মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব
মাদকাসক্তি বর্তমান সমাজের অন্যতম ভয়াবহ সমস্যা। এটি শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকে নয়, পুরো পরিবার, সমাজ এবং জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। নেশাগ্রস্ত মানুষ তার ঈমান, নৈতিকতা, স্বাস্থ্য ও চরিত্র হারাতে থাকে। ইসলাম, যা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, মানুষের জীবনের প্রতিটি দিক সংরক্ষণের ওপর জোর দেয়। তাই মাদক এবং নেশাজাতীয় বস্তু ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্যনির্ণয়ক তীর শয়তানের নোংরা কাজ। সুতরাং তোমরা তা পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো’ (সুরা মায়েদা : ৯০)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, মদ বা নেশাজাতীয় বস্তু মানুষের বুদ্ধি ও বিবেককে বিভ্রান্ত করে এবং শয়তানের পথে নিয়ে যায়। ইসলাম এই ধরনের বস্তু থেকে মানুষকে দূরে রাখার জন্য সতর্ক করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি নেশাজাতীয় বস্তুই হারাম এবং প্রতিটি নেশাই খামর।’ (মুসলিম, হাদিস : ২০০৩)
মাদক মানুষের সবচেয়ে বড় নেয়ামত ‘আকল’ বা বিবেক শক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। একজন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি হালাল ও হারামের পার্থক্য করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সে নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদতে অবহেলা করে। এতে তার ঈমান দুর্বল হয় এবং পাপের দিকে সে আকৃষ্ট হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মদ হলো সব অশ্লীলতার মূল’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৩৭১)। মাদকাসক্ত ব্যক্তির চরিত্র নষ্ট হয়। সে সহজেই মিথ্যা, চুরি, প্রতারণা, ব্যভিচার ও সহিংসতার মতো কাজের দিকে ঝুঁকে পড়ে। নেশা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক, উদাসীন এবং অসহায় করে তোলে। একদিকে সে নিজের জীবন ধ্বংস করছে, অন্যদিকে সমাজের জন্যও বিপদ তৈরি করছে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার পরিবারের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। তার নেশার জন্য উপার্জনের অর্থ ব্যয় হয় এবং পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। সংসারে নেমে আসে অশান্তি, কলহ এবং মানসিক চাপ। স্ত্রী ও সন্তানরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের জীবন নিরাপদ থাকে না। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো’ (সুরা তাহরিম : ৬)। মাদকাসক্তি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করে না, এটি সম্পর্কের বন্ধনও দুর্বল করে। মা-বাবার দায়িত্ব পালন না করা, সন্তানদের সঠিক শিক্ষা ও পবিত্র পরিবেশ থেকে বঞ্চিত করা এসবই মাদকের প্রভাব।
মাদক শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও মারাত্মক হুমকি। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিরা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। ছিনতাই, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ এবং সন্ত্রাসের পেছনে মাদক অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি সমাজের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সমাজের শান্তি, নৈতিকতা এবং আইনশৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাদক ও অপরাধের সম্পর্ক নিয়ে ইসলামি গবেষকরা বলছেন, সমাজে যদি নেশার প্রবণতা বেশি হয়, তা হলে অপরাধের হারও বেশি থাকে। একদিকে যুবসমাজ তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা হারায়, অন্যদিকে অপরাধ প্রবণ মানুষ সমাজে অনাচার ও অশান্তির সৃষ্টি করে।
মাদক মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি লিভার, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্ককে ধ্বংস করে। অনেক নেশা মানুষের পক্ষে মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে। মানসিকভাবে নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি হতাশা, উদ্বেগ এবং আক্রমণাত্মক প্রবণতার শিকার হয়। অনেক সময় আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যা বেশি পরিমাণে নেশা সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও হারাম’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৬৮১)। এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম জীবনের প্রতিটি ক্ষতি ও ঝুঁকির প্রতি গুরুত্ব দেয়। মানুষ যেন নেশা ও ধ্বংসাত্মক অভ্যাস থেকে দূরে থাকে, এ জন্য আল্লাহর শাস্তি ও হারামের বিধান রয়েছে।
ইসলাম মানুষকে শুধু সতর্ক করেনি, বরং মুক্তির পথও দেখিয়েছে। আন্তরিক তওবা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, নিয়মিত নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত এবং সৎ সঙ্গ গ্রহণের মাধ্যমে মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি সম্ভব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৮)। সৎ বন্ধুবান্ধব, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপন মানুষকে নেশার চক্র থেকে মুক্তি দেয়। পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সৎ শিক্ষা, মনোযোগ এবং সহযোগিতা দিয়ে যুবসমাজকে বিপথগামী হতে দেওয়া যাবে না।
মাদকাসক্ত ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের জন্য এক ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক ব্যাধি। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এটি সম্পূর্ণ হারাম এবং পরিত্যাজ্য। আমাদের দায়িত্ব হলো নিজে মাদক থেকে দূরে থাকা এবং অন্যদেরও সচেতন করা। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের এবং আগামী প্রজন্মকে এই অভিশাপ থেকে হেফাজত করেন।
মাদকাসক্তি শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, এটি মানসিক, নৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি আনয়ন করে। এটি জীবনকে অপূর্ণ করে দেয়। ইসলাম মানুষকে সতর্ক করেছে, যাতে মানুষ নিজের জীবন, পরিবার ও সমাজকে নিরাপদ রাখে। তাই আমাদের উচিত মাদককে সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা এবং যুবসমাজকে সচেতন ও ধর্মমুখী করে গড়ে তোলা। সচেতনতা, প্রার্থনা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সৎ জীবনযাপনই মাদকাসক্তি রোধের মূল পথ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিরাপদ ও ন্যায়পরায়ণ জীবন দান করুন।
আরমান / আরমান
মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব
পুরুষের পোশাকের বিধান
শাবান মাসে মুমিনের করণীয়
সালাম জান্নাতের অভিবাদন
ঐক্যবদ্ধ থাকার সুফল
পরকালের বিভীষিকাময় পথ ‘পুলসিরাত’
নবীজির মেরাজের সফর আমাদের শিক্ষা
সম্পদ খরচে হিসাব প্রয়োজন
ভ্রমণে সত্যের সন্ধান
পরশ্রীকাতরতা মানুষের যে ক্ষতি করে
অসুস্থতার বিনিময়ে পাপ থেকে মুক্তি
অব্যাহত আমলে সমৃদ্ধ জীবন