করাতকলের জীবন
সাভারের নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পলাশ স'মিল। সামনে পড়ে আছে নানা আকারের হরেক রকম কাঠের গুঁড়ি। কোনোটি বিশাল, কোনোটি ছোট, অপেক্ষা শুধু চেরাই হওয়ার। পাশ দিয়ে ছুটে চলছে একের পর এক গাড়ি। মহাসড়কের ব্যস্ততায় চারপাশ মুখরিত।
কিন্তু গাড়ির হর্ন আর ইঞ্জিনের গর্জন ছাপিয়ে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি কানে আসে; সেটি কোনো গাড়ির নয়। গাছ চেরাই করার করাতকলের শব্দ। চিন... চিন... কড় কড়! ধারালো করাতের দাঁতে মুহূর্তেই আস্ত কাঠের গুঁড়ি ভাগ হয়ে যাচ্ছে তক্তায়। এই শব্দের সঙ্গে প্রতিদিন মিশে যাচ্ছে কিছু মানুষের ঘাম, ক্লান্তি আর জীবনের গল্প।
যে কাঠ চেরাই হয়ে আমাদের ঘরের দরজা-জানালা, আসবাব কিংবা প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী হয়ে ওঠে; সেই কাঠের পেছনে থাকা মানুষগুলোর জীবন কেমন? করাতের ধারালো দাঁতের সামনে দাঁড়িয়ে কীভাবে দিন কাটে তাদের? মুহূর্তেই একটি আস্ত কাঠের গুঁড়ি হয়ে যায় অসংখ্য তক্তায়, কাঠের টুকরো আর করাতের গুঁড়ো।
কিন্তু এই কাঠ চেরাইয়ের আড়ালে যে জীবনগুলো প্রতিদিন চেরাই হয়, তাদের গল্প কতজনই বা জানি? জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে কাজ করা সেই মানুষগুলোর গল্পই ‘'করাতকলের জীবন’।
সকাল গড়ানোর আগেই তারা ছুটে আসেন স'মিলে। কারও হাতে করাত, কারও হাতে ভারী কাঠের গুঁড়ি। কেউ কাঠ মাপেন, কেউ চেরাই করেন, আবার কেউ কাঠ সরিয়ে স্তূপ করে রাখেন। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। কাঠের সঙ্গে তাদের এই যুদ্ধ। একদিকে জীবিকার তাগিদ, অন্যদিকে প্রতি মুহূর্তে দুর্ঘটনার ভয়। একটু অসাবধানতা, একটি ভুল মুহূর্ত, আর ঘূর্ণায়মান করাতের ধারালো দাঁত কেড়ে নিতে পারে হাত, আঙুল, এমনকি জীবনও। তবু থেমে থাকে না স'মিলের চাকা। কারণ, এই মানুষগুলোর কাছে কাজ মানেই শুধু কাজ নয়, এটাই তাদের পরিবারের ভাত, সন্তানের পড়াশোনা, ঘরের ভাড়া, অসুস্থ বাবা-মায়ের ওষুধ, কিংবা ছোট্ট সংসারের স্বপ্ন।
করাতের শব্দ যখন চারপাশ কাঁপিয়ে তোলে, তখন হয়তো পাশের মানুষটি শুধু কাঠ কাটার শব্দই শুনতে পান। কিন্তু একজন শ্রমিক শুনতে পান তার সন্তানের ভবিষ্যতের ডাক।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাঠ টেনে নেওয়া, মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, ভারী তক্তা সরানো, শরীরের ওপর পড়ে কি যে প্রচণ্ড চাপ। তারপরও ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফেরেন তারা। ঘরে অপেক্ষায় থাকে পরিবার। কেউ হয়তো প্রশ্ন করে, ‘আজ কেমন গেল কাজ?’ কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তরে কতটা ভয়, কতটা ক্লান্তি আর কতটা অনিশ্চয়তা লুকিয়ে থাকে, তা হয়তো পরিবারের মানুষও সবসময় জানতে পারেন না।
স'মিলে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চোখে সুরক্ষাচশমা, কানে শব্দরোধী সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় গ্লাভস, শক্ত জুতা এবং যথাযথ পোশাক। এসব শুধু নিয়ম মানার বিষয় নয়; এসব হতে পারে একটি জীবন বাঁচানোর উপায়। কারণ ঘূর্ণায়মান করাত কোনো ভুল ক্ষমা করে না। মেশিন চালুর আগে সেটি ঠিক আছে কি না, করাতের দাঁত ও অন্যান্য অংশ নিরাপদ অবস্থায় আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। মেশিন চলার সময় অযথা কাছে যাওয়া, হাত দিয়ে কাঠ ঠেলে দেওয়া কিংবা অসাবধানভাবে কাঠ সরানোর চেষ্টা ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো পরিচ্ছন্নতা। স'মিলে পড়ে থাকে কাঠের টুকরো, করাতের গুঁড়ো ও বর্জ্য। এসব জমে থাকলে শুধু কাজের পরিবেশই অস্বাস্থ্যকর হয় না, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। তাই নিয়মিত মেঝে পরিষ্কার করা, করাতের গুঁড়ো সরিয়ে রাখা, মেশিনের চারপাশে চলাচলের জায়গা পরিষ্কার