আজ মাগুরছড়া ট্র্যাজেডি দিবস, দুই যুগেও আদায় হয়নি ক্ষতিপূরণ
মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও আদায় হয়নি ক্ষতিপূরণ। আজ ১৪ জুন, মাগুরছড়া ট্রাজেডির ২৫তম বার্ষিকী। ১৪ জুন এলেই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জবাসীকে মনে করিয়ে দেয় সেই ভয়াল স্মৃতির কথা। সেদিন মানুষের মন কত ভীত ছিল, কখন এসে আগুনের লেলিহান শিখায় গ্রাস করে ফেলবে।
১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মধ্যরাত ১টা ৪৫ মিনিটে মাগুরছড়া গ্যাসকূপে বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠেছিল গোটা কমলগঞ্জ। আগুনের লেলিহান শিখায় লাল হয়ে উঠেছিল মৌলভীবাজার জেলার সুনীল আকাশ। ভীতসন্ত্রস্ত লোকজন ঘরের মালামাল রেখে প্রাণভয়ে ছুটেছিলেন দিগ্বিদিক। প্রায় ৫০০ ফুট উচ্চতায় লাফিয়ে ওঠা আগুনের লেলিহান শিখায় লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল বিস্তীর্ণ এলাকা। আগুনের শিখায় গ্যাসফিল্ডসংলগ্ন লাউয়াছড়া রিজার্ভ ফরেস্ট, মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জি, জীববৈচিত্র্য, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, ফুলবাড়ী চা বাগান, সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথ এবং কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। অগ্নিকাণ্ডের দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও জনসম্মুখে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রকাশ হয়নি এখনো, আদায় হয়নি ক্ষতিপূরণ।
পরিবেশ সংরক্ষণবাদীদের তথ্যমতে, ৬৩ প্রজাতির পশু-পাখির বিনাশ সাধন হয়। সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেলযোগাযোগ ১৬৩ দিন বন্ধ থাকে। মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা। মার্কিন অক্সিডেন্টাল ক্ষয়ক্ষতির আংশিক পরিশোধ করলেও বন বিভাগ কোন ক্ষতিপুরণ পায়নি। ফিরে আসেনি এখনো প্রাকৃতিক বনের স্বাভাবিক পরিবেশ। পূর্ণ ক্ষতিপূরণ না দিয়েই ইউনিকলের কাছে হস্তান্তরের পর সর্বশেষ শেভরনের কাছে বিক্রি করেছে। শেভরন ২০০৮ সালে ওই বনে ত্রি-মাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ কাজ সম্পন্ন করে। এতেও স্থানীয়ভাবে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। ২০১২ সনে শেভরন মৌলভীবাজার ১৪ নং ব্লকের অধীনে নূরজাহান, ফুলবাড়ি এবং জাগছড়া চা বাগানের সবুজ বেষ্টনি কেটে কূপ খননের পর এসব কূপ থেকে চা বাগানের ভেতর দিয়ে ড্রেন খনন করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে উত্তোলিত গ্যাস কালাছড়ার মাধ্যমে রশীদপুর গ্রীডে স্থানান্তর চলছে।
বিভিন্ন সংগঠন মাগুরছড়া দুর্ঘটনায় যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবিতে আন্দোলন করলেও দীর্ঘ ২৫ বছরেও ক্ষতিগ্রস্তদের দাবিকৃত ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানের জন্য গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজ পর্যন্ত জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। মাগুরছড়া দুর্ঘটনার ২৫ তম বার্ষিকী পূর্ণ হলেও ক্ষতিপূরণ আদায় নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে আজও ক্ষতিপূরণ না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা নীরবে চোখের জল ফেলছে। এ নিয়ে জনমনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের পরিত্যক্ত এলাকার উত্তর টিলায় সবুজায়ন করা হয়েছে। মূল কূপটি এখনো পুকুরের মতো ধারণ করে টিকে আছে। চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরী করা হয়েছে। টিলার ওপর সবুজ বনায়নের উদ্যোগ নিলেও মাঝে মধ্যে আগুনের পোড়া ডালপালাবিহীন কালো রঙের গাছগুলো অগ্নি দুর্ঘটনায় সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
