পরশ্রীকাতরতা মানুষের যে ক্ষতি করে
পরশ্রীকাতরতা বা হিংসা এমন এক অভিশাপ, যা মানুষের অন্তরকে অন্ধকারে ঢেকে দেয় এবং মনকে বিষাক্ত করে ফেলে। এটি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি করে না, বরং সামাজিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতিতেও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। ইসলাম পরশ্রীকাতরতাকে অত্যন্ত নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করে এবং এ থেকে সতর্ক করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলো, আমি আশ্রয় চাই হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে’ (সুরা ফালাক, আয়াত : ৫)।
এখানে আল্লাহ আমাদের পরশ্রীকাতরতার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা চাইতে নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ হিংসা মানুষের অন্তরকে কাঁপিয়ে দেয় এবং সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, হিংসা নেক আমলগুলোকে আগুনের মতো ধ্বংস করে দেয়’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৭৮৯)।
এই হাদিসে পরিষ্কার বলা হয়েছে, হিংসা শুধু মনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এটি নেক আমলকেও শেষ করে দেয়, অর্থাৎ ব্যক্তি তার সৎ কাজের সওয়াব হারায়।
পরশ্রীকাতরতা মানব ইতিহাসে সর্বদা বিপর্যয়ের কারণ হয়ে এসেছে। হজরত আদম (আ.) ও হাবিল ও কাবিলের কাহিনিই এর সবচেয়ে প্রখ্যাত উদাহরণ। কাবিল তার ভাই হাবিলকে হিংসা করে হত্যা করে, যা মানবসমাজের প্রথম হত্যাকাণ্ড হিসেবে ইতিহাসে রয়েছে। এটা প্রমাণ করে, হিংসা কেবল মানসিক অশান্তি নয়, বরং সামাজিক অশান্তির এক মূল উৎস। ইসলাম এক আদর্শ জীবনদর্শন হিসেবে পরশ্রীকাতরতা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তি প্রকৃত মুসলিম নয়, যে তার ভাইয়ের জন্য এমন কিছু কামনা করে না, যা নিজের জন্য কামনা করে’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৮১৪)।
এখানে ইমাম মুসলিম আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, ঈর্ষা বা পরশ্রীকাতরতা বাদ দিয়ে অন্যের কল্যাণ কামনা করাই প্রকৃত মুসলমানের পরিচয়। পরশ্রীকাতরতা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক ও দুর্বল করে ফেলে। এতে আত্মার শান্তি হারিয়ে যায় এবং মনোজগৎ অস্থির হয়ে পড়ে। বর্তমানে আমরা সমাজে দেখি, অনেকেই অন্যের সাফল্যে খুশি হতে পারে না, যার ফলে তারা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ থেকে মুক্তির পথ হলো কৃতজ্ঞতা ও ধৈর্য ধারণ। ইসলামে পরশ্রীকাতরতা থেকে মুক্তির জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা আছে। আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ ও ভাগ্যে সন্তুষ্ট থাকা একটি অন্যতম গুণ। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, ‘আল্লাহ যাদের মধ্যে থাকেন, তাদের তিনি ভালোবাসেন এবং যারা ধৈর্যশীল তারা পুরস্কৃত হবেন’ (সুরা আহযাব, আয়াত : ৩৫)। রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘সফল ওই ব্যক্তি, যার ঈমান সম্পূর্ণ, তার জীবন ও জীবিকার প্রতি সন্তুষ্ট। আর যার ঈমান নেই, তার হৃদয়ে ঈর্ষা বাস করে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩৫৯)। এখানে আমাদের শেখানো হচ্ছে নিজের জীবনে সন্তুষ্টি ও আল্লাহর ওপর বিশ্বাসই পরশ্রীকাতরতা থেকে রক্ষা করে।
পরশ্রীকাতরতা থেকে মুক্তির আরেকটি উপায় হলো নিজের আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা। যেহেতু পরশ্রীকাতরতা আত্মার রুগ্নতা, তাই নিজের আত্মাকে ভালো কাজে মনোনিবেশ করতে হবে। এমনকি অন্যের সাফল্যের জন্য দোয়া করাও একটি মহৎ কাজ। এটি আত্মার প্রশান্তি ও সামাজিক বন্ধন জোরদার করে। সুতরাং পরশ্রীকাতরতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের উচিত নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, কৃতজ্ঞ মনোভাব গড়ে তোলা এবং আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখা। আল্লাহর স্মরণ, কুরআনের তেলাওয়াত ও দোয়া আমাদের অন্তরকে প্রশান্তি দেয় এবং ঈর্ষা, হিংসা থেকে দূরে রাখে। পরিশেষে বলা যায়, পরশ্রীকাতরতা জীবনের এক বড় শত্রু। এটি শুধু ব্যক্তিগত জীবনে অশান্তি আনে না বরং সমাজের ভিতেও ফাটল সৃষ্টি করে। ইসলাম আমাদের চিরকালই পরশ্রীকাতরতা পরিহার করে ঈমানদার, ধৈর্যশীল ও পরোপকারী জীবনযাপনের আহ্বান জানায়। এতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরশ্রীকাতরতা থেকে বেঁচে থাকার তওফিক দান করুন।
Aminur / Aminur
পরশ্রীকাতরতা মানুষের যে ক্ষতি করে
অসুস্থতার বিনিময়ে পাপ থেকে মুক্তি
অব্যাহত আমলে সমৃদ্ধ জীবন
ধনীরা যে সত্যগুলো গোপন রাখতে চায়ঃ শায়খ মু. নুমান রিডার
শীতার্তদের পাশে দাঁড়ান
জুলুমের পরিণাম নিজের ওপরই ফিরে আসে
জুমার নামাজ কতক্ষণ পর্যন্ত দেরি করে পড়া যায়?
নতুন বছর শোভিত হোক পুণ্যে
মৃত্যুর ঘটনায় জীবিতদের কর্তব্য
তীব্র শীতে মসজিদের পথে : ত্যাগ ও প্রাপ্তি
মাদক থেকে পাপ ও অপরাধের সূচনা
আমানতদার ব্যক্তির মর্যাদা ও পুরস্কার