বিলীনের পথের সারথি ঐতিহ্যবাহী হা-ডু-ডু খেলা
একসময়ে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা ছিল হা-ডু-ডু খেলা। তখন বাড়ির আঙিনা, স্কুলমাঠ, হাট-বাজার, কাটা ধানের ক্ষেত বা উন্মুক্ত স্থানে জমজমাট ও উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজন করা হতো হা-ডু-ডু খেলা। কিন্তু এখন আর শোনা যায় না হা-ডু-ডু খেলার মাঠের চিৎকার-উল্লাস। কালের বির্বতন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় আর প্রযুক্তির কারসাজিতে সেই ঐতিহ্য আজ বিলীন হতে বসেছে।
'হা-ডু-ডু-ডু-ডু..' কিংবা 'কাবাডি-কাবাডি-কাবাডি..'একদমে উচ্চারিত এই শব্দগুলো একসময়ে বেশ জনপ্রিয় ছিল। খেলাটির সাথে বাঙালির ঐতিহ্যের একটা সংযোগ রয়েছে। রয়েছে আবেগ অনুভুতির নিবিড় সেতুবন্ধন। এদেশের মাটি ও মানুষের সাথে মিশে ছিল হা-ডু-ডু খেলা। এ খেলায় একজন খেলোয়াড় লম্বা দম নিয়ে 'হা-ডু-ডু' বা 'কাবাডি...কাবাডি' উচ্চারণে প্রতিপক্ষকে ছুঁয়ে বেরিয়ে আসে। প্রতি দলের কোনো খেলোয়াড় একের পর এক কাবাডি কাবাডি বলে প্রতিপক্ষের দলে প্রবেশ করে প্রতিপক্ষের কাউকে স্পর্শ করলে, দল পয়েন্ট পায় এবং যে প্রতিপক্ষ দলের যে খেলোয়াড়কে ছোঁয়া হয়, সে বাদ যায়। অন্যদিকে, যদি প্রতিদ্বন্দ্বী দলে প্রবেশ করে দলকে ছুঁতে গিয়ে ধরা পড়ে, দম রাখতে রাখতে যদি সে তার সীমানায় ফিরে আসতে না পারে, তবে খেলোয়াড়টি খেলা থেকে বাদ পড়ে যায়। জয় বা পরাজয় নির্ভর করে, একদিকে কতজন লোক অন্যকে স্পর্শ করে বা ধরে বাদ দিতে পারে তার ওপর। খেলার প্রতিটি মুহূর্তেই দর্শক সারির চিৎকার চেচামেচিতে মুখরিত থাকে চারদিক। খেলার মাঠের পরিবেশ তাদের ছন্দ বচন ভঙ্গিতে উত্তাল করে রাখত। আবার বিজয়ীদের সেই সময়ের সাদা-কালো টেলিভিশন, টেপ রেকর্ডার, চায়না ফনিক্স সাইকেল ও মেডেল দেওয়া হতো। সেরা খেলোয়াড়দের উপহার দেওয়া হতো এভারেটি টর্চ লাইট কিংবা ঘড়ি। এসব ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচলন।
উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বয়স্কদের সাথে কথা বললে তারা সকালের সময়কে বলেন, হা-ডু-ডু বাংলাদেশের জাতীয় খেলা। নব্বই দশকের দিকে গ্রামবাংলায় এই খেলা ধুমধাম করে উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজন করা হতো। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও বিদেশি খেলার কাছে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই হা-ডু-ডু খেলা। ক্রিকেট, ফুটবল, বাসকেট বলের মতো আধুনিক খেলার কাছে এখন প্রায় বিলিনের পথে জনপ্রিয় এই হা-ডু-ডু অথবা কাবাডি খেলা। এখন অনেক বাচ্চারা এই খেলার নিয়মই জানে না। এনকি অনেকে হয়তো জানে না এই খেলার নামও। এখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে হা-ডু-ডু শুধু পাঠ্যপুস্তকের কেবল একটি নাম। আমাদের উচিত বর্তমান প্রজন্মেকে খেলা ধুলায় উৎসাহিত করার পাশাপাশি হা-ডু-ডু খেলার প্রতি মনোনিবেশ করা। তাই এর জন্য চাই যথাথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা।
হা-ডু-ডু সম্পর্কে জানতে কথা হয় ক্রিড়া শিক্ষক নূর মিয়ার সাথে তিনি বলেন, কাবাডি বাংলাদেশের জাতীয় খেলা। মূলত হা-ডু-ডু নামটির পোশাকী নাম কাবাডি। হা-ডু-ডু বা কাবাডি খেলার ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭২ সালে কাবাডিকে বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরের বছর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের অপেশাদার কাবাডি ফেডারেশন গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং বার্মার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এশিয়ান কাবাডি ফেডারেশন গঠন করা হয়। তবে ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কলকাতায় এশিয়ান কাবাডি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সালে প্রথমবারের মতো বেইজিং এ অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে অন্তর্ভুক্ত হয় কাবাডি। যদিও বাংলাদেশ সরকার যদিও ১৯৯৯ সালে আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় কাবাডি খেলার অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এখন এ খেলার বাস্তবায়ন তেমন চোখে পড়ে না।
