্রশ্ন নয়; এটি সংবিধান মানার পরীক্ষাও। রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির নীরব সমঝোতার কারণে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো আপাতত অক্ষত রয়েছে, এবং দেশের জন্য এটি একটি ইতিবাচক পূর্বাভাস।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক. 

এমএসএম / এমএসএম

হ্যাঁ জয় মানেই কি লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সচুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডারের অধিকার আইনগত হবে?

জাতির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে আর কোন ধর্মঘট নয়

নির্বাচন সফল হোক, গণতন্ত্র ফিরে আসুক

তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় জাতীয় নির্বাচন

ঐক্য সরকার নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রয়োজন স্বাধীন ও শক্তিশালী বিরোধী দল!

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে?

পে স্কেল আন্দোলন: সংখ্যার সত্য, রাষ্ট্রের সাহস, আর ‘দুনিয়ার মজদুর

আধিপত্যবাদের ধরন বদলেছে, কিন্তু স্বভাব বদলায়নি

এ নির্বাচন ফ্যাসিবাদকে কবরস্থ করার নির্বাচন—যশোরে হাসনাত আব্দুল্লাহ

চট্টগ্রাম বন্দরকে বাঁচাতে হবে, বাড়াতে হবে কাজের গতি

বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞায়, স্পিকার শূন্যতার পরও ১৩তম সংসদের শপথে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত!

সাংবাদিকদের গ্রুপিং জাতির জন্য দুঃসংবাদ

"রাজনীতির মারপ্যাঁচে স্মৃতির কারাগারে আজীবন বন্দী সাদ্দামের করুন আর্তনাদ"