ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

লাইলাতুল কদরের ইবাদত: বান্দার গুনাহ মাফের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আত্মসমর্পণ অপরিহার্য!


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ১৫-৩-২০২৬ বিকাল ৫:১১

ইসলামের দৃষ্টিতে লাইলাতুল কদর এমন একটি মহিমান্বিত রজনী, যা আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত, ক্ষমা ও নাজাতের দ্বার হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। পবিত্র কুরআনে এই রাত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: ইন্না আনযালনাহু ফি লাইলাতিল কদর। ওয়া মা আদরাকা মা লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর। অর্থাৎ  নিশ্চয়ই আমি একে (কুরআনকে) নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরের রাতে। আর তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সূরা আল-কদর ৯৭:১–৩)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে লাইলাতুল কদর এমন এক রজনী, যখন ইবাদত, তওবা ও দোয়ার মাধ্যমে একজন বান্দা আল্লাহর নিকট বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করতে পারে। তবে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা অনুযায়ী, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পথ কেবল নিজের ইচ্ছামতো ইবাদতের মাধ্যমে নয়; বরং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয়।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন: মান ইউতি‘ইর রাসূলা ফাকদ আতা‘আল্লাহ; ওয়া মান তাওয়াল্লা ফামা আরসালনাকা ‘আলাইহিম হাফীযা। অর্থাৎ যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই আল্লাহর আনুগত্য করল। (সূরা আন-নিসা ৪:৮০)

এখানে আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য আসলে আল্লাহরই আনুগত্য। অর্থাৎ ইসলামে ইবাদত ও ধর্মীয় অনুশীলনের সঠিক পদ্ধতি নির্ধারিত হয়েছে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ ও নির্দেশনার মাধ্যমে।

লাইলাতুল কদরের ইবাদতের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে উম্মতকে বিশেষ কিছু আমল শিক্ষা দিয়েছেন। সহীহ হাদিসে বর্ণিত আছে যে হযরত আয়েশা (রা.) একবার রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন:
“হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি লাইলাতুল কদর পেয়ে যাই, তাহলে আমি কী দোয়া করব?”

রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “তুমি বলবে: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।” অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩)

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে লাইলাতুল কদরের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। কিন্তু সেই ক্ষমা প্রার্থনার পথও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে আমাদের শেখানো হয়েছে।

ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস হলো—নবী মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর শেষ রাসূল এবং মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন: লাকদ কানা লাকুম ফি রাসূলিল্লাহি উসওয়াতুন হাসানাতুন লিমান কানা ইয়ারজুল্লাহা ওয়াল ইয়াওমাল আখিরা ওয়া যাকারাল্লাহা কাছীরা। অর্থাৎ নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে—তার জন্য, যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করেছেন যে মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ইবাদতের ক্ষেত্রে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পথ অনুসরণ করা অপরিহার্য।

এছাড়াও কুরআনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াতে বলা হয়েছে: “বলুন (হে নবী): যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করবেন।” (সূরা আলে ইমরান ৩:৩১)

এই আয়াত ইসলামের একটি গভীর সত্যকে তুলে ধরে—আল্লাহর ভালোবাসা এবং গুনাহ মাফ পাওয়ার পথ হলো নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসরণ। অর্থাৎ, একজন বান্দা যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ক্ষমা কামনা করে, তবে তাকে অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

সুন্নি আকিদা অনুযায়ী, নবী মুহাম্মদ (সা.) কিয়ামতের দিন উম্মতের জন্য শাফাআত (সুপারিশ) করবেন। সহীহ হাদিসে এসেছে: লিকুল্লি নাবিয়্যি দাওয়াতুন মুস্তাজাবাতুন, ওয় আনা কাদা জা‘ল্তু দাওয়াতি লি উম্মতি শাফাআতান ইয়াওমাল কিয়ামা অর্থাৎ প্রত্যেক নবীর একটি দোয়া রয়েছে যা অবশ্যই কবুল হয়। আর আমি আমার সেই দোয়াটি আমার উম্মতের জন্য কিয়ামতের দিনে শাফাআতের জন্য রেখে দিয়েছি! (সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিম)

এর অর্থ হলো, আল্লাহর বিশেষ অনুমতিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মতের জন্য সুপারিশ করবেন, যা অনেক বান্দার মুক্তির কারণ হবে।

নবীজির দোয়া ও শাফাআত আল্লাহর রহমতের একটি মাধ্যম। তাই যারা সত্যিকার তওবা করে, তারা আল্লাহর রহমতের আশায় আশাবাদী থাকতে পারে।

তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এটি মনে রাখা জরুরি যে ক্ষমা করার চূড়ান্ত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতেই। নবী (সা.)-এর শাফাআতও আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কার্যকর হবে না। কুরআনে বলা হয়েছে:

আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৫)*

অতএব, লাইলাতুল কদরের শিক্ষা আমাদেরকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয়:
প্রথমত, আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা ও ইবাদত করা।
দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী ইবাদত পালন করা।
তৃতীয়ত, আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার আশা রাখা।

যে বান্দা এই রাতকে আন্তরিকতার সাথে ইবাদত, দোয়া ও তওবায় কাটায় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে, সে আল্লাহর রহমত লাভের যোগ্য হয়ে ওঠে।

সুতরাং বলা যায়, লাইলাতুল কদর শুধু একটি রাত নয়; এটি এমন এক আধ্যাত্মিক সুযোগ, যখন একজন বান্দা আল্লাহর রহমতের দরজায় কড়া নাড়তে পারে। আর সেই দরজায় পৌঁছানোর পথ হলো আল্লাহর নির্দেশনা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্যের মাধ্যমে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের প্রকৃত মর্যাদা উপলব্ধি করার এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক

এমএসএম / এমএসএম

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়

​বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?

লেখকের কষ্ট

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান

বানিজ্য সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতা

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