কমলগঞ্জ উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভিতরে লাউয়াছড়া ফরেস্ট বিটের অভ্যন্তরে মাগুরছড়া এলাকায় ১৯৮৪-৮৬ ও ১৯৯৪ সালে সাইসলিক সার্ভেতে গ্যাস মজুদের সন্ধান পাওয়া যায়। এ প্রেক্ষিতে উৎপাদন ভাগাভাগির চুক্তিতে ১৯৯৫ সালের ১১ জানুয়ারি মার্কিন বহুজাতিক তেল ও গ্যাস উত্তোলণকারী কোম্পানি অক্সিডেন্টালের সাথে বাংলাদেশ সরকারের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং গ্যাস উত্তোলনের জন্য ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমতি প্রদান করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর অক্সিডেন্টাল কোম্পানি মাগুরছড়ায় গ্যাস ফিল্ডের ড্রিলিং কাজের জন্য সাবলিজ প্রদান করেছিল ডিউটেক নামের জার্মান কোম্পানির কাছে। গ্যাস উত্তোলনে ১৪ নং ব্লকের মাগুরছড়াস্থ মৌলভীবাজার-১ গ্যাসকূপের খননকালে ৮৫০ মিটার গভীরে যেতেই ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মধ্য রাতে ঘটে ভয়াবহ বিষ্ফোরণ। এ সময় শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ ১৫ কিঃমিঃ (৩৩ হাজার কেভি) উচ্চতাপ বৈদ্যুতিক লাইন পুড়ে নষ্ট হয়। কুলাউড়া, বড়লেখা ও কমলগঞ্জ উপজেলার ৫০ টি চাবাগানে দীর্ঘদিন স্থায়ীভাবে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয়। ৬৯৫ হেক্টর বনাঞ্চলের বৃক্ষ সম্পদ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এছাড়া ২৪৫ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়, যার বাজার মূল্য দাঁড়ায় ৫০ কোটি ডলার।
গ্যাস বিস্ফোরণের পর অক্সিডেন্টাল তাদের সহোদর ইউনোকলের কাছে দায়িত্ব দিয়ে এ দেশ ত্যাগ করলে দুই বছর পর ফুলবাড়ি চা বাগান, পার্শ্ববর্তী মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির বাড়ি-ঘর, পান জুম এলাকার ক্ষয়ক্ষতি বাবদ আংশিক টাকা প্রদান করে ইউনোকল। অন্যদিকে দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি কমলগঞ্জ শ্রীমঙ্গল সড়ক ধারে সামাজিক বনায়নের রোপিত গাছের জন্য ৩ ব্যক্তিকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতি পূরণ প্রদান করা হয়। দীর্ঘ ৬ মাস কমলগঞ্জ শ্রীমঙ্গল সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকার কারণে ক্ষতি পূরণ বাবদ বাস মালিক সমিতিকে ২৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। এছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু পরিবেশ ও গ্যাস বাবদ কোন ক্ষতিপূরণ করা হয়নি এবং কোন সরকারই ক্ষতিপূরণ আদায়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় জনমনে সন্দেহ বিরাজ করছে। দুর্ঘটনার পর তৎকালীন সরকারের খনিজ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহফুজুল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত কমিটি ১৯৯৭ সালের ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট পেশ করে। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী অক্সিডেন্টালের দায়ীত্বহীনতাকেই দায়ী করা হয়।
২০০৩ সালের ১১ মে ইউনোকলের ওপর রুলনিশি জারি করেছে হাইকোর্ট। কেন সম্পূরক চুক্তি বাতিল করা হবে না এবং মাগুরছড়া গ্যাস ফিল্ডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ প্রদানের আগে গ্যাস-তেল উত্তোলন বন্ধ রাখতে কেন ইউনোকলকে নির্দেশ দেয়া হবে না- এ মর্মে ২ সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। একই সাথে সরকার ও পেট্রো বাংলাকেও কারণ দর্শাতে বলা হয়। বিচারপতি মোঃ আব্দুর রশীদ ও বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়ার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। চট্টগ্রামের বিআইটির ইলেক্ট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক্স বিভাগের প্রধান প্রফেসর এম শামসুল আলমের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ রুলনিশি জারি হয়।
