ঢাকা রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলা নববর্ষ উদযাপনে সেকালের আন্তরিকতা ও একালের আধুনিকতা


লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল photo লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
প্রকাশিত: ১২-৪-২০২৬ বিকাল ৬:১১

‎বাংলা নববর্ষ বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন প্রেরণা, নতুনের সূচনা, নতুন আশা, পুরোনো গ্লানি ঝেড়ে ফেলে নতুন করে জীবনকে সাজানোর এক অনন্য উপলক্ষ। সময়ের প্রবাহে এই উৎসবের রূপ, আঙ্গিক ও উদযাপনের ধরনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সেকালের বৈশাখ ছিল সরল, গ্রামীণ এবং ঐতিহ্যনির্ভর, আর একালের বৈশাখ অনেকটাই নগরকেন্দ্রিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিনির্ভর। এই পরিবর্তনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার বিবর্তনের গল্প।

‎বাংলা নববর্ষের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িত কৃষিভিত্তিক সমাজের সঙ্গে। সম্রাট আকবরের সময় রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রচলন হলেও, তা ধীরে ধীরে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। সেকালে নববর্ষ ছিল মূলত কৃষকের উৎসব। বছরের ফসল ঘরে তোলার পর নতুন বছরের শুরুতে জমির হিসাব-নিকাশ, পাওনা-দেনা মিটিয়ে নতুন খাতা খোলার রীতি ছিল।

‎গ্রামবাংলায় নববর্ষ মানেই ছিল মেলা, পান্তা-ইলিশ, লোকসংগীত, পালাগান, যাত্রাপালা এবং গ্রামীণ খেলাধুলা। সকালবেলায় সবাই নতুন পোশাক পরে, বিশেষ করে সাদা-লাল শাড়ি ও পাঞ্জাবি, গ্রামের মন্দির বা আখড়ায় যেতেন। অনেক জায়গায় বৈশাখী মেলা বসত, যেখানে থাকত হস্তশিল্প, মাটির জিনিস, নকশিকাঁথা, বাঁশের তৈরি সামগ্রী। এই মেলাগুলো ছিল গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি বড় অংশ।

‎হালখাতা ছিল নববর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ব্যবসায়ীরা তাদের পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতেন। গ্রাহকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টিমুখ করানো হতো। এতে ব্যবসায়ী ও ক্রেতার মধ্যে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হতো।

‎সেকালের বৈশাখে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। উৎসব ছিল মানুষের অন্তর থেকে উঠে আসা এক আনন্দের প্রকাশ। সেখানে সামাজিক বন্ধন ছিল দৃঢ়, পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল আন্তরিক।

‎বর্তমান সময়ে বাংলা নববর্ষের উদযাপন অনেকটাই বদলে গেছে। শহরকেন্দ্রিক জীবন, প্রযুক্তির প্রসার এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে এই উৎসবের আঙ্গিকেও এসেছে নতুন মাত্রা। এখন পহেলা বৈশাখ শুধু গ্রামেই নয়, শহরের প্রতিটি কোণায় উদযাপিত হয় জাঁকজমকপূর্ণভাবে।

‎ভোরবেলা সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়োজন করে গান, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি। “এসো হে বৈশাখ” গানের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করা এখন এক প্রচলিত রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরজীবনে এটি এক প্রকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

‎বাঙালির জীবনে বাংলা নববর্ষ একটি সচেতন প্রতিফলন। প্রত্যেক জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি প্রভাব বিস্তার করে একটা সুস্থ ও সচেতন মানসগঠনের দায়িত্ব নেয়। সংস্কৃতির মধ্যে অবগাহন করেই মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বের স্পষ্ট একটি রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করে। নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা যে কোনো জাতিকে বড় হওয়ার প্রাথমিক দীক্ষা দেয়।

