জ্ঞান ও সভ্যতার চিরন্তন দর্শন
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু বাঁক আছে, যেখান থেকে দুনিয়ার গতিপথ আমূল বদলে যায়। মানুষের চিন্তা, জীবনবোধ, সমাজব্যবস্থা ও নৈতিক মানদণ্ড নতুন দিশা পায়। সপ্তম শতাব্দীর আরব উপদ্বীপে ইসলামের আবির্ভাব তেমনই এক যুগান্তকারী ঘটনা। মরু প্রান্তরের এক কোণে জন্ম নেওয়া এই ধর্ম কেবল আধ্যাত্মিক মুক্তির আহ্বান নিয়ে আসেনি; বরং জ্ঞান, ন্যায় ও মানবিকতার ওপর দাঁড়িয়ে এক পূর্ণাঙ্গ সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
ইসলাম তাই শুধু একটি বিশ্বাসের নাম নয়, এটি একটি চিরন্তন দর্শন যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থার জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। অন্ধকারে নিমজ্জিত এক পৃথিবীতে ইসলাম জ্বালিয়েছিল জ্ঞানের প্রদীপ, প্রতিষ্ঠা করেছিল ন্যায়বিচারের শাসন এবং মানবসভ্যতাকে উপহার দিয়েছিল এক ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা।
ইসলামের পূর্ববর্তী বিশ্বচিত্র ছিল গভীর বৈষম্য, অজ্ঞতা ও অবিচারের করালগ্রাসে আক্রান্ত। আরব সমাজে কন্যাশিশু জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, দাসপ্রথা ছিল স্বাভাবিক, শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ করত নির্দ্বিধায়। শুধু আরব নয়, তৎকালীন বাইজেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্যেও সামাজিক অবক্ষয়, শ্রেণিবৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র স্পষ্ট ছিল। এই প্রেক্ষাপটে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে ইসলামের আবির্ভাব মানবজাতির জন্য এক নতুন সূর্যোদয়ের মতো।
কুরআনের প্রথম নির্দেশই ছিল ‘পড়ো’— যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞানকে কেন্দ্র করে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এখান থেকেই ইসলাম নিজেকে ঘোষণা করে জ্ঞাননির্ভর, বিবেকনির্ভর ও ন্যায়ভিত্তিক এক সভ্যতা হিসেবে।
ইসলামি সভ্যতার উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি একটি ধারাবাহিক মানবমুক্তির ইতিহাস। মহানবী (সা.) মক্কায় তাওহিদের আহ্বান জানিয়ে প্রথমে মানুষের চিন্তার শৃঙ্খল ভাঙেন। মানুষকে দাসত্বের সব রূপ থেকে মুক্ত করে একমাত্র আল্লাহর দাসত্বে আহ্বান জানান। এই মুক্তির দর্শনই ইসলামের সভ্যতাগত শক্তির মূল। কারণ যেখানে মানুষ মানুষকে প্রভু বানায়, সেখানে ন্যায় কখনো প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
ইসলাম ঘোষণা করে— সব মানুষ সমান, শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি তাকওয়া ও নৈতিকতা। এই এক ঘোষণাই পুরো সমাজব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দেয়।
মদিনায় হিজরতের পর মহানবী (সা.) যে রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেন, তা ছিল ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধানগুলোর একটি যার নাম ‘মদিনা সনদ’। এখানে মুসলিম, ইহুদি ও অন্য সম্প্রদায়ের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছিল। ধর্মীয় স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সহাবস্থান সবই এই সনদে স্থান পেয়েছিল। এটি প্রমাণ করে ইসলাম কেবল উপাসনালয়ের ধর্ম নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক জীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো প্রদান করে।
কুরআন ইসলামের জ্ঞানভিত্তিক দর্শনের মূল উৎস। কুরআনে বারবার চিন্তা, গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও অনুধ্যানের আহ্বান জানানো হয়েছে। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি, রাত-দিনের পরিবর্তন, মানবদেহের গঠ— সবকিছু নিয়েই মানুষকে ভাবতে বলা হয়েছে। কুরআনের পাতায় পাতায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে এই প্রশ্ন, ‘তোমরা কি চিন্তা করো না?’ ফলে মুসলিম মননে জন্ম নিয়েছে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি। এই দৃষ্টিই পরবর্তীতে ইসলামি সভ্যতায় বিজ্ঞান, চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শনের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটিয়েছে।
হাদিস শরিফ ইসলামের নৈতিক ও ব্যবহারিক দর্শনের বাস্তব রূপ। মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল কুরআনের জীবন্ত ব্যাখ্যা। তিনি জ্ঞানার্জনকে ফরজ ঘোষণা করেছেন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে।
তিনি বলেছেন, জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীনেও যেতে। এই আহ্বান মুসলিমদের জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছে। নবী (সা.) নিজে ছিলেন সহনশীলতা, ন্যায় ও করুণার মূর্ত প্রতীক। শত্রুকেও ক্ষমা করা, দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানো, এতিম ও দরিদ্রের অধিকার রক্ষা— এসব তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে ইসলামি সভ্যতা গড়ে উঠেছে মানবিক মূল্যবোধের ওপর।