মার্কিন তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি অক্সিডেন্টালের চুক্তি হয়। এরপর ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মাগুরছড়া গ্যাস ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডে বিপুল অংকের ক্ষতি হয়। এ ব্যাপারে সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করে। রিপোর্টে বলা হয় ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার জন্যে কোম্পানি দায়ী। ওদিকে ১৯৯৮ সালের ২৫ নভেম্বর ক্ষতিপূরণের কোন শর্ত না রেখেই ২য় দফায় সম্পূরক চুক্তি হয়। এ কারণে ওই চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন দাখিল করা হয়। শুনানিতে আইনজীবীরা বলেছেন, অক্সিডেন্টাল দেশের প্রচলিত পেট্রোলিয়াম ও পরিবেশ আইন না মেনে কাজ শুরু করে। এছাড়া, তারা কোম্পানির সকল দায়-দায়িত্ব ইউনোকলকে বুঝিয়ে দিয়েছে। তাই ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে ইউনোকলের প্রতি রুলনিশি জারির আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্টের রুলনিশির কোনো সন্তোষজনক জবাব ইউনোকল দেয়নি। সরকার কর্তৃক আইসিসি কোর্টে মামলা করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল।
এছাড়া ২০০৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে গোলাম হাবিবের এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেন মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ড অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিপূরণের জন্য বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করবে বলে জানায়। ক্ষতিপূরণ আদায়ের কোনো সুরাহা এখনো পর্যন্ত হয়নি। মাগুরছড়ার ক্ষতিপূরণ আদায়সহ ৫ দফা দাবিতে ঢাকার পল্টন ময়দান থেকে বৃহত্তর সিলেটের বিবিয়ানা, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-খুলনা-মংলা অভিমুখে লংমার্চ করা হয়েছে।
এত আন্দোলনের পরও জনগণের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, মার্কিন বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি ইউনোকল মাগুরছড়া গ্যাসকূপ ব্লো-আউটের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ না দিয়েই বিস্ফোরিত গ্যাসকূপের কাছাকাছি ১৪ নং ব্লকের এমবি-৪ ও এমবি-৫ নামে ২টি কূপ খনন কিভাবে সম্পন্ন হলো এবং কিভাবে এই ২টির গ্যাস কালাপুরে স্থাপিত প্রসেসিং প্লান্টে সঞ্চালনের জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের লাল তালিকাভূক্ত লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক-রিজার্ভ ফরেস্টের ভেতর দিয়ে পরিবেশ-প্রতিবেশ বিনাশি গ্যাস গ্যাদারিং পাইপ লাইন নির্মাণ সম্পন্ন করে।
এমএসএম / জামান
ভূঞাপুরে কুরআনের পাখিদের ক্রীড়া উৎসব ও পুরস্কার বিতরণ
নেছারাবাদে দাড়িপাল্লার পক্ষে জনসভা, ‘দেশ সংস্কারে হ্যাঁ ভোট’ চাইলেন শামীম সাঈদী
কাপাসিয়ায় বিএনপি প্রার্থীকে এনপিপি প্রার্থীর পূর্ণ সমর্থন
অবশেষে রেলগেটের উচু-নিচু সড়কটি মেরামত হলো কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস রাণীনগর বাসীর
শ্রমিক দলের উদ্যোগে শ্রীমঙ্গলে নির্বাচনী জনসভা
রাজস্থলীতে বন্যহাতির ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে সরকারি অনুদানের নগদচেক বিতরণ
মোহনগঞ্জে ধনু নদীর পাড় দখলমুক্ত, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ
সুন্দরবনে ঝিনুক ও শামুক পাচারকালে ট্রাকসহ ৭ হাজার ৫০০ কেজি মাল জব্দ
মুরাদনগরে নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ, প্রচারণায় মুখর পুরো উপজেলা
কালকিনিতে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল
নাচোলে ধানের শীষের মহিলা সমাবেশে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ, উৎসবমুখর পরিবেশ
রামুতে ধানের শীষের সমর্থনে এক জঙ্গ গণমিছিল অনুষ্ঠিত
রাতের অন্ধকারে চোরাই মাংস পাচার, মনপুরায় পুলিশের অভিযানে ভেস্তে গেল পরিকল্পনা
Link Copied