ঢাকা রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

ইসলামের দৃষ্টিতে ক্রয়-বিক্রয়ের লভ্যাংশ


ডেস্ক রিপোর্ট  photo ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২৮-১-২০২৬ দুপুর ১০:৫৪

বর্তমান সময়ের বাজারব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। একদিকে খোলাবাজার, পাড়া-মহল্লার দোকান ও হাটে এখনও দরদামের প্রচলন রয়েছে; অন্যদিকে বড় বড় সুপারশপ, শোরুম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নির্ধারিত মূল্য (ফিক্সড প্রাইস) পদ্ধতিই নিয়মে পরিণত হয়েছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, দরদাম করা কি শরয়িভাবে উত্তম, নাকি নির্ধারিত দামে কেনাবেচাই অধিক গ্রহণযোগ্য? 
ইসলামে ক্রয়-বিক্রয়ের স্বরূপ 
ইসলাম ক্রয়-বিক্রয়কে কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে নৈতিকতা, সততা ও পারস্পরিক সন্তুষ্টির এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেছে। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ; তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হওয়া ব্যবসা বৈধ’ (সুরা নিসা : ২৯)। এই একটি আয়াতই মূলত ইসলামি ব্যবসা-বাণিজ্যের ভিত্তি স্থাপন করে দেয়। অর্থাৎ বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয় পক্ষ যে দামে সন্তুষ্ট হয়, শরয়িভাবে সে দামই চূড়ান্ত ও গ্রহণযোগ্য। 
নির্ধারিত মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় 
এই মৌলিক নীতির আলোকে নির্ধারিত দামে ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়টি বিচার করলে দেখা যায়, এতে কোনো সমস্যা নেই। আজকাল বড় বড় দোকান, সুপারশপ ও শোরুমে পণ্যের গায়ে মূল্য লেখা থাকে। ক্রেতা সে মূল্য দেখেই সিদ্ধান্ত নেয়, সে কিনবে কি না। এখানে দরদামের সুযোগ না থাকলেও যদি ক্রেতা জেনে-শুনে ও সন্তুষ্টচিত্তে পণ্যটি ক্রয় করে, তা হলে সেই বিক্রি সম্পূর্ণভাবে সহিহ ও জায়েজ। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, পণ্যের পরিচয় ও মূল্য স্পষ্ট হতে হবে এবং কোনো ধোঁকা বা প্রতারণা থাকতে পারবে না। 
দামাদামি করে ক্রয়-বিক্রয় 
একইভাবে দরদামের বিষয়টিও ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। যেসব বাজার বা দোকানে দরদামের সুযোগ রয়েছে, সেখানে দরদাম করা সম্পূর্ণ জায়েজ। তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা জরুরি যে, দরদাম করা মূলত একটি মুবাহ বা অনুমোদিত বিষয়। অর্থাৎ, কেউ দরদাম করলেও গুনাহগার হয় না, আবার কেউ দরদাম না করলেও দ্বীনের কোনো ক্ষতি হয় না। আসল বিবেচ্য বিষয় হলো, দরদামের পর যে দামে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়, তা যেন উভয় পক্ষের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হয়। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন দরদাম শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। অতিরিক্ত দরদাম করে বিক্রেতাকে বিব্রত করা, অশালীন ভাষা ব্যবহার করা, মিথ্যা অজুহাত দেখানো বা জবরদস্তি করে দাম কমানোর চেষ্টা, এসব আচরণ ইসলামি নীতির পরিপন্থী। ইসলাম মানুষকে কষ্ট দেওয়া, সময় নষ্ট করা কিংবা অপমান করাকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না। তাই দরদাম যদি ন্যায় ও ভদ্রতার সীমার মধ্যে থাকে, তবে তা জায়েজ; আর যদি তা অন্যায় ও কষ্টের কারণ হয়, তবে তা অনুচিত। 
সর্বোচ্চ কত মূল্যে পণ্য বিক্রয় করা যায় 
পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শরিয়ত কোনো নির্ধারিত সীমা বেঁধে দেয়নি। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতির ভিত্তিতে কম-বেশি যেকোনো দামে ক্রয়-বিক্রয় করা শরয়ি দৃষ্টিতে বৈধ। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, লেনদেনে কোনো প্রকার প্রতারণা, মিথ্যা তথ্য প্রদান, দোষ গোপন করা কিংবা ক্রেতাকে ভুল ধারণায় ফেলার আশ্রয় নেওয়া যাবে না। এ ধরনের অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করা হলে সেই লেনদেন নাজায়েজ হিসেবে গণ্য হবে (শরহুল মাজাল্লাহ : ১/৭৩; ফতোয়া দারুল উলুম, ফতোয়া নম্বর : ৬৬৬১২)। তবে খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে যদি সংকট বা দুর্ভিক্ষময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তা হলে এমন মাত্রায় লাভ রাখা যাবে না, যা সাধারণ ভোক্তার ওপর অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বরং এমন সংকটকালে বাজারদর অনুযায়ী অথবা সম্ভব হলে তার চেয়েও কম লাভে পণ্য বিক্রি করাকে শরিয়ত পছন্দ করেছে। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘সবচেয়ে নিকৃষ্ট বান্দা হলো মজুদদার (মুনাফাখোর); আল্লাহ তায়ালা যখন দাম কমিয়ে দেন, তখন সে দুঃখিত হয়, আর যখন দাম বাড়িয়ে দেন, তখন সে আনন্দিত হয়।’ (মাজমাউদ যাওয়ায়েদ : ১/১০৪) 
সারকথা হলো, যদি খাদ্যসংকট না থাকে অথবা এমন পণ্য হয় যা মানুষের জীবন ধারণে সরাসরি নির্ভরশীল নয়, তা হলে সেসব পণ্যের বিক্রয়ে লাভের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। তবে লোভ ও অতৃপ্ত আকাক্সক্ষা খুবই নিন্দিত চরিত্র। দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত মোহ ও লালসা অন্তরের ব্যাধি। তাই স্বাভাবিক অবস্থাতেও বাজারদর অনুযায়ী কিংবা সামান্য কম-বেশি করে পণ্য বিক্রি করা উচিত। আর মানুষের অসহায়ত্ব ও জরুরি প্রয়োজনকে পুঁজি করে অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করা ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাতে কোনো ধরনের প্রতারণা না থাকা। দরদামে হোক কিংবা নির্ধারিত মূল্য- উভয় অবস্থাতেই প্রতারণা নিষিদ্ধ। পণ্যের দোষ গোপন করা, ভেজাল দেওয়া, ভুল তথ্য দিয়ে দাম বাড়ানো বা কমানো, এসবই হারামের অন্তর্ভুক্ত। রাসুল (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’  (মুসলিম : ১০১)। এই হাদিস প্রমাণ করে যে ব্যবসায় সততা ইসলামের একটি মৌলিক দাবি।

Aminur / Aminur