সাহাবিদের ব্যবসায়িক সাফল্যের রহস্য
মানুষের সাফল্যকে শুধু সম্পদ বা ডিজিটগত অর্জন দিয়ে মাপা সমকালীন সমাজের একটি প্রচলিত প্রবণতা। কিন্তু ইসলামি ইতিহাসে এমন ব্যক্তিত্ব আছেন, যারা দেখিয়েছেন সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড এর চেয়েও গভীর। সাহাবিদের মধ্যে আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) এবং উসমান (রা.) এ ক্ষেত্রে অনন্য উদাহরণ।
তাঁদের জীবন প্রমাণ করে যে, ব্যবসা ও ঈমান সামঞ্জস্যপূর্ণ, একে অপরকে শক্তিশালী করে।
হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ছিলেন সেই মানুষ, যিনি চরিত্র, অধ্যবসায় ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে নিঃস্ব অবস্থান থেকে অসীম সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন। হিজরত করার পর তিনি কোনো সম্পদ ছাড়া মদিনায় আসেন, কিন্তু তিনি মানুষের দান বা সহায়তা গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর আত্মমর্যাদা ও স্বাবলম্বী হওয়ার দৃঢ় মানসিকতা তাঁকে এক অনন্য অবস্থানে দাঁড় করায়। তিনি স্রেফ জানতে চাইলেন, বাজার কোথায়।
তিনি ধৈর্য, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমের মাধ্যমে একেবারে প্রাথমিক পণ্য-ব্যবসা থেকে শুরু করে বড় পরিসরের বাণিজ্যে উন্নীত হন। তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যের ভিত্তি ছিল দুটি প্রধান নীতি— ১. স্মার্ট বিনিয়োগ ও ২. নৈতিকতা।
বাজার বিশ্লেষণ করে তিনি সর্বদা উচ্চ চাহিদা ও কম ঝুঁকির খাতে বিনিয়োগ করতেন। তাঁর লাভ থেকে তিনি ব্যয় করতেন না; পুনর্বিনিয়োগ করতেন, যা তাঁর মূলধনকে দ্রুত বৃদ্ধি করে।
আধুনিক ভাষায় বলা যায়, তিনি ‘বুটস্ট্র্যাপিং’ পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সাফল্যের চেয়েও অধিক প্রশংসনীয় ছিল নৈতিকতা। তিনি কখনো প্রতারণা, লোভ বা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মূল্য আদায় করেননি। সংকটকালীন সময়ে তিনি মূল্য কমিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করেন। ব্যবসায় সবচেয়ে মূল্যবান পুঁজি ‘আস্থা’, এ সত্য তিনি নিজ কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর সম্পদ ছিল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত, আর ঈমান তাঁকে পরিচালিত করত মানুষকে সাহায্য করতে, সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে।
তিনি দান করতেন বিপুল পরিমাণ সম্পদ, সামরিক প্রয়োজন পূরণ করতেন, জমি, দাস ও সম্পত্তি বিতরণ করতেন।
উসমান (রা.)-এর জীবনও ইসলামি ব্যবসায়িক নীতির এক উজ্জ্বল মডেল। তিনি ছিলেন মক্কার অন্যতম ধনী ব্যক্তি, অপরিসীম বিনয়ী নেতা এবং ইসলামের তৃতীয় খলিফা।
তাঁর ব্যবসায়িক বুদ্ধিমত্তার অন্যতম উদাহরণ হলো, মদিনার একমাত্র পানির কূপ ক্রয়ের ঘটনা। কূপটি ছিল এক ব্যক্তির মালিকানাধীন এবং তিনি উচ্চমূল্যে পানি বিক্রি করতেন। উসমান (রা.) প্রথমে কূপের অর্ধাংশ কেনেন এবং মানুষকে প্রত্যেক বিকল্প দিনে বিনামূল্যে পানি নিতে দেন। ফলে পূর্ববর্তী মালিক লোকসানে পড়ে বাকি অংশ বিক্রি করতে বাধ্য হন। এরপর উসমান (রা.) পুরো কূপটিই জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।
এটি ছিল অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তাঁর দান, কার্যক্রম এবং মানুষের প্রতি আন্তরিকতা তাঁকে ব্যবসায়ী থেকে সামাজিক নেতা হিসেবে পরিচিতি দেয়।
একদা এক মহাদুর্ভিক্ষে যখন তাঁর হাজার উটের খাদ্যবাহী কাফেলা মদিনায় পৌঁছায় ব্যবসায়ীরা তখন দ্বিগুণ লাভ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তিনি মনে করতেন আল্লাহ তাঁর জন্য এর চেয়েও উত্তম প্রতিদান রেখেছেন। তিনি সব খাদ্যসামগ্রী নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে দান করেন।
উসমান (রা.)-এর করা ওয়াকফ সম্পদ আজও বিদ্যমান, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাতব্য কাজ, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং জনসেবায় ব্যয় হয়ে আসছে। আধুনিক ব্যবসা জগৎ গতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক এবং প্রায়শই নৈতিকতার চ্যালেঞ্জে ভরা। কিন্তু সাহাবিদের নীতিগুলো সময়-অতিক্রমী এবং সমকালীন সব বাজারেই প্রযোজ্য। তাঁদের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুস্পষ্ট; লাভ হতে পারে প্রয়োজন, কিন্তু মানুষের কল্যাণ, সততা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
ব্যবসার প্রকৃত সাফল্য শুধু সংখ্যায় নয়, বরং বরকতে নিহিত। বরকত আসে সততা, সেবা, উদারতা এবং সঠিক উদ্দেশ্য থেকে। যখন কোনো কাজে বরকত থাকে তখন অল্প থেকে অনেক উৎপন্ন হয়, আর ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা অসাধারণ ফল বয়ে আনে।
তাই ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় প্রশ্ন হওয়া উচিত— এটি কি আমাকে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি শুধুই সম্পদের দিকে? যে ব্যক্তি উভয়েই সফল, দুনিয়ার বৈধ উপার্জনে ও আখেরাতের সফলতায়— সত্যিকার অর্থে সাফল্যের প্রকৃত উদাহরণ সেই।
Aminur / Aminur
রবের করুণা অর্জনের প্রেরণা
জ্ঞান ও সভ্যতার চিরন্তন দর্শন
ইসলামের দৃষ্টিতে ক্রয়-বিক্রয়ের লভ্যাংশ
সাহাবিদের ব্যবসায়িক সাফল্যের রহস্য
কুরআন শরিফের অনন্য বৈশিষ্ট্য
মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব
পুরুষের পোশাকের বিধান
শাবান মাসে মুমিনের করণীয়
সালাম জান্নাতের অভিবাদন
ঐক্যবদ্ধ থাকার সুফল
পরকালের বিভীষিকাময় পথ ‘পুলসিরাত’
নবীজির মেরাজের সফর আমাদের শিক্ষা