বেনাপোল বন্দরে ৩ ট্রাক পণ্য লোপাটের অভিযোগ: দুই রাজস্ব কর্মকর্তা বরখাস্ত
দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দরে অসাধু দুর্নীতিবাজ কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তাদের পরস্পর যোগসাজশে থামছে না শুল্কফাঁকির দৌরাত্ম্য। মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বন্দরের ২৯ নম্বর শেড থেকে মিথ্যা ঘোষণায় বেরিয়ে যাওয়া তিন ট্রাক পণ্য খালাশ করে নিয়ে গেছে একটি সিন্ডিকেট চক্র। অভিযোগ উঠেছে বন্দরের ২৯ নং শেডে থাকা অন্য একটি পণ্য চালান শুল্কায়ণ দেখিয়ে আগত কয়েক কোটি টাকার শাড়ি,থ্রি পিস,কসমেটিকস পণ্য চালান লোপাট করেছে এ চক্র। এ ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে আইআরএম শাখার জড়িত দুই রাজস্ব কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বন্দরের ২৯ নং শেড থেকে শুল্ক ফাঁকির ৩ ট্রাক পণ্য চালানে কয়েক কোটি টাকার কসমেটিকস,ব্লেড ও শাড়ি,থ্রি পিস পণ্য ছিলো। পণ্য চালান পাচারের সাথে জড়িত ২৯ নং শেড ইনচার্জ রিপন কুমার ও শফিক ও কাস্টমসের দুই রাজস্ব কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম এবং শহিদুল ইসলামের যোগসাজসে বন্দর থেকে ৩টি ট্রাক পণ্য বের হয়ে গেছে। যা বন্দরের সিসিটিভি ফুটেজে প্রমাণ পেয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনার সাথে জড়িত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম এবং রাজস্ব কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামকে ক্লোজ করে জনপ্রশাসন শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বন্দর সূত্র জানায়, ২৯ নং শেডে থাকা একটি পণ্য চালান শুল্কায়ণ দেখিয়ে দুপুর ১২ টায় প্রবেশকৃত দুটি ভারতীয় ট্রাকের পণ্য নামানোর পরপরই সেই পণ্য ১২ টা ৪০ মিনিটের মধ্যে বাংলা ৩টি ট্রাকে লোড করে লোপাট করে। মঙ্গলবার বেনাপোল বন্দরের ২৯ নম্বর শেড থেকে প্রকাশ্য তিন ট্রাক পণ্য পাচার করা হয়। যার ট্রাক নং যশোর ট-১১-৩১৩৩, ঢাকা মেট্রো-ট-২০-৮৩৪৯ ও ঢাকা মেট্রো ট-২২-৭৪৭১। ভারতের দুটি ট্রাকে ঢাকার আমদানিকারক মৌলভী বাজারের সাদিয়া এন্টারপ্রাইজ ফেব্রিক্সের একটি পণ্য চালান আমদানি করেন। পণ্য চালান খালাসের দায়িত্ব ছিলো বেনাপোল বন্দরের আলোচিত শুল্ক ফাঁকির অন্যতম হোতা আজিমের ভাড়া করা সিএন্ডএফ এজেন্ট প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল। প্রত্যায় ইন্টারন্যাশনাল লাইসেন্সের প্রকৃত মালিক মাগুরার সাবেক এমপি শেখরের বন্ধু হাফিজুর রহমান হ্যাপী। তবে ৫ই আগষ্টের পরে লাইসেন্সটি ভাড়া নিয়ে শুল্ক ফাঁকিতে লিপ্ত রয়েছে অস্ত্র ব্যবসায়ী আজিম।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বেনাপোল কাস্টমসের আইআরএম শাখায় সহাকারী কমিশনার তৌফিকুর রহমান দায়িত্ব পাওয়ার পরই বন্দরে রাজস্ব ফাঁকির উৎসব চলছে। কয়েকটি সিঅ্যান্ডএফের সাথে পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী কনসাইনমেন্ট সখ্যতার অভিযোগ উঠেছে। আইআরএম শাখায় থাকা তার অধিনস্থ কয়েকজন সহকারী কর্মকর্তার পরীক্ষণের নামে ‘আইওয়াশে’ কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি চলছে বলে জানা গেছে। গোয়েন্দা তৎপরতায় প্রকাশ হওয়া বিতর্কিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রত্যায় ইন্টারন্যাশনালের রাজস্ব ফাঁকির চালানের একটি।
অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমসের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির দিচ্ছে এ চক্র। এদের অন্যতম সহযোগিতাকারী হচ্ছে আলোচিত রাজস্ব ফাঁকিবাজ ও নো-এন্ট্রির হোতা বিতর্কিত এবং আলোচিত বগুড়ার হিরু সিন্ডিকেট। সে প্রকাশ্য নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু পরিচয় দিয়ে মহাক্ষমতাধর জাহির করে বন্দর এলাকায়। শুল্ক ফাঁকিবাজ এই হিরুর মাধ্যমে বন্দর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় চলছে শুল্ক ফাঁকির উৎসব।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেনাপোল বন্দরের আলোচিত শুল্ক ফাঁকির অন্যতম হোতা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বণে যাওয়া অস্ত্র ব্যবসায়ী আজিম এ পণ্য খালাশ করেছে। শুল্ক ফাঁকির পণ্য চালান পাচারে তারা কাস্টমস ও বন্দরের শেড ইনচার্জদের পরস্পর সহযোগিতায় কনসাইনমেন্ট প্রতি মোটা অংকের ঘুসের রফাদফায় পণ্য চালান বন্দর থেকে বের করে নিয়ে যায়। চক্রটি পণ্য চালান পাচারে ইউনিক টেকনিক ব্যবহার করে। প্রথমে একটি সল্প শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানি করে শেডে রেখে পরবর্তীতে একই রকম প্যাকেজ ও ওজনের সল্প শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানি দেখিয়ে কাস্টমস ও বন্দরের শেড ইনচার্জদের সহযোগিতায় উচ্চ শুল্ক যুক্ত পণ্য চালান নামিয়ে খালাশ করে নিয়ে চলে যায়। তাছাড়া কাস্টমসের আইআরএম শাখার কর্মকর্তারা আই ওয়াশ পরীক্ষণ বেশির ভাগ চালান ছাড় পেয়ে যায়। গোয়েন্দা সংস্থার গোপন নজরদারিতে দুই একটি চালান আটক হলেও বেশির ভাগই থাকে অধরা। এদিকে এ ঘটনা জানাজানির পরপরই শুল্ক ফাঁকির হোতারা স্থানীয় সাংবাদিকদের ম্যানেজ করতে কাজ করছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মিথ্যা ঘোষণায় আনা উচ্চ শুল্কের পণ্যের বদলে স্বল্প শুল্কের পণ্যের আড়ালে অবৈধ পণ্য খালাসে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এর সাথে নো-এন্ট্রির মাধ্যমে বন্দর থেকে সরাসরি পণ্য পাচারের ঘটনায় সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতের রপ্তানিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশে মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে পণ্য আমদানি করছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কেল ওজনে কম দেখানো, পণ্যের প্রকৃত মান গোপন করা এবং ভুল এইচএস কোড ব্যবহার করে উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যের বদলে স্বল্প শুল্কের পণ্য হিসেবে খালাস নেওয়া। এই বন্দরে অসাধু ব্যবসায়ীরা বৈধ পণ্যের আড়ালে উচ্চমূল্যের ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, ব্লেড, দামী কেমিক্যাল, বিভিন্ন কসমেটিকস, ইমিটেশন সামগ্রী ও ফেস ক্রিমসহ বিভিন্ন দামি পণ্য নিয়ে আসে। বন্দরে সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দিনের বেলায় কাস্টমস এবং বন্দরের একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বন্দর শেড থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার পণ্য। আবার বৈধ ভাবে আনা পণ্য শুল্ক না দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে হামেশায়। এমনকি বন্দরের হেফাজতে রাখা আটক পণ্য সরিয়ে সেখানে নিম্নমানের পণ্য রাখার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ঘটেছে। রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে কাগজে-কলমে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সবই শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া বাস্তবে যার সত্যতা মিলছে না।