‎

‎একালের বৈশাখের একটি বড় দিক হলো শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের করা হয়, ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে জাতিসংঘের ইউনেসকো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু গত বছর পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে বের হওয়া শোভাযাত্রার নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। 

‎এই শোভাযাত্রা এবছর থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে হবে বলে গত ৫ এপ্রিল (রবিবার) জানিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে যে বিতর্ক, আমরা তার অবসান চাই। এখন থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে।’

‎তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণসহ অন্যান্য সকল আয়োজন থাকবে। চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়, তার যে যে বৈশিষ্ট্য আছে, সবই থাকবে।’ বিভিন্ন মুখোশ, প্রতীকী ভাস্কর্য, প্রাণীর প্রতিরূপ সব মিলিয়ে এটি এক শিল্পসম্মত প্রতিবাদের ভাষা, যেখানে সমাজের নানা অসঙ্গতির প্রতিফলন দেখা যায়। 

‎তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে বাণিজ্যিকীকরণের ছোঁয়াও। পহেলা বৈশাখ এখন অনেকটাই ব্যবসার একটি বড় সুযোগ হয়ে উঠেছে। ফ্যাশন হাউজগুলো নতুন ডিজাইনের পোশাক বাজারে আনে, রেস্টুরেন্টগুলো বিশেষ খাবারের আয়োজন করে, বিভিন্ন ব্র্যান্ড অফার ও প্রচারণা চালায়। ফলে নববর্ষ উদযাপনের একটি বড় অংশ আজ ভোক্তাবাদী প্রবণতার দিকে ঝুঁকছে, যেখানে সাংস্কৃতিক চেতনার পরিবর্তে কেনাকাটা ও বাহ্যিক প্রদর্শনই মুখ্য হয়ে উঠছে।

‎সেকালে নববর্ষের খাবার ছিল মূলত ঘরোয়া ও সহজ। পান্তা ভাত, শুঁটকি, শাকসবজি, ডাল, ইলিশ মাছ ছিল প্রধান আকর্ষণ। এই খাবারের সঙ্গে ছিল একটি গ্রামীণ স্বাদ ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া।

‎এখনো পান্তা-ইলিশ নববর্ষের প্রতীক হিসেবে রয়েছে, তবে তা অনেকটাই রেস্টুরেন্টকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। অনেকেই বাইরে গিয়ে বিশেষ প্যাকেজে এই খাবার উপভোগ করেন। ফলে ঘরের ভেতরের আন্তরিক আয়োজন অনেক ক্ষেত্রে কমে এসেছে।

‎সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এসেছে পরিবর্তন। আগে লোকসংগীত, বাউল গান, পালাগান ছিল প্রধান আকর্ষণ। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যান্ড সংগীত, আধুনিক গান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লাইভ অনুষ্ঠান ইত্যাদি।

‎একালের বৈশাখ প্রযুক্তির প্রভাবে আরও বিস্তৃত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় এখন খুবই সাধারণ বিষয়। অনলাইনে আয়োজন করা হচ্ছে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান, লাইভ কনসার্ট। প্রবাসী বাঙালিরাও এখন সহজেই এই উৎসবে অংশ নিতে পারছেন।

‎তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতি যেমন সুবিধা এনে দিয়েছে, তেমনি কিছুটা দূরত্বও তৈরি করেছে। আগে যেখানে মানুষ সরাসরি মিলিত হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই তা সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে ভার্চুয়াল যোগাযোগে।

‎সেকালের বৈশাখ ছিল সামাজিক সংহতির এক শক্ত ভিত্তি। সবাই মিলে উৎসব পালন করত, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ছিল কম। গ্রামের সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করত।

‎একালের বৈশাখে এই সংহতি কিছুটা হলেও কমেছে। শহুরে জীবনে মানুষ অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। উৎসব এখন অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

‎তবে ইতিবাচক দিকও আ

এমএসএম / এমএসএম

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়

​বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?

লেখকের কষ্ট

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান

বানিজ্য সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতা

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