ঢাকা সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

স্বৈরাচার সরকারের দোসর শিতাংশু-আলামিন সিন্ডিকেটের কাছে সেবা প্রত্যাশিরা জিম্মি


আব্দুল লতিফ রানা photo আব্দুল লতিফ রানা
প্রকাশিত: ২৮-৮-২০২৫ রাত ৯:৩৭

ডিজিটাল নম্বর-প্লেট ও স্মার্ট কার্ড বিতরণসহ বিআরটিএ এর পরিচালক রোড সেফটি শিতাংশু শেখর বিশ্বাস ও তার দুর্নীতির অন্যতম সহযোগি ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১ এর ‘টাইগার আইটি’র ম্যানেজারে বিরুদ্ধে নানা-দুর্নীতি অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর এসব দুর্নীতি অনিয়মের বিষয়ে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ অটোরিকসা অটোটেম্পু শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাল আকন দুর্নীতি দমন কমিশনে ২৮ আগস্ট লিখিত অভিযোগ করেছেন।

জানা গেছে, বিআরটিএ এর সদর দপ্তরে কর্মরত পরিচালক (রোড সেফটি) শিতাংশু শেখর বিশ্বাস (এস. কে. বিশ্বাস) এর চাকরি জীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। গত ২০০৮ সালে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বিআরটিএ এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে এক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। আর সেই প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের তালিকায় শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের নাম রয়েছে। তিনি তখন বরিশাল বিআরটিএ এর সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে ও এস ডি করা হয়। 

স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতার আসার পরই শিতাংশু শেখর বিশ্বাস এক সিন্ডিকেট চক্র গড়ে তোলেন। এরপর সেই চক্রের সদস্যদের নিয়ে বিআরটিএর উচ্ছাস প্রকাশ করে দুর্নীতি অনিয়ম বদলী বাণিজ্যসহ নানা প্রকল্পের নামে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া শুরু করেন। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকটতম আত্মীয় তারেক সিদ্দিকীর সাথে আঁতাত করে বিআরটিএ এর বিভিন্ন প্রজেক্টের টেন্ডার বাণিজ্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকেন। তার মধ্যে অন্যতম ভারতের মাদ্রাস সিক্রুটিজ কোম্পানীকে ৫০ টাকার লাইসেন্স প্রিন্টিংয়ের কাজ ২৫০ টাকায় টেন্ডার দেওয়ার কাজে সহযোগিতা করেন। আর তিনি টাইগার আইটির সাথে গোপনে আঁতাত করে বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দেওয়ার অনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। ‘টাইগার আইটি’র সাবেক ম্যানেজার রাজিব, শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছেন। 

আরেক সূত্র জানায়, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠান ‘সিএনএস’ এর সাথেও শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের কমিশন বাণিজ্য ছিল। সম্প্রতি লাইসেন্স প্রিন্টিংয়ের কাজ একটি সরকারি সংস্থার সক্ষমতা না থাকায় তাদের টেন্ডার বাতিল করে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডারের কাজ দেয়া হয়। এরপর এ ঘটনাটি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হলে বিআরটিএ কর্র্তৃপক্ষ সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠান ‘সিএনএস’ এর টেন্ডার বাতিল করে। অপরদিকে শিতাংশু শেখর বিশ্বাসকে শাস্তিস্বরূপ পরিচালক (ইঞ্জিঃ) থেকে রোড সেফটি তে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তিনি চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে অবসরে যাবেন বলে সূত্রে জানা গেছে। 

অভিযোগে জানা গেছে, শিতাংশু শেখর বিশ্বাস বিআরটিএ তে কর্মরত অবস্থায় উৎকোচ ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্যাপক ধন সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। তার মেয়ে লন্ডনে লেখাপড়া করছেন। বহুল আলোচিত ‘টাইগার আইটি’ এর সাবেক ম্যানেজার শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের বন্ধু রাজিব কে. চৌধুরীর মাধ্যমে আমেরিকায় একাধিক সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন। আবার ভারতে পশ্চিমবঙ্গের নিউ ব্যারাকপুরে (কলিকাতা সংলগ্ন) শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের ডুপ্লেক্স বাড়ি ও সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন বলেও দুদকে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া, বহুল আলোচিত শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ সহচর মিরপুর-১৩ বিআরটিএ’তে কর্মরত ‘টাইগার আইটি’ কর্তৃক নিয়োজিত ডিজিটাল নম্বর প্লেট এবং স্মার্ট কার্ড সেকশনে কর্মরত ম্যানেজার আল-আমিনের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর নানা দুর্নীতি-অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন। আর এসব সম্পত্তি বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনসহ নামে বেনামে ক্রয় করেছেন।

বিআরটিএর নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানান, ডিজিটাল নম্বর প্লেজ ও স্মাট কার্ড সেকশনের ম্যানেজার আল-আমিন গত ২০১২ সাল থেকে মিরপুর- ১৩ নম্বর বিআরটিএর একই সার্কেলে কর্মরত। বিভিন্ন সময় তার বদলীর আদেশ হলেও তিনি মোটা অংকের টাকা ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে মিরপুর-১৩ বিআরটিএ সার্কেলে কর্মরত আছেন। 

উল্লেখ্য, বিআরটিএ সদর কার্যালয় থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ৩ বছর পর পর বদলীর জন্য চিঠি প্রদান করা হয়। আর তার একটি চিঠির স্মারক নং- ৩৫.০৩.-- ১০২.২০-৩০৪১। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ম্যানেজার আল-আমিনসহ তার সিন্ডিকেটের কাউকেই বদলী করা হচ্ছে না। আর সেই সিন্ডিকেটের অন্যতম ব্যক্তিরা হলেন, আল-আমিন, মাকসুদুর রহমান, প্লাবন রোজারিও, মাহাবুবুর রহমান ও ডমিনিক ফালিয়া উল্লেখযোগ্য। 

আর এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী হিসাবে রাজধানীর উত্তরা সার্কেলের ডিজিটাল নম্বর প্লেট এবং স্মার্ট কার্ড প্রকল্পের ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন ও পূর্বাচল সার্কেলের কর্মরত মেহেদী হাসান, আমজাদ হোসেন ওরফে রুবেল। আবার ফিল্ডিং অপারেটর ইব্রাহীম এবং কেরাণীগঞ্জ বিআরটি এর প্রকল্প ম্যানেজার বিপ্লব কুমারসহ তার অধীনস্থ আরো কয়েকজন এই সিন্ডিকেটের সদস্য। তাছাড়া, বিপ্লব কুমার ও ফরহাদ হোসেন তাদের স্ব-স্ব সার্কেলে দীর্ঘ প্রায় আট বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জালিয়াত সিন্ডিকেট ডিজিটাল নম্বর-প্লেট এবং স্মার্ট কার্ড সহ মালিক ছাড়া মালিকানা গাড়ী ছাড়া ফিটনেস গাড়ী ছাড়া রেজিষ্ট্রেশন, এমনকি গাড়ী নম্বর প্লেটও হাতে হাতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকার বিনিময়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আবার ম্যানেজার আল-আমিন হচ্ছেন, জালিয়াতির সিন্ডিকেটের প্রধান। তিনি অবৈধ মোটরসাইকেলসহ নানা ধরণের গাড়ী নিবন্ধনের সাথে জড়িত। আর অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে হাতে হাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স সৃজন করে বিতরণের মাধ্যমে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। আবার আল-আমিনের সহযোগি আই.এস.এস এ কর্মরত সিকিউরিটি রইছ শেখ ও আজাদ অবৈধ নম্বর প্লেট বিতরনের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আদায় করেন। শুধু তাই নয়, এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তথ্য ফাঁস হলেও বিআরটিএ এবং টাইগার আইটি তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তবে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক হলেন শিতাংশু শেখর বিশ্বাস। দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে আয়কৃত অবৈধ অর্থ থেকে মোটা অংকের কমিশন শিতাংশ শেখরকে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

 অনুসন্ধানে জানা যায়, অনিয়মের শেকড় ছড়িয়ে পড়ে মিরপুর বিআরটিএ থেকেই। এক সময়ের অপারেশন ম্যানেজার সাখাওয়াত হোসেনের সময়েই গড়ে ওঠে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। পরে স্টোর ইনচার্জ মেহেদী হাসানের অধীনে এই চক্রটি আরও সংগঠিত হয়। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্লেট লাগানো থেকে শুরু হয় অর্থ লেনদেন, যেখানে গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার পরিবর্তে নেয়া হয় ঘুষ। এই চক্রে সরাসরি জড়িত ছিলেন মেহেদী হাসান, আমজাদ হোসেন রুবেল, ইব্রাহিম, শওয়েবুর রহমান মৃধা, সোহেল রানাসহ আরও অনেকে। প্রকাশ্য দুর্নীতির কারণে একপর্যায়ে তাদের অনেকে চাকরি হারান কিংবা বদলি হন। তবে, এখানেই শেষ নয়। ভুক্তভোগীরা জানান, সার্কেল-৪ অফিসে গিয়ে নাম্বার প্লেট পেতে ঘুষ না দিলে হয় ‘স্টোরে জায়গা নেই’,  প্লেট এখনও প্রস্তুত হয়নি”, কিংবা “রিসিভ কল যাবে পরে” এইসব অজুহাতে কাজ আটকে দেওয়া হয়। অন্যদিকে যারা চেনাজানা লোক’ ধরে যান বা নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে যোগাযোগ করেন, তাদের কাজ হয় দ্রুত। অথচ এসব সেবা সংবিধান ও সরকারি নীতিমালার আলোকে নাগরিক অধিকার।

দুদকে লিখিত অভিযোগ সূত্র জানায়, দুর্নীতির গডফাদার আল-আমিন অবৈধভাবে আয়কৃত অর্থ দিয়ে নামে-বেনামে রাজধানীতে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। আর তিনি মিরপুর চিড়িয়াখানা রোড এলাকায় নিজস্ব একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করছে। উক্ত ফ্ল্যাটটির দাম ৮০ লাখ টাকা হবে। তাছাড়া, বগুড়ায় তার কয়েক কোটি টাকার নিজস্ব মশারীর ব্যবসা রয়েছে। আবার উত্তরার ফরহাদের নামে মিরপুর- ১৩ বিআরটিএর উত্তর পার্শ্বে ফ্ল্যাট ক্রয় করার অভিযোগ করা হয়েছে। গত ২০১২ সালে টাইগার আইটিতে যোগদানের সময় চাকরির যোগদানের পত্রে টাইগার আইটিতে কর্মরত প্রত্যেকের বেতন ছিল মাত্র ১০ হাজার টকাা। আর ফরহাদ ও আল-আমিন তখন ২ জন একটি বাসার সাবলেট হিসাবে থাকতেন। তারা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। এই স্বল্প বেতনে চাকরি করে এত অল্প সময়ের মধ্যেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ায় স্থানীয়রা নানা প্রশ্ন করছেন।

জানা যায়, আল-আমিন তার স্ত্রীকে নিয়ে বেশ কয়েকবার জার্মানি ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। তিনি এখন স্থায়ীভাবে জার্মানিতে বসবাসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সিন্ডিকেটের আত্মীয়-স্বজনের নামেও স্থাবর ও অস্থাবর অনেক টাকার সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া যাবে। এজন্য বিআরটিএ এর সদরদপ্তরে কর্মরত সদ্য বিদায়ী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) ও বর্তমানে পরিচালক রোড সেফটি শিতাংশু শেখর বিশ্বাস এবং মিরপুর-১৩ বিআরটিএ কর্মরত টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিনসহ অভিযুক্তদের জ্ঞতআয় বহির্ভূত হিসাব ও যাবতীয় দুর্নীতির তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করা জানানো হয়েছে।

এমএসএম / এমএসএম

বিআরটিএর টাইগার আইটির ম্যানেজারদের কোটিপতি হওয়ার কারিগর শিতাংশু

বিআরটিএ পরিচালক শীতাংশুর ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ

স্বৈরাচার সরকারের দোসর শিতাংশু-আলামিন সিন্ডিকেটের কাছে সেবা প্রত্যাশিরা জিম্মি

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা হরিলুট

গণপূর্তের ইএম কারখানা বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী মো: ইউসুফের দুর্নীতির রাজত্ব

দুর্নীতিতে পিছিয়ে নেই এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীগন

‘এনবিআর’এ স্বৈরাচার সরকারের পালিয়ে থাকা চক্রের চক্রান্ত

প্রাণ ধ্বংসকারী কোম্পানি প্রাণ

বিসিএসআইআরের ৬ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনায় ভাগ বাটোয়ারা

কোতোয়ালীতে অপহৃত ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার

রেজিস্ট্রি অফিসের প্রভাবশালী নকলনবিশের কাণ্ডঃ মন্ত্রীদের প্রভাবে চাঁদাবাজি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ

বিসিক এর নীরিক্ষা কর্মকর্তা সাবধান আলী হতে সাবধান!

কেরানীগঞ্জ উপজেলার রাজাবাড়ী রোডে অবৈধ এলপিজি বটলিং প্লান্ট এর সন্ধান