ঢাকা মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শৈলজারঞ্জন কেন্দ্রে নেই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম , নষ্ট হচ্ছে ভবন


মোহনগঞ্জ (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি photo মোহনগঞ্জ (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮-৯-২০২৬ দুপুর ১২:১০

সংস্কৃতিচর্চার লক্ষ্যে প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ বিশ্বকবির ঘনিষ্ঠ সহচর শৈলজারঞ্জন মজুমদার স্মরণে শান্তিনিকেতনের আদলে নির্মিত শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। মোহনগঞ্জ বাহাম গ্রামের সঙ্গে রয়েছে তার অসংখ্য স্মৃতি।
উৎসর্গ কবিতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘বেড়ার ওপারে মৌসুমি ফুলে রঙের স্বপ্ন বোনা, চেয়ে দেখে দেখে জানালার নাম রেখেছি- ‘নেত্রকোনা’। অথচ তিনি কোনো দিন আসেননি। নেত্রকোনার সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল শৈলজারঞ্জন মজুমদারের মাধ্যমে।
আচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদার রবীন্দ্রসংগীতের খ্যাতিমান ওস্তাদ ছিলেন। নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মোহনগঞ্জ উপজেলার ১নম্বর ইউনিয়ন বাহাম গ্রামে তার জন্ম হয়েছিল ১৯০০ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের বেশির ভাগ সময় তাঁর কেটেছে কলকাতায়। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ২০০শর বেশি গান ও বেশ কিছু গীতিনাট্যের স্বরলিপি প্রণয়ন করেছেন। বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রসংগীতকে বিশ্বদরবারে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তার বিশেষ ভূমিকা আছে। বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রসংগীতের সুর ও বাণীর প্রচার এবং বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন শৈলজারঞ্জন। এ জন্য তাকে ‘রবীন্দ্রসংগীতাচার্য’ও বলা হয়। তার গানে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে ‘গীতাম্বুধি’ উপাধি দিয়েছিলেন। এ ছাড়া কর্ম ও প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ‘দেশিকোত্তম’ এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লিটারেচার’ উপাধি দেওয়া হয়। ২৪ মে ১৯৯২ সালে কলকাতার সল্টলেকে মৃত্যু হয় এই সংগীত অনুরাগীর। 
জন্মভিটায় বাহাম গ্রামের সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি। তার মৃত্যুর প্রায় দুই যুগ পর স্মৃতি রক্ষায়, ভারত ও বাংলাদেশ মধ্যকার সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য রবীন্দ্রসংগীত চর্চা ও গবেষণার লক্ষ্যে গ্রামটিতে নির্মিত হয়েছে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ৫ আগস্ট ২০২৪ সাল থেকে নেই কোনো কার্যক্রম।  
প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণপূর্ত বিভাগের বাস্তবায়নে নির্মিত হয়েছে এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
উদ্বোধনের পরে চারটি অনুষ্ঠানের মধ্যে তিনটি অনুষ্ঠান হয়েছে এবং একটি স্থগিত করা হয়েছে। প্রথম অনুষ্ঠানটি ১৫ এপ্রিল ২০২৪ সালে তিনদিন ব্যাপী ১৪৩১ সালের বৈশাখী মেলার মধ্যদিয়ে স্বপ্নঘেরা শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। দ্বিতীয়টি ১৬ মে ২০২৪ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তৃতীয়টি ২৪ মে ২০২৪ সালে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও চতুর্থ অনুষ্ঠানটি ৩১ জুলাই ২০২৪ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৫তম নজরুল জয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কারণে স্থগিত করা হয়। কিন্তু এর পর থেকে শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে গত দুই বছরে কোনো সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আয়োজন করা হয়নি। এমনকি আহ্বান করা হয়নি কার্যনির্বাহী কমিটির একটি সভাও।
শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, অবহেলা, অযত্ন আর পরিচর্যার অভাবে প্রায় পরিত্যক্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি। এ কেন্দ্রেটির জনবলকাঠামোতেও বড় ঘাটতি রয়েছে। কেন্দ্রটিতে ৩৪টি পদের মধ্যে ৫ জন নিয়োগ হয়েছিল। ৫টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন-টেকনিশিয়ান মোহাম্মদ সামিউজ্জামান ইমন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী জয় হরিচরণ। বাকি ৩ জন অন্যত্রে চাকরি হওয়ায় চলে গেসেন। এ দুই কর্মীর বেতন-ভাতাসহ বিদ্যুৎ বিল অন্যান্য খাতে প্রতি বছর ব্যয় হয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটির নিজস্ব তহবিলে প্রায় এক কোটি টাকা আছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন। সরকারি অনুদানের পাশাপাশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চাইলে ওই তহবিলে অর্থ দিতে পারে। কেন্দ্র প্রবেশ ফি ২০ টাকা। নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় ধরা হয় ৫ কোটি টাকা। এর বাইরে সংযোগ সড়ক নির্মাণেও প্রায় ১০ কোটি ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ২০ একর জায়গার ওপর নির্মিত শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর সাবেক আওয়ামীলীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং নির্মাণ কাজ শেষে ২০২৩ সালের ১১ মার্চ আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা হয়। সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রয়েছে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের ম্যুরাল, তিন তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবন, মিলনায়তন, শৈলজারঞ্জন মজুমদারের স্মৃতিচিহ্ন  ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে একটি জাদুঘর, গ্রন্থাগার, (গেস্ট রুম ৩টি, ডাইনিং ১টি, স্টাফ রুম), ২য় তলায় (অডিটরিয়াম, কন্ট্রোল রুম, পরিচালক, কনফারেন্স রুম), ৩০০ আসন বিশিষ্ট মাল্টিপারপাস হল রুম, এম্ফিথিয়েটার, সানবাঁধানো পুকুর, সুন্দর সবুজ চত্বর, লাইটিং, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত মেলার স্থান রয়েছে। হাওরাঞ্চলের সংগীতের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে এ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যা শান্তি নিকেতনের আদলে নির্মিত। তবে এ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ২১ সদস্যের একটি ট্রাস্টি বোর্ডের কমিটি রয়েছে। পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক সভাপতি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তারাও কোনো খোঁজখবর নিচ্ছেন না।
গতকাল সোমবার ৭ সেপ্টেম্বর দুপুর ৩টার দিকে সরেজমিন দেখা গেছে, প্রধান ফটক বন্ধ রেখে ফকেট গেইট খোলা রেখে মোহাম্মদ সামিউজ্জামান নামের এক ব্যক্তি টিকিট কাউন্টারে টিকিট বিক্রি করছেন। কথা বলে জানা যায়, তিনি কেন্দ্রটির টেকনিশিয়ান। বর্তমান কেন্দ্রটির সার্বিক দায়িত্ব তাকেই সামলাতে হচ্ছে। কেন্দ্রে প্রবেশ করে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পরিচর্যা না করায় কেন্দ্রের ভেতরে হাঁটার পথ ও খোলা জায়গা ঘাস-লতাপাতায় ঢেকে গেছে। এ কেন্দ্রে দ্বিতীয় তলায় গ্রন্থাগার ও মহড়া কক্ষের ছাদের কিছু অংশ ইন্টিরিয়র ভেঙে পড়ে রয়েছে মেঝেতে। মিলনায়তনের অনেক সরঞ্জাম নেই। লিফটও অকেজো,বিভিন্ন কক্ষে ৫টি এসি অকার্যকর, অন্তত ৫৩টি বাতি নষ্ট। টেকনিশিয়ান আরও বলেন, ঠিকাদার কাজ করে যাওয়ার পর এক বছর যেতে না যেতেই লাইব্রেরি রুমের ইন্টেরিয়র ভেঙে পড়েছে। তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৫ আগস্টে অডিটরিয়ামের রুমের অনেক যন্ত্রাংশ, সিসি ক্যামেরা, সিলিং ফ্যান,হারমোনিয়াম,সাউন্ড বক্স ও অনেক দামি লাইটগুলো চুরি করে নিয়ে গেছে। যা চুরি হওয়া কিছু মালামাল ৬৩ ই বেঙ্গল ময়মনসিংহ সেনাবাহিনী দ্বারা উদ্ধার করা হয়েছে। বেশিসংখ্যক মালামাল এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। 
বাহাম গ্রামের সোহেল মিয়া জানান, এত টাকাপয়সা খরচ করে নান্দনিক স্থাপনা হলো কিন্তু এখানে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় না। এটা খুবই পরিতাপের বিষয়।
শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র দেখতে আসা দর্শনার্থী মীমরুল নাহার তন্বী বলেন, যার নামে এত বড় একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। তার বিষয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করলে চিনে না। কারণ কেন্দ্রে গানবাজনা, নাচ, কবিতা আবৃত্রি,সাহিত্য ও সংগীত গবেষণা না হওয়ায়। যে উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে এই হাওরাঞ্চলের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম সফল হবে। 
মোহনগঞ্জ উদীচীর সভাপতি কবি রইস মনরম বলেন, শৈলজারঞ্জন স্মৃতি ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এবং হাওর বাংলার সংস্কৃতি পুনর্জীবিত ও দুই বাংলার সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি হবে ভেবেছিলাম। শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ধ্বংসের পাশাপাশি গান,বাজনাসহ সংস্কৃতি অঙ্গটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 
কার্যনির্বাহী পরিচালনা কমিটির সদস্য সঞ্জয় সরকার বলেন, ওই কমিটিতে আমাকে রাখা হয়েছে। কিন্তু গত তিন বছরে একটি সভাও আহ্বান করা হয়নি। কেন্দ্রটির নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে কমিটি, সেটির কার্যক্রমই যদি না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি সচল হবে কীভাবে ? ৫ আগস্টের পর সব কমিটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (ভারপ্রাপ্ত) কো-অর্ডিনেটর আমেনা খাতুন বলেন, শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নিয়োগপ্রক্রিয়া কাজ সম্পূর্ণ হলে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তাছাড়া সংস্কৃতি বিষয় মন্ত্রণালয় থেকে ১কোটি টাকা থেকে বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারী বেতন দেওয়া হচ্ছে।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক এবং শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কল্যাণ ট্রাস্ট কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, এই কেন্দ্র কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা ভাবা হচ্ছে। শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নিয়ে আমরা দ্রুত মিটিং করবো। এবিষয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত কার্যক্রম পরিচালনা করবো।

Aminur / Aminur

শিক্ষার আলো ছড়ানোর প্রত্যয়ে গোদাগাড়ীতে সাক্ষরতা দিবস পালিত

নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারীর কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের প্রতিবাদে আলফাডাঙ্গা উপজেলা ও পৌর বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল

মনোহরগঞ্জ- লাকসাম সড়কে ব্রিজ নির্মাণ কাজে ধীরগতি বিকল্প পথ নড়বড়ে ঘটছে দুর্ঘটনা

শৈলজারঞ্জন কেন্দ্রে নেই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম , নষ্ট হচ্ছে ভবন

টাঙ্গাইলে চিকিৎসা সেবা বিভিন্ন সংকটে জর্জরিত : রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই

বরিশালে ‘সাহিত্য পাতা আষাঢ়' সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন

চন্দনাইশে ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন কনফারেন্স’ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন

গোপালগঞ্জে নদীভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি, বসতভিটা হারিয়ে অন্য জেলায় আশ্রয় নিচ্ছেন মানুষ

দেবে যাচ্ছে ঘের সংলগ্ন মনিরামপুর-নওয়াপাড়া সড়ক, উঁপড়ে পড়ছে গাছ

অবৈধভাবে সার মজুত রোধে অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা

ঢাকা ইপিজেডে কারখানা শ্রমিকদের জন্য সমন্বিত চক্ষু ও এনসিডি স্বাস্থ্য

কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে ৬১৩ জন শ্রমিক ছাঁটাই

শেরপুরে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের শুভ উদ্বোধন