পরকালের বিভীষিকাময় পথ ‘পুলসিরাত’
কেয়ামতের দিন যখন আসমান-জমিন পরিবর্তন হয়ে যাবে তখন হাশরের ময়দানের বাইরে শুধু দুটি স্থান থাকবে। একটি জান্নাত আরেকটি জাহান্নাম। জান্নাতে পৌঁছার জন্য অবশ্যই জাহান্নামের ওপর দিয়ে যেতে হবে। কারণ এ ছাড়া আর কোনো রাস্তা থাকবে না। তাই জাহান্নামের ওপর একটি পুল স্থাপন করা হবে। এরই নাম সিরাত বা পুলসিরাত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি তাদের ভালো করে জানি যারা জাহান্নামে যাওয়ার অধিক উপযুক্ত। আর তোমাদের সