ঢাকা শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

কবি নজরুলের ধূলিমাখা স্মৃতি : ত্রিশালের দুই বাড়িতে আজও জীবন্ত কবি


ত্রিশাল প্রতিনিধি  photo ত্রিশাল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২২-৫-২০২৬ দুপুর ৩:১০

তৎকালীন ভারতের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম হলেও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আজ বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে অমর হয়ে আছেন। শৈশব ও কৈশোরজুড়ে দুঃখ-দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া এই কবি খুব অল্প বয়সেই হারান মা-বাবাকে। জীবিকার তাগিদে কখনও মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ, কখনও লেটো দলে গান লেখা, আবার কখনও রুটির দোকানে শ্রমিক হিসেবেও কাজ করতে হয়েছে তাকে।

ভারতের আসানসোলের একটি রুটির দোকানে কাজ করার সময় নজরুলের অসাধারণ প্রতিভায় মুগ্ধ হন দারোগা রফিজউল্লাহ। ১৯১৪ সালে তিনি কিশোর নজরুলকে নিজের সঙ্গে ময়মনসিংহের ত্রিশালে নিয়ে আসেন। সেই থেকেই ত্রিশালের মাটিতে শুরু হয় কবির জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজও উপজেলার দুটি বাড়ি বহন করে চলেছে সেই স্মৃতিময় সময়ের ইতিহাস।

দারোগা বাড়ি: ত্রিশালে নজরুলের প্রথম আশ্রয়:
ত্রিশাল উপজেলার কাজীর শিমলা গ্রামে অবস্থিত দারোগা রফিজউল্লাহর বাড়িই ছিল কবি নজরুলের প্রথম আবাসস্থল। এখানেই তিনি আশ্রয় পান এবং নতুনভাবে শিক্ষাজীবন শুরু করার সুযোগ লাভ করেন।

প্রথমে দারোগা সাহেব নজরুলকে ভর্তি করানোর জন্য ময়মনসিংহ সিটি স্কুলে পাঠান। স্কুলটি নজরুলের পছন্দ হলেও জায়গীরের ব্যবস্থা না হওয়ায় সেখানে পড়াশোনার সুযোগ হয়নি তার। পরে তাকে ভর্তি করানো হয় দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে, যা বর্তমানে নজরুল একাডেমি নামে পরিচিত।

কাজীর শিমলা গ্রাম থেকে দরিরামপুরের দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। প্রতিদিন সেই পথ হেঁটে স্কুলে যেতে হতো কিশোর নজরুলকে। বর্ষাকালে কাদাময় রাস্তায় চলাচল হয়ে উঠত দুর্বিষহ। কবির কষ্টের কথা বিবেচনা করে দারোগা রফিজউল্লাহ তাকে ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামের আত্মীয় কাজী হামিদুল্লাহর বাড়িতে জায়গীর রাখেন।

কিন্তু হামিদুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত গম্ভীর ও ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি। নজরুলের স্বাধীনচেতা স্বভাব, নিয়মিত নামাজ না পড়া এবং সৃজনশীল মনোভাব তাকে বিরক্ত করত। ফলে নানা শাসন ও বিধিনিষেধের মধ্যে থাকতে হতো নজরুলকে। ধীরে ধীরে সেখানে তার অবস্থান কঠিন হয়ে ওঠে এবং একসময় তিনি আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন।

বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি: কবির স্মৃতিমাখা আরেক ঠিকানা:
পরবর্তীতে নজরুল আশ্রয় নেন ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে। বাড়ির পূর্বপাশে একটি ছোট পুকুরের ধারে ছোট্ট একটি ঘরে থাকতেন তিনি। সেখানেই কাটে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়।
ত্রিশালের এই দুই বাড়িতে মিলিয়ে প্রায় এক বছর অবস্থান করেছিলেন কবি নজরুল।

কিন্তু এই স্বল্প সময়েই তিনি ত্রিশালের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন। শতাধিক বছর পেরিয়ে গেলেও ত্রিশালের বাতাসে আজও যেন ভেসে বেড়ায় বিদ্রোহী কবির স্মৃতি।

স্মৃতিকেন্দ্রে জীবন্ত ইতিহাস:
কবির বসবাসের এই দুই বাড়িকে সংরক্ষণ করে গড়ে তোলা হয়েছে নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র। নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে নির্মিত কেন্দ্র দুটি বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। চারপাশের শান্ত পরিবেশ যেন এখনও কবির স্মৃতিকে জীবন্ত করে তোলে।
শুক্রবার (২২মে) কাজীর শিমলার দারোগা বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দ্বিতল ভবনের নিচতলায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে কাঠের তৈরি একটি খাট, যেখানে থাকতেন কবি নজরুল। একই তলায় রয়েছে একটি ছোট মিলনায়তন এবং ওপরতলায় গড়ে তোলা হয়েছে পাঠাগার। সেখানে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন বই ও কবির বংশধরদের ছবি।

নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সেখানে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল। স্মৃতিকেন্দ্রের গ্রন্থাগারিক রাসেল হোসেন বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যা খুবই কম।কেন্দ্রটিকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করা গেলে মানুষের আগ্রহ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া কবির ব্যবহৃত খাটটির সঠিক সংরক্ষণের বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে, নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ির স্মৃতিকেন্দ্রটিতে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। তিনতলা ভবনের নিচতলায় রয়েছে মিলনায়তন, দ্বিতীয় তলায় দাপ্তরিক কার্যক্রম এবং তৃতীয় তলায় গড়ে তোলা হয়েছে স্মৃতিকেন্দ্র ও গ্রন্থাগার।

এখানে কবির একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে একটি পুরোনো গ্রামোফোন। দেয়ালজুড়ে রয়েছে কবির নানা ছবি এবং তার হাতের লেখা কবিতা বাঁধাই করে টাঙানো হয়েছে।

স্মৃতিকেন্দ্রটির চারপাশজুড়ে সবুজ গাছপালা ও সামনে শানবাঁধানো পুকুরঘাট—সব মিলিয়ে মনোরম পরিবেশ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। মূল ভবনের পাশেই রয়েছে কবির থাকার সেই ঐতিহাসিক ঘর। মূল কাঠামো ঠিক রেখে নতুনভাবে টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে।

জন্মজয়ন্তীতে উৎসবের আমেজ:
বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ির বংশধর মো. আবুল কাশেম বলেন, প্রতিবছর কবির জন্মদিনে এখানে বড় আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গুণীজনেরা আসেন। দিনটি তাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের।

স্থানীয়দের মতে, নামাপাড়া গ্রামেই অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ির স্মৃতিকেন্দ্রে প্রতিদিনই শিক্ষার্থীদের আনাগোনা থাকে। তবে কাজীর শিমলার দারোগা বাড়িতে দর্শনার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। প্রতিদিন হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ সেখানে যান।

শুক্রবার, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত স্মৃতিকেন্দ্র দুটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারিয়া ইয়াসমিন বলেন, কাজির শিমলায় প্রতিষ্ঠিত নজরুল স্মৃতিকেন্দ্রের নামে ‘স্মৃতি’ থাকলেও সেখানে কবির ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত নেই। তিনি বলেন, স্মৃতিকেন্দ্রে নজরুলের জীবনী ও কর্মজীবনের তথ্যসমৃদ্ধ গ্যালারি, কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও দুর্লভ ছবির প্রদর্শনী, অডিও-ভিডিও কর্নার, যেখানে নজরুলসংগীত ও কবিতা আবৃত্তি শোনা যাবে এমন আয়োজন থাকা প্রয়োজন ছিল।
তিনি আরও বলেন, দর্শনার্থীদের জন্য বিশ্রামাগার ও বসার সুন্দর ব্যবস্থা, নিরাপদ পানীয় পানি, পরিচ্ছন্ন টয়লেট, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গাইড বা তথ্যকেন্দ্র, প্রতিবন্ধীবান্ধব চলাচলের সুবিধা এবং ফ্রি ওয়াই-ফাই ও ডিজিটাল তথ্যসেবা চালু করা জরুরি।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার মাস্টার বলেন, সংরক্ষণের অভাবে নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান ও স্মৃতিচিহ্ন ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কবির স্মৃতিধন্য শুকনি বিলসহ অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছে। এমনকি যে বটবৃক্ষের নিচে বসে কবি সাহিত্যচর্চা করতেন, সেটিও এখন অবহেলায় পড়ে আছে।

সীমিত দর্শনার্থী, বাড়ানোর দাবি:
নজরুল ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষণ সহকারী ও বই বিক্রির দায়িত্বে থাকা মো. আল-আমিন তালুকদার বলেন, দারোগা বাড়িতে পাঠাগারে খুব বেশি পাঠক আসেন না। দর্শনার্থীর সংখ্যাও সীমিত। মাসে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জনের বেশি মানুষ আসে না। তবে বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ির স্মৃতিকেন্দ্র টিতে প্রতিদিন দর্শনার্থী আসে।

স্মৃতিকেন্দ্রের সহকারী পরিচালক
মো. ফয়জুল্লাহ রোমেল বলেন, বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ির কেন্দ্র থেকেই দুটি স্মৃতিকেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বর্তমানে দুই কেন্দ্রেই শিশুদের জন্য নজরুল সংগীত প্রশিক্ষণ চালু রয়েছে। বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে ৩২ জন এবং দারোগা বাড়িতে ৩১ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সপ্তাহে দুই দিন এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ভবিষ্যতে আবৃত্তি ও নৃত্য প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুই স্মৃতিকেন্দ্রেই আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

শতাধিক বছর পেরিয়ে গেলেও ময়মনসিংহের
ত্রিশালের মাটিতে কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত এই দুটি বাড়ি শুধু স্থাপনা নয়, এগুলো বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির এক গৌরবময় ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। আজও যেন জীবন্ত হয়ে আছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি। যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে এগুলোকে আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি স্থানীয়দের।

এমএসএম / এমএসএম

রাজস্থলীতে আগুনে পুড়ে নিঃস্ব, খোলা আকাশের নিচে পরিবারটি বসবাস

বরগুনায় কোটি টাকার অবৈধ রেনুপোনা জব্দ

কবি নজরুলের ধূলিমাখা স্মৃতি : ত্রিশালের দুই বাড়িতে আজও জীবন্ত কবি

লাকসামে আমরা জুয়েলারী পরিবার’র পনুর্মিলনী অনুষ্ঠিত

রৌমারীতে ৩দিন ব্যাপী ভুমিসেবা মেলা সমাপনী অনুষ্ঠিত

দেশের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী সহযোগী হিসেবে সবাইকে জোরালো ভূমিকা রাখেতে হবে প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

শিশু রামিসা হত্যার বিচার ও শিশুদের নিরাপত্তার দাবিতে তেঁতুলিয়ায় মানববন্ধন

বাগেরহাটের মোল্লাহাটে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রান গেল দু’জনের

পাকশী ডেইরী ফার্মে দেশী,জার্সি ফিজিয়ানসহ কয়েকটি জাতের গরু পালন করে ব্যাপক সারা

কুড়িগ্রামে দুধকুমর নদীর উপর কালিগঞ্জ সেতু নির্মাণের স্থান পরিদর্শন

শ্রীমঙ্গলে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা তিন সুন্ধি কাছিম উদ্ধার

​রাণীনগরে নানা নাটকীয়তা শেষে ৬৩৯ দিন পর প্রধান শিক্ষকের যোগদান

তেঁতুলিয়ায় ওয়ারেন্ট তামিলে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্যের উপর হামলা, হাসপাতালে ভর্তি