ঢাকা শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬

১৪০ বছরের রেকর্ড ভাঙার পথে "সুপার এল নিনো": ২০২৬ হতে পারে ইতিহাসের উষ্ণতম বছর


আব্দুর রউফ photo আব্দুর রউফ
প্রকাশিত: ২৩-৪-২০২৬ রাত ১০:২৪

প্রকৃতি তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতিশোধ নিতে চলেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে দানা বাঁধছে এমন এক দানবীয় শক্তি, যা গত ১৪০ বছরের সব রেকর্ড চুরমার করে দিতে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এবং মার্কিন জলবায়ু সংস্থা (এনওএএ)-এর ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, পৃথিবী এক প্রলয়ংকরী "সুপার এল নিনো"- মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, ২০২৬ সাল আধুনিক মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়তে পারে। বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরপেক্ষ (নিউট্রাল) অবস্থা বিরাজ করলেও মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬১ শতাংশ। এটি বছরের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, যা বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রাকে নজিরবিহীন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

কেন একে "সুপার এল নিনো" বলা হচ্ছে?

সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের পানি যখন অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন তাকে এল নিনো বলা হয়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)-এর এপ্রিল ২০২৬-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এমন চরম পরিস্থিতিকে বিজ্ঞানীরা "সুপার এল নিনো" হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

সুপার এল নিনোর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি জনজীবনে:

তীব্র দাবদাহ (হিটওয়েভ): ২০২৬ সালের জুন মাসের পর থেকে বাংলাদেশ ভারতে অসহনীয় গরম এবং দীর্ঘমেয়াদী খরা দেখা দিতে পারে।

কৃষি বিপর্যয়: অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং খরার কারণে ধান রবি শস্যের ফলন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পানির স্তর হ্রাস: ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় শহরাঞ্চলেও পানির তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।

বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর ওলটপালট: সুপার এল নিনোর প্রভাবে একদিকের বিশ্ব যখন পুড়বে, অন্যদিক তখন বন্যায় ভাসবে।

অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: এই অঞ্চলে তীব্র পানির হাহাকার এবং বনের আগুনের (ওয়াইল্ডফায়ার) ঘটনা বাড়তে পারে।

আমেরিকা পূর্ব আফ্রিকা: দক্ষিণ আমেরিকা এবং পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি প্রলয়ংকরী বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

টাইফুন ঘূর্ণিঝড়: প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কেবল একটি আবহাওয়া পরিবর্তন নয়, বরং "ক্লাইমেট রেজিম শিফট" ২০১৫ সালের সুপার এল নিনোর ফলে ইথিওপিয়া পুয়ের্তো রিকোয় যে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল, ২০২৬ সালের এই ঘটনা সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সময় থাকতে সচেতন না হলে এবং যথাযথ প্রস্তুতি না নিলে কৃষি, অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্য ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। প্রকৃতি তার শেষ সীমানায় পৌঁছে যাওয়ার আগে বিশ্ববাসীকে এখনই সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সুপার এল নিনোর মতো প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ কৃষিপ্রধান দেশের জন্য এখনই পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা পরিকল্পনা এই ঝুঁকি অনেকাংশেই কমিয়ে আনতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশের করণীয় পদক্ষেপগুলো:

. কৃষি খাতের সুরক্ষা: বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর, তাই খরা তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাব সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার ওপর পড়ে।

খরা-সহনশীল জাতের চাষ: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই) উদ্ভাবিত খরা-সহনশীল ধানের জাতগুলো (যেমন: ব্রি ধান-৫৬, ৬৬ বা ৭১) কৃষকদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে হবে।

বিকল্প ফসল চাষ: ধান চাষে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। এল নিনোর প্রভাবে পানির সংকট দেখা দিলে গম, ভুট্টা, ডাল বা তৈলবীজের মতো কম পানি সাশ্রয়ী ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে।

সেচ ব্যবস্থাপনা: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের (রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং) ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির অপচয় রোধে "ফিতা পাইপ" বা "ড্রিপ ইরিগেশন" পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।

. পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা: এল নিনোর প্রভাবে নদ-নদী ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যায়।

জলাশয় সংস্কার: খাল, বিল এবং পুকুর খনন পুনঃখনন করতে হবে যাতে খরার সময় পর্যাপ্ত পানি মজুত থাকে।

শিল্প গৃহস্থালিতে পানি সাশ্রয়: পানির অপচয় রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং জনগণকে সচেতন করতে হবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে পানির অপচয় বন্ধে প্রচারণা চালানো জরুরি।

. জনস্বাস্থ্য হিটওয়েভ ব্যবস্থাপনা: তীব্র গরমে হিটস্ট্রোকসহ নানা পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়।

হিট অ্যাকশন প্ল্যান: প্রতিটি জেলা উপজেলা পর্যায়ে "কুলিং সেন্টার" বা সাধারণ মানুষের বিশ্রামের জন্য ঠান্ডা জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে।

হাসপাতালের প্রস্তুতি: সরকারি হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক ডিহাইড্রেশন আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষ ইউনিট এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ (যেমন: ওরাল স্যালাইন) মজুত রাখতে হবে।

সচেতনতা বৃদ্ধি: ভরদুপুরে রোদে বের না হওয়া, ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরা এবং প্রচুর পানি তরল খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।

. বিদ্যুৎ জ্বালানি নিরাপত্তা:  অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়, যা গ্রিডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

সুষ্ঠু বিদ্যুৎ বণ্টন: হাসপাতাল জরুরি সেবা কেন্দ্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিক লোডশেডিং পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

সৌরশক্তির ব্যবহার: এল নিনোর সময় আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং কড়া রোদ পড়ে, এই সুযোগে সৌর প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডের চাপ কমানো সম্ভব।

. দুর্যোগের পূর্বাভাস সামাজিক নিরাপত্তা: ডিজিটাল অ্যালার্ট: আবহাওয়ার পরিবর্তনের খবর সরাসরি কৃষকদের মোবাইল ফোনে এসএমএস বা অ্যাপের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে।

খাদ্য মজুত: সম্ভাব্য কৃষি বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে সরকারি গুদামগুলোতে পর্যাপ্ত চাল গম মজুত রাখতে হবে যাতে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ফসল বিমা (ক্রপ ইন্সুরেন্স): প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে শস্য বিমা চালু করা একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে।

সুপার এল নিনো মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে সারা দেশে প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগানো এবং বনভূমি রক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই। বৃক্ষরোপণই পারে প্রকৃতির এই রুদ্ররূপকে শান্ত করতে।

এমএসএম / এমএসএম

১৪০ বছরের রেকর্ড ভাঙার পথে "সুপার এল নিনো": ২০২৬ হতে পারে ইতিহাসের উষ্ণতম বছর

কিয়ারা আদভানির ত্বক কেন এত উজ্জ্বল? কারণ জেনে নিন

গ্রীষ্মের ছাতা বাছাই করার আগে জেনে নিন

এই কুলফি মালাই...

কৃষকের ভাগ্য বদলাতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননে নামলেন তারেক রহমান

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চেয়েও দ্রুত নামছে মাটির স্তর

স্মার্টফোনের নেশায় শৈশব বিপন্ন: ‘ডিজিটাল মাদকে’ বুঁদ শিশু থেকে অভিভাবক

র‍্যাগিং নয়, সম্মানই হোক ক্যাম্পাসের সংস্কৃতি

ফ্রিজের বরফ জমা মাছ-মাংস দ্রুত নরম করার কৌশল

পূর্ণিমা রাতে লঞ্চভ্রমণ: নদী, জোছনা ও নিঃসঙ্গতার ত্রিভুজপ্রেম

দরজায় কড়া নাড়ছে দেবী দুর্গার আগমনীবার্তা

দরজায় কড়া নাড়ছে দেবী দুর্গার আগমনীবার্তা

ফেসবুক ছিল বিনোদনের জায়গা, এখন আয়ের মূল উৎস