সিরাতের আলোকে দেখা যায়, ইসলামের সমাজব্যবস্থা ছিল ন্যায়নিষ্ঠ ও কল্যাণমুখী। জাকাত ব্যবস্থা সামাজিক নিরাপত্তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ধনীদের সম্পদে দরিদ্রের অধিকার নিশ্চিত করে ইসলাম সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে। সুদ নিষিদ্ধ করে শোষণমুক্ত অর্থব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে নৈতিকতা, মাপে ও ওজনে সততা— এসবই ইসলামি অর্থনৈতিক দর্শনের অংশ। ফলে ইসলামি সমাজে অর্থ ছিল মানুষের সেবক, প্রভু নয়।
ইসলামি দর্শন মানবসভ্যতার বিকাশে যুক্তিবাদ ও নৈতিকতার এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছে। গ্রিক দর্শন যেখানে অনেক সময় কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে ইসলাম যুক্তির সঙ্গে নৈতিক দায়বদ্ধতাকে যুক্ত করেছে। আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, আল-গাজালি, ইবনে রুশদের মতো মনীষীরা দর্শন, চিকিৎসা ও ধর্মতত্ত্বে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তাদের চিন্তাধারা ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অথচ এই মনীষীরা নিজেদের জ্ঞানচর্চাকে কখনো ঈমান থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি।
ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে বাগদাদ, কর্ডোভা, দামেস্ক ও কায়রো ছিল জ্ঞানের কেন্দ্র। গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার গড়ে উঠেছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জ্ঞানচর্চার সুযোগ ছিল উন্মুক্ত। কর্ডোভার লাইব্রেরিতে লাখ লাখ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল, যখন ইউরোপ অন্ধকার যুগে নিমজ্জিত। এই ইতিহাস প্রমাণ করে, ইসলামি সভ্যতা কখনো জ্ঞানের শত্রু ছিল না; বরং জ্ঞানই ছিল তার প্রাণশক্তি।
ন্যায়বিচার ইসলামের আরেকটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াও, তা নিজের বা নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধে হলেও। শাসক ও শাসিতের মধ্যে আইনের দৃষ্টিতে সমতা ইসলামের মৌলিক নীতি। দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামল ন্যায়বিচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর সময় শাসক নিজেই আদালতে সাধারণ নাগরিকের মতো জবাবদিহি করেছেন। এই ন্যায়ভিত্তিক শাসনই ইসলামি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য করেছে।
মানবমুক্তির প্রশ্নে ইসলাম একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। এটি শুধু আত্মিক মুক্তির কথা বলে না; বরং ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অজ্ঞতা ও অবিচার থেকে মুক্তির কথাও বলে। মানুষকে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা দেয়, তবে সেই স্বাধীনতাকে নৈতিকতার সঙ্গে বেঁধে দেয়। ফলে ইসলামি দর্শনে স্বাধীনতা ও দায়িত্ব পরস্পরবিরোধী নয়; বরং পরিপূরক।
আধুনিক বিশ্বে যখন সভ্যতা সংকটে, নৈতিক অবক্ষয় ও বৈষম্য যখন প্রকট, তখন ইসলামের চিরন্তন দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ইসলাম তাই কোনো অতীতচারী মতবাদ নয়। এটি সময়কে অতিক্রম করে চলা এক দর্শন। কুরআন ও সুন্নাহর মূলনীতি চিরস্থায়ী, তবে প্রয়োগে রয়েছে সময় ও বাস্তবতার বিবেচনা। এই গতিশীলতাই ইসলামের শক্তি।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— যখন মুসলিমরা ইসলামের জ্ঞান, ন্যায় ও মানবিক দর্শনকে ধারণ করেছে, তখনই তারা সভ্যতার নেতৃত্ব দিয়েছে। আর যখন তারা এই মূলনীতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তখনই পতন এসেছে।
তাই ইসলাম মানবসভ্যতার প্রথম ঠিকানাই শুধু নয়; এটি মানবতার চূড়ান্ত আশ্রয়। জ্ঞানকে আলোকবর্তিকা, ন্যায়কে ভিত্তি এবং মানবিকতাকে লক্ষ্য করে যে সভ্যতা গড়ে ওঠে, ইসলাম তারই নাম। এই দর্শন কোনো নির্দিষ্ট ভূগোল বা সময়ের জন্য নয়; এটি পুরো মানবজাতির জন্য। আজও যদি বিশ্ব ন্যায়, শান্তি ও অর্থবহ উন্নতির পথ খুঁজতে চায়, তবে ইসলামের চিরন্তন দর্শনের দিকে ফিরে আসা ছাড়া বিকল্প নেই।
Aminur / Aminur
রবের করুণা অর্জনের প্রেরণা
জ্ঞান ও সভ্যতার চিরন্তন দর্শন
ইসলামের দৃষ্টিতে ক্রয়-বিক্রয়ের লভ্যাংশ
সাহাবিদের ব্যবসায়িক সাফল্যের রহস্য
কুরআন শরিফের অনন্য বৈশিষ্ট্য
মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব
পুরুষের পোশাকের বিধান
শাবান মাসে মুমিনের করণীয়
সালাম জান্নাতের অভিবাদন
ঐক্যবদ্ধ থাকার সুফল
পরকালের বিভীষিকাময় পথ ‘পুলসিরাত’
নবীজির মেরাজের সফর আমাদের শিক্ষা