স্বচ্ছ ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রকৃত হোতাদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে না। বন্দর ব্যবহারকারী ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, শুল্ক ফাঁকি দিতে যে সব লাইসেন্স ব্যবহার হচ্ছে সে গুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বন্দরের স্বচ্ছতা ও রাজস্ব সুরক্ষা ফেরাতে হবে। তবে দীর্ঘ কয়েকটি পণ্য চালান আটক,জব্দ ও মিথ্যা ঘোষণা ধরা পড়লেও অদৃশ্য কারনে কমিশনার নিরব ভূমিকা পালন করছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, বন্দরের শেড ইনচার্জরা যখন আমদানি পণ্য বুঝে নেন, তখন তারা পুরো প্যাকেজ গুনে রিসিভারে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন কাস্টমস বা অন্য কোনো সংস্থা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পণ্য গণনা করে, তখন অতিরিক্ত পণ্য পাওয়া যায়। তখন তারা বলেন, বেশি পণ্যের ঘটনা তাদের জানা নেই। অথচ নিয়ম অনুযায়ী পণ্য বেশি আসলে তা বুঝে নিয়ে অতিরিক্ত পণ্য লিপিবদ্ধ করে কাস্টমসকে অবহিত করার কথা। কিন্তু স্থল বন্দরের শেড ইনচার্জরা বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতে সহায়তা করেন, যা বারবার ধরা পড়ছে। এদিকে গত আট মাসে বেনাপোল কাস্টমসে ১৩০টি জালিয়াতির ঘটনা শনাক্তসহ পণ্য পাচারের অভিযোগে দায়ের হওয়া চারটি মামলায় কাস্টমস, বন্দর, নিরাপত্তা সংস্থা ও ব্যবসায়ীসহ ৫৭ জনকে আসামি করা হলেও এখন পর্যন্ত কাওকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসকে ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিগত অর্থবছর শেষে আদায় হয় মাত্র ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এনবিআর। যা গত অর্থবছরের তুলনায় ৭০২ কোটি টাকা কম। বেনাপোল বন্দর ও কস্টমসে দুর্নীতিবাজ ও অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে শুল্ক ফাঁকি অব্যহত থাকায় গত দুই মাসে ৭১৩ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানাতে, মেসার্স প্রত্যায় ইন্টারন্যাশনাল সিঅ্যান্ডএফ এর মালিক হাফিজুর রহমান হ্যাপীর মুঠোফোনে কল করলে নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে বেনাপোল বন্দরের ২৯ নং শেড ইনচার্জ রিপন কুমারের মুঠোফোনে জিজ্ঞসা করলে তিনি জানান, শেডে আসেন সরাসরি কথা বলি। এর পর তিনি ফোন কেটে দেন।
এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের শুল্ক গোয়েন্দা শাখার সহকারী পরিচালক সেলিম জানান, আমি অসুস্থ বিধায় বাড়িতে আছি। আমি বিষয়টি শুনেছি এবং আমার কর্মকর্তারা শেডে গিয়ে সিসিটিভি ও অনান্য কার্যক্রম খতিয়ে দেখছে।
এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার ফাইজুর রহমানকে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এমএসএম / এমএসএম
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন: ভিতরবন্দ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে গণসংযোগে মাহমুদুল হাসান মাহমুদ
নিহত সেনাসদস্য পিয়াসের দাফন সম্পন্ন: "এলাকাজুড়ে চলছে শোকের মাতম
মাদক মামলায় আটক নারীকে আদালতে নেয়ার পথে মৃত্যু
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ভাবনা থেকে বাবুগঞ্জে হারুন মোল্লা ফাউন্ডেশনের যাত্রা
জনসেবার ধারাবাহিকতায় আবারও ভোটের মাঠে শাহীন হাওলাদার
তজুমদ্দিনে যুবলীগ সভাপতি গ্রেফতার
চিলমারীতে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ও অভিভাবক/মা সমাবেশ-২০২৬ অনুষ্ঠিত
চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিরাপদ অভিবাসন ও পুনর্বাসন বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত
ফুলছড়িতে বিদ্যালয় স্থানান্তর নিয়ে ৯ মাসের বিরোধ, রোদ-বৃষ্টিতে চলছে পাঠদান
ওয়ার্ল্ড ভিশন পিরোজপুরের উদ্যোগে Joy of Giving অনুষ্ঠিত
সাংবাদিকের মোবাইল চুরি: বিকাশের পিন রিসেট ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
ঘিওরে মহীলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আলোচনা সভা ও গাছের চারা বিতরণ