তিনি আরও বলেন, হা-ডু-ডু বা কাবাডি খেলায় বালকদের মাঠ লম্বায় ১২.৫০ মিটার, চওড়ায় ১০ মিটার হয়। বালিকাদের কাবাডি খেলার মাঠ লম্বায় ১১ মিটার, চওড়ায় ৮ মিটার হয়। খেলার মাঠের ঠিক মাঝখানে একটি লাইন টানা থাকে, যাকে মধ্যরেখা বা চড়াই লাইন বলে। এই মধ্যরেখার দু’দিকে দু’অর্ধে দু’টি লাইন টানা হয়, যাকে কোল লাইন বলে। মৃত বা আউট খেলোয়াড়দের জন্য মাঠের দুই পাশে ১ মিটার দূরে দুটি লাইন থাকে যাকে লবি বলা হয়। হা-ডু-ডু বা কাবাডি খেলার নিয়ম সম্পর্কে তিনি জানান, খেলায় দুটি দল অংশ নিতে পারে। প্রতি দলে ১২ জন করে। তবে মাঠে ৭ জনের বেশি নামতে পারে না। বাকি ৫ জন অতিরিক্ত খেলোয়াড় থাকে। খেলা চলার সময় ৩ জন খেলোয়াড় পরিবর্তন হতে পারে। এছাড়া খেলার সময় বিরতিসহ পুরুষদের জন্য ২৫ মিনিট আর মেয়েদের জন্য ২০ মিনিট।
বারহাট্টা প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মুখলেছুর রহমান হীরা হা-ডু-ডু খেলার স্মৃতিচারণ করে বলেন, শৈশবে আমাদের এলাকার মাঠেঘাটে বিশাল মাটির স্তুপ করে হা-ডু-ডু খেলার কোট বানানো হতো। খেলা আয়োজনের জন্য খেলোয়াড়দের নামসহ মাইকিং করা হতো আর আমরা বন্ধুরা ভ্যানের পিছনে পিছনে ছুটতাম। খেলা উপলক্ষে খাওয়া-দাওয়া চলত খাসি কিংবা গরু জবাই করে। তখন গাঁয়ের এক মাতাব্বরে সঙ্গে আরেক মাতাব্বরের প্রতিযোগিদের মধ্যে খেলা হত। বিজয়ী হওয়ার জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করতো। তখন লড়াইটা ছিল খেলায় অস্ত্রে নয়। কোনো মারামারি হানাহানি গ্রামীন জীবনে ছিল না। কিন্তু বর্তমানে শহরের পাশাপাশি গ্রামেও বিজ্ঞানের ছোঁয়া লেগেছে। প্রযুক্তিগত এ ছোঁয়ায় যেন কেড়ে নিচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যকে। ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের লালিত গ্রামীণ সাষ্কৃতি। আর এরই ধারাবাহিকতায় আজ বিলুপ্তির পথের সারথি হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু কিংবা কাবাডি খেলা।
এমএসএম / এমএসএম
কুষ্টিয়া সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ভারতীয় চোরাচালানি মালামাল উদ্ধার
লাকসামে সুরক্ষা সিটি’র বিনিয়োগকারী ও শেয়ার হোল্ডারদের সাথে মতবিনিময়
বিলীনের পথের সারথি ঐতিহ্যবাহী হা-ডু-ডু খেলা
আত্রাইয়ে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে র্যালী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
উলিপুরে আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস পালিত
রায়পুরে অননুমোদিত ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকের রমরমা বাণিজ্য
শিক্ষার আলো ছড়ানোর প্রত্যয়ে গোদাগাড়ীতে সাক্ষরতা দিবস পালিত
নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারীর কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের প্রতিবাদে আলফাডাঙ্গা উপজেলা ও পৌর বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল
মনোহরগঞ্জ- লাকসাম সড়কে ব্রিজ নির্মাণ কাজে ধীরগতি বিকল্প পথ নড়বড়ে ঘটছে দুর্ঘটনা
শৈলজারঞ্জন কেন্দ্রে নেই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম , নষ্ট হচ্ছে ভবন
টাঙ্গাইলে চিকিৎসা সেবা বিভিন্ন সংকটে জর্জরিত : রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই
বরিশালে ‘সাহিত্য পাতা আষাঢ়' সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন