আল আমিনসহ পালিয়ে যাওয়ার চেস্টার অভিযোগ
বিআরটিএ পরিচালক শীতাংশুর ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক (রোড সেফটি) শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করা হয়েছে। আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটিআইআইইউ) তার ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করেছে। তিনি তার ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ করা অর্থ আয়কর নথিতে প্রদর্শন করেননি। এই বিনিয়োগের তথ্য গোপন করায় তার ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে। শুধু তিনিই নয়, তার নানা দুর্নীতি অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনায় বিআরটিএর বেশ কয়েকজন সহযোগির কর্মকর্তার আয়কর নথিরও তদন্ত করা হচ্ছে।
“দৈনিক সকালের সময় ২৯ আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের দোসর শিতাংশু -আলামিন সিন্ডিকেটের কাছে সেবা প্রত্যাশিরা জিম্মি” শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। উক্ত সংবাদ প্রকাশের পর মিরপুর বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোড়ন সৃস্টি হয়েছে। শিতাংশু ও আল আমিনের নানা অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে দৈনিক সকালের সময়ের কাছে তথ্য এবং তাদের কাছে সেবা প্রত্যাশিদের হয়রানীর কথা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের দুর্নীতি অনিয়মের অন্যতম সিপাহ সালাহ ছিলেন স্বৈরাচার সরকারের পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকী। আর ব্যাংক হিসাব জব্দ করার আগেই তিনি কয়েক কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। তার অন্যতম বিশ্বস্ত বন্ধু বিদেশে পালিয়ে গেছেন। এখন তিওি পালিয়ে যাওয়ার চেস্টা করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিআরটিএ এর সদর দপ্তরে কর্মরত পরিচালক (রোড সেফটি) শিতাংশু শেখর বিশ্বাস এর চাকরি জীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িত ছিলেন। গত ২০০৮ সালে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বিআরটিএ এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে এক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। আর সেই প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের তালিকায় শিতাংশু শেখর বিশ্বাসেরও নাম রয়েছে। তিনি তখন বরিশাল বিআরটিএ এর সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।এরপর মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে ও এস ডি করা হয়। আর এখন তার অন্যতম সহযোগি হলেন- টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন। তিনি এখন বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও জানা গেছে।
সূত্র জানায়, কালো তালিকাভুক্ত টাইগার আইটি স্বৈরাচার সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ছত্র-ছায়ায় বিআরটিএর প্রকল্পে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে।ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর অফিসের (পিএমও) দাপটে কোনো বিআরটিএ অফিসার দীর্ঘ দিন মুখ খোলেননি। জাল, অবৈধ ও ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স ঠেকাতে ২০১১ সালে ইলেকট্রনিক চিপযুক্ত ডিজিটাল স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রবর্তন করে। আর এই টাইগার আইটি-ই শুরু থেকেই বিআরটিএ প্রকল্পে যুক্ত ছিল। বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকাভুক্ত হওয়াগত ২০১৯ সালের আগস্টে ‘টাইগার আইটি’র সঙ্গে বিআরটিএর চুক্তি বাতিল করে। এটা এক ধরনের আইওয়াশ ছিল মাত্র।এরপর নতুন টেন্ডার করে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সকে নিয়োগ দিলেও চুক্তির মেয়াদ গত ২০২১-এর জুন পর্যন্ত স্মার্টকার্ডের সার্ভার এবং ডেটাবেজ হস্তান্তর করতে গড়িমসি করতে থাকে।গত ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি টেন্ডার ছাড়াই ৪ লাখ ডিজিটাল স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স কিনতে ১৮ দশমিক ৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার মন্ত্রিসভা। আর প্রতিটি লাইসেন্স প্রায় ১০ গুণ বেশি দামে উচ্চাপর্যায়ের নির্দেশে তা কেনা হয়। আর প্রতিটি স্মার্টকার্ডের বাজারমূল্য ৫০ টাকা হলেও প্রকল্পে প্রায় ৫০০ টাকা (৪৭২.৬০ টাকা) করে কেনা হয়। তাছাড়া, বছরগুলো ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুর পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনা করে প্রতি বছর গড়ে ৩ লাখ স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রয়োজন হয়। এর পুরোটাই টাইগার আইটি সরবরাহ করে আসছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। আর তৎকালীন টাইগার আইটির চেয়ারম্যঅন জিয়াউর রহমান এখন বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা গেছে।
পলাতক শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও সাবেক সড়ক পরিবহন এবং সেতুমন্ত্রী ওয়াবদুল কাদেরের প্রভাব খাটিয়ে বিআরটিএর এ প্রকল্পের কাজ করতে কোনো টেন্ডার ও যাচাই-বাছাই করতে হয়নি। এতে সরকারি কাজে বিআরটিএর প্রকল্পকে কুক্ষিগত করে বছরের পর বছর কাজ পেয়ে আসছে টাইগার আইটি। আর এই টাইগার আইটির ম্যানেজার আল আমিন একক আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর এক যুগের বেশি সময় ধরে বিআরটিএতে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পেয়ে আসছে এ প্রতিষ্ঠানটি। সক্ষমতা থাকলেও বিআরটিএর আরএফআইডি স্মার্টকার্ড প্রকল্পে টাইগার আইটির সঙ্গে দেশীয় কোন প্রতিষ্ঠান যায়নি। তখন শিতাংশু শেখর বিশ্বাস তারেক সিদ্দিকী ও সজিব ওয়াজেদ জয় এর প্রভাব খাটিয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রকার প্রতিযোগিতা ব্যতিত কাজ পেতো টাইগার আইটি।
টাইগার আইটির চেয়ারম্যানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকায় ওরাকল, সিসকোর মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটির সঙ্গে কোনো কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তিনি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে কাজ করতে ইউরোপের কয়েকটি শেল কোম্পানি প্রকৃতপক্ষে মুদ্রা পাচারের জন্য খোলা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন, ঢাকা ওয়াসা, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, এনআইডি অনুবিভাগের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে আইবিসিএস-প্রাইমেক্স নামে ছদ্মবেশী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েক শ কোটি টাকার কাজ করেছে টাইগার আইটি। আর নির্বাচন কমিশনের স্মার্টকার্ড মুদ্রণ-সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পেও দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে টাইগার আইটির বিরুদ্ধে। দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটিকে ২০১৯ সালে সাড়ে ৯ বছরের জন্য এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমানকে সাড়ে ৬ বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করে। তারপরও বিআরটিএতে টাইগার আইটির আধিপত্য বিস্তার করে। বিআরটিএর স্মার্টকার্ডসহ সরকারি প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন পলাতক তারিক আহমেদ সিদ্দিকের স্ত্রী শাহনাজ সিদ্দিক। তিনি ভারতীয় একটি চক্রের মাধ্যমে এখনো চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন কোম্পানির নামে পুরো প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ টাইগার আইটি করছেন।অথচ কালো তালিকাভুক্ত হিসেবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের কোনো টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না টাইগার আইটি।
এদিকে মিরপুর-১৩ বিআরটিএ কর্মরত টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন এর আধিপত্য এখনো বহাল রয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় গড়ে তোলা দালাল চক্রের গডফাদার হিসেবে তিনি এখনো আধিপত্র বিস্তার করে আসছেন। তার নেতৃত্বে প্রায় শতাধিক দালাল দালালীর কাছে ব্যস্ত থাকছেন। তাদের দিয়ে প্রতিদিন নানা জালিয়াতিসহ সেবা প্রত্যাশীদের হয়রানী ছাড়াও ‘মব’ সৃস্টি করছেন। মিরপুরে বিআরটিএ -১৩ এর কার্যালয়ে মাঝে মধ্যে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক করছে। মোবাইল কোর্ট বসিয়েও জেল জরিমানা করা হচ্ছে। তারপরও টাইগার আইটির আল আমীন বাহিনীর তান্ডব থামছে না।
সম্প্রতি একজন সংবাদ কর্মী দালাল চক্রের সদস্য ও টাইগার আইটির ম্যানেজার আল আমীন বাহিনীর যৌথ হেনস্তা শিকার হয়েছেন। তাকে অবরুদ্ধ করে নিপীড়ন করা হয়েছে। তিনি দালাল চক্র ও অনিয়ম বিষয়ে অনুসন্ধানী তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয়ে যান। প্রথমে তিনি ১০১ নং রুমে মালিকানা শাখায় প্রবেশ করে দালালদের বিষয়ে জানতে চাইলে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক রাসেল বিষয়টি এড়িয়ে যান। এরপর তিনি দ্বিতীয় তলায় মোটরসাইকেল মালিকানা ও রেজিস্ট্রেশন শাখার সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) শামসুল কবিরের কক্ষে গেলে আনসার ক্যাম্পের সদস্যরা দালাল তাকে ক্যাম্পে নিয়ে অপমান করে ছেড়ে দেয়।
বিআরটিএর সূত্র জানায়, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠান ‘সিএনএস’ এর সাথেও শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের কমিশন বাণিজ্য ছিল। লাইসেন্স প্রিন্টিংয়ের কাজ এসরকারি সংস্থার সক্ষমতা না থাকায় টেন্ডার বাতিল করে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডারের কাজ দেয়া হয়। ঘটনাটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হলে বিআরটিএ কর্র্তৃপক্ষ সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠান ‘সিএনএস’ এর টেন্ডার বাতিল করে।আর শিতাংশু শেখর বিশ্বাসকে শাস্তিস্বরূপ পরিচালক (ইঞ্জিঃ) থেকে রোড সেফটি তে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তিনি চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে অবসরে যাবেন বলে সূত্রে জানা গেছে।
শিতাংশু শেখর বিশ্বাস বিআরটিএ তে কর্মরত অবস্থায় উৎকোচ ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্যাপক ধন সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। বহুল আলোচিত ‘টাইগার আইটি’ এর সাবেক ম্যানেজার শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের বন্ধু রাজিব কে. চৌধুরীর মাধ্যমে আমেরিকায় একাধিক সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন। তাছাড়া, বহুল আলোচিত শিতাংশু শেখর বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ সহচর মিরপুর-১৩ বিআরটিএ তে কর্মরত ‘টাইগার আইটি’ কর্তৃক নিয়োজিত ডিজিটাল নম্বর প্লেট এবং স্মার্ট কার্ড সেকশনে কর্মরত ম্যানেজার আল-আমিনের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি দুর্নীতি-অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন। আল আমিন স্বপরিবারে মাঝে মধ্যে দেশের বাইরে ভ্রমনে বিলাশী জীবন যাপন করছেন।
মিরপুর-১৩ বিআরটিএ কর্মরত টাইগার আইটির ম্যানেজার আল-আমিন এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকালের সময়কে বলেন, আমি দীর্ঘ দিন ধরেই এখানে কর্মরত। তাই আমার প্রতিপক্ষ থাকতেই পারে। তারাই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এমএসএম / এমএসএম

বিআরটিএর টাইগার আইটির ম্যানেজারদের কোটিপতি হওয়ার কারিগর শিতাংশু

বিআরটিএ পরিচালক শীতাংশুর ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ

স্বৈরাচার সরকারের দোসর শিতাংশু-আলামিন সিন্ডিকেটের কাছে সেবা প্রত্যাশিরা জিম্মি

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা হরিলুট

গণপূর্তের ইএম কারখানা বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী মো: ইউসুফের দুর্নীতির রাজত্ব

দুর্নীতিতে পিছিয়ে নেই এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীগন

‘এনবিআর’এ স্বৈরাচার সরকারের পালিয়ে থাকা চক্রের চক্রান্ত

প্রাণ ধ্বংসকারী কোম্পানি প্রাণ

বিসিএসআইআরের ৬ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনায় ভাগ বাটোয়ারা

কোতোয়ালীতে অপহৃত ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার

রেজিস্ট্রি অফিসের প্রভাবশালী নকলনবিশের কাণ্ডঃ মন্ত্রীদের প্রভাবে চাঁদাবাজি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ

বিসিক এর নীরিক্ষা কর্মকর্তা সাবধান আলী হতে সাবধান!
