মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী হাজারী গুড়, হাত বদলেই দাম দ্বিগুন
মানিকগঞ্জের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যপূর্ণ প্রাকৃতিক খেঁজুরের রস থেকে তৈরি হয় হাজারী গুড়। বর্তমানে যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পরেছে এই হাজারী গুড়ের সুনাম ও পরিচিতি। প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এই হাজারী গুড়। কথিত আছে, লোভনীয় স্বাদ আর মন মাতানো সুগন্ধে এই গুড়ের প্রেমে পড়েছিলেন ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ। বর্তমানে এই হাজারী গুড় ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত দাম হওয়ায় এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে হাজারী গুড় যেন সোনার হরিণ। যা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার অনেকটাই বাইরে।
এই হাজারী গুড়ের ইতিহাসে অনেক মুখরোচক গল্প শোনা যায়। মানিগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বাল্লা ইউনিয়নের শিকদারপাড়া গ্রামে বসবাসকারী হাজারী পরিবার সূত্রে জানা যায়, আদি বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই গুড়ের নাম এক সময় সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। যা ওই সময় থেকেই দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও এর নাম ডাক ছড়িয়ে পরে। তার এই গুড়কে সাধারণ গুড় থেকে আলাদাভাবে চিনতেই ব্যবহার করা হয় হাজারী নামের একটি সিলমোহর। প্রথম দিকে সিলমোহরটি কাঠের তৈরি হলেও পরবর্তী প্রজন্মের সদস্যরা পিতল দিয়ে এই সিলমোহরটি তৈরি করে। এই সিলমোহরটি বংশানুক্রমানুযায়ী শুধুমাত্র মোহাম্মদ হাজারীর উত্তরসূরীরাই ব্যবহার করতেন। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে উৎপাদিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এই হাজারী গুড়। তৎকালিন সময়ে খেজুর গাছে কেটে গুড় তৈরির করার কারণেই শিকদারপাড়া গ্রামের একটি পাড়া গাছিপাড়া নামে পরিচিত হয়, যা এখনও বিদ্যমান।
আরও জানা যায়, হাজারী পরিবার থেকে একটি সময় ১৫/১৬টি পরিবার বংশীয়গতভাবে এই হাজারী গুড় তৈরি করতেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে এ অঞ্চল থেকে খেজুর গাছ বিলুপ্ত হওয়ায় এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় হাজারী পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা ব্যবসা বাণিজ্য, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরীজীবিসহ বিভিন্ন পেশার কারণে পারিবারিকভাবে প্রায় ১৫ বছর আগে থেকে অনেকেই এই গুড় উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে হাজারী পরিবারের মাত্র ২জন সদস্য এই গুড় তৈরি করেন বলেও জানা যায়। কিন্তু বর্তমানে শীত আসার সাথে সাথেই দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলাসহ বিদেশ থেকেও অর্ডার আসতে শুরু হয় হাজারী গুড়ের। কিন্তু হাজারী গুড়ের চাহিদানুযায়ী উৎপাদনের পরিমাণ অনেকটাই কম। এর ফলশ্রুতিতে হাজারী গুড়ের ঐতিহ্য ও সুনাম রক্ষার্থে এবং গুড়ের চাহিদা মেটাতে হাজারী পরিবার থেকেই এই অঞ্চলের ভাল মানের গাছিদের যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে সিলমোহরটি ব্যবহার করে গুড় উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন গ্রামে গাছিদের মাঝে ২৭টি হাজারী সিলমোহর ব্যবহার করে গুড় তৈরি করা হচ্ছে।
এই হাজারী গুড়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই ২০১৭ সালে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. নাজমুছ সাদাত সেলিমের সভাপতিত্বে মানিকগঞ্জ জেলা ব্র্যান্ডিং লগোতে "লোক সঙ্গীত আর হাজারী গুড়, মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর" স্লোগানে লোগো তৈরির মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যবাহী হাজারী গুড়ের জেলা ব্র্যান্ডিং করা হয়। পরে ২০১৮ সালে মানিকগঞ্জের পরবর্তী জেলা প্রশাসক এস এম ফেরদৌস এঁর পরামর্শে ট্রেড মার্কসহ রেজিষ্ট্রেশন করা হয় হাজারী লগোটি। যার নাম্বার রেজিঃ ট্রেডমার্ক ২২৮৮৪৮। হাজারী পরিবারের ৬ষ্ঠ বংশধরের সদস্য শফিকুল ইসলাম হাজারী শামীম এই হাজারী গুড়ের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ও গুড়ের গুণগতমান রক্ষা এবং গুড়ের চাহিদা মেটাতে কাজ করছেন। ফলে ২০১৮ সাল থেকে ট্রেডমার্ক সম্বলিত হাজারী প্রোডাক্ট নামের প্যাকেট তৈরি করে বাজারজাত করছেন। হাজারী সিলমোহর ব্যবহারকারী ২৭জন গাছির কাছে থেকেই গুড় সংগ্রহ করছেন হাজারী প্রডাক্টের কর্ণধার শফিকুল ইসলাম হাজারী শামীম। সিলমোহর ব্যবহারকৃত বেশ কয়েকজন গাছির সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি কেজি গুড়ের দাম ১০০০ টাকা করে দেয়া হয় গাছিদের। কিন্তু বিক্রি করা হচ্ছে সর্বনিম্ন ১৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০০ টাকা পর্যন্ত। হাজারী পরিবারের বাইরেও অনেকে তাদের কাছ অর্ডার দিয়েও গুড় সংগ্রহ করে। গাছিরা আরও জানায়, অনেকে নিজস্ব গাছের পাশাপাশি অন্যের কাছ থেকে গাছ প্রতি ৫০০-৬০০ টাকা দরে কিনে রস আহরন করেন। তবে গাছিদের উৎপাদন খরচ কেজি প্রতি ৪০০-৬০০ টাকার মতো খরচ হয় বলেও জানা যায়।
এই গুড় শুধুমাত্র হাজারী পরিবারই নয়, শীত মৌসুম আসলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনলাইন শপেও চলছে হাজারী গুড়ের রমরমা ব্যবসা। তারা কেজি প্রতি হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। ফলে দেখা যায়, গাছির কাছ থেকে হাত বদলেই দাম হয়ে উঠে দ্বিগুণ। লাগামহীন মাত্রাতিরিক্ত দাম হওয়ায় হাজারী গুড়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
হাজারী পরিবারের এ প্রজন্মের উত্তরসূরী শফিকুল ইসলাম হাজারী শামীম জানান, "এই হাজারী গুড় আমাদের ৩০০ বছরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য বহন করছে। এই গুড়ের গুণগত মান রক্ষায় এবং ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে কিছু নিয়মাবলীর মাধ্যমে মানুষের হাতে এই গুড় পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এই গুড়ের যে চাহিদা তাতে উৎপাদন খুবই সীমিত। তাই চাহিদা মেটাতে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে আমাদের পরিবার থেকেই এলাকার বিভিন্ন গ্রামে গাছিদের যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে তাদের দিয়ে গুড় তৈরি করা হচ্ছে।"
প্যাকেটজাতকরণ ও মাত্রাতিরিক্ত দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, চাহিদানুযায়ী উৎপাদন কম। তাই তুলনামূলক দাম একটু বেশিই পড়ে। আর প্যাকেটের বিষয় হলো বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত পন্যের তালিকায় গুড়ের বিষয়টি উল্লেখ নেই। আমি বিএসটিআই অফিসে পরামর্শ নিয়েই প্যাকেটজাতকরণ করেছি। যদি কখনও বিএসটিআইয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, তাহলে অবশ্যই অনুমোদন নিব।"
এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল জানান, "হাজারী গুড়ের দাম এবং মান দুটো নিয়েই খুব দ্রুত আমরা কাজ করব। কি কারণে হাজারী গুড়ের দাম দাম বেশি নেয়া হচ্ছে, এটা দেখা হবে। এছারাও হাজারী সিল নকল করে কেউ ভেজাল গুড় তৈরী করছে কি না এটাও তদন্ত করা হবে।
এমএসএম / এমএসএম
আত্রাইয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত
যশোরে ডিবির অভিযানে ২৫ পিস ইয়াবাসহ আটক ১
মান্দার ৮ কিলোমিটার সড়ক,আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় দুর্ভোগে পথচারীরা
রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতির নির্বাচন বাতিল
বিএসসিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, ইউসুফ-জিয়াসহ ৪ জনকে মন্ত্রণালয়ের শুনানিতে তলব
হবিগঞ্জে এনসিপির গাড়িবহরে হামলা, সারজিসসহ আহত অনেকে
জনগনের উপরে যারা ক্ষমতা দেখান তারা জনগনের শত্রু, দেশের শত্রু, সরকারের শত্রু : জহির উদ্দিন স্বপন
বারহাট্টায় মাদক বিরোধী ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত
কুমিল্লায় প্রায় ৫২ কোটি টাকার উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্য ধ্বংস করল বিজিবি
মানিকগঞ্জে সোহান হত্যা মামলায় দুই জনের মৃত্যুদণ্ড
ধামরাইয়ে পানিতে ডুবে ৭বছরের শিশুর মৃত্যু
লামায় জেলা পরিষদ কর্তৃক কৃষকদের মাঝে ফলজ ও বনজ চারা বিতরণ
উপকূলের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে শ্যামনগরে ১০ লাখ বীজ রোপণ উদ্যোগ
Link Copied