রাখা এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করা জরুরি। কারণ নিরাপদ কর্মপরিবেশ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি শ্রমিকের অধিকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জীবিকার প্রয়োজনে অনেক শ্রমিকই নিরাপত্তার চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য হন। হয়তো সংসারে চাল নেই, হয়তো সন্তানের স্কুলের বেতন বাকি, হয়তো বাড়িওয়ালা ভাড়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। তাই ঝুঁকি দেখেও তারা পিছিয়ে যান না।
করাত ঘোরে। কাঠ চেরাই হয়। করাতের গুঁড়ো উড়ে বাতাস ভারী করে। আর সেই ধুলোমাখা পরিবেশের মাঝেই একজন শ্রমিক খুঁজে ফেরেন তার পরিবারের আগামীকাল।
একটি কাঠের গুঁড়ি যখন চেরাই হয়ে সুন্দর আসবাবে পরিণত হয়, তখন আমরা তার সৌন্দর্য দেখি। কিন্তু, সেই কাঠের পেছনে থাকা শ্রমিকের ঘাম দেখি না। একটি দরজা, একটি জানালা, একটি টেবিল কিংবা একটি খাট, আমাদের ঘরের প্রতিটি কাঠের জিনিসের সঙ্গে কোথাও না কোথাও মিশে আছে একজন শ্রমিকের পরিশ্রম। তাদের হাতের ঘাম শুকিয়ে যায়, কাঠ শুকিয়ে যায়, কিন্তু সংসারের প্রয়োজন কখনো শুকায় না।
তাই স'মিলের এই শ্রমিকদের প্রয়োজন শুধু কাজ নয়, নিরাপদ কাজ। প্রয়োজন নিয়মিত স্বাস্থ্যসচেতনতা, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং পরিচ্ছন্ন কর্মপরিবেশ। কারণ একজন শ্রমিক আহত হলে শুধু একটি মানুষ আহত হন না, তার সঙ্গে থমকে যায় একটি পরিবার। একজন শ্রমিকের হাত হারালে হারিয়ে যেতে পারে সন্তানের পড়াশোনা। একজন শ্রমিকের জীবন থেমে গেলে থেমে যেতে পারে একটি পুরো সংসারের স্বপ্ন। স'মিলের শব্দ তাই শুধু কাঠ চেরাইয়ের শব্দ নয়। এই শব্দের ভেতরে আছে শ্রমের গল্প, আছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, আছে পরিবারের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার গল্প। আর আছে এক অদৃশ্য প্রশ্ন, কাঠকে আমরা যত্ন করে ব্যবহার করি, তাহলে যে মানুষটি সেই কাঠকে আমাদের ঘরের উপযোগী করে তোলেন, তার জীবনটুকুর যত্ন কি আমরা নিতে পারি না?
করাত চলুক, কাঠ চেরাই হোক। কিন্তু চেরাই না হোক কোনো মানুষের স্বপ্ন। ভেঙে না যাক কোনো পরিবারের ভবিষ্যৎ। কারণ কাঠের জীবন হয়তো একদিন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একজন শ্রমিকের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পুরো পরিবারের জীবন।
এমএসএম / এমএসএম
সরকারি কোয়ার্টারের দেড় লাখ টাকা ভাড়া বকেয়া: কুড়িগ্রামের প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি
সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধার অভিযোগ, শিক্ষকের ব্যাখ্যা চাওয়ার উদ্যোগ
কেশবপুরে সরকারি সম্মানির তালিকায় অনিয়ম, জামায়াতের দুই নেতাকে অব্যাহতি
সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল ও কোটচাঁদপুর থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে আন্তঃবিভাগীয় অজ্ঞান পার্টির ২ সদস্য গ্রেফতার
উলিপুরে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে নাশকতা আওয়ামীলীগ নেতা গ্রেফতার
নিলাম ছাড়াই সরকারি ঘেরের মাছ বিক্রি, আদালতের রিসিভার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ
বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে মানাহিল ফাউন্ডেশনের নগদ অর্থ সহায়তা
ভূরুঙ্গামারীতে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের উন্নয়ন সোসাইটির সংবর্ধনা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠানের পিতার ইন্তেকাল
দুর্ভোগের নাম নবীনগর কলেজপাড়া সড়ক, জমি বিরোধ মেটাতে শুক্রবার সালিশ
রায়গঞ্জে এমপি আয়নুল হকের ওপর হামলা: প্রধান আসামি তমাল সরকার গ্রেপ্তার
উল্লাপাড়ায় হেরোইনসহ নারী মাদক কারবারি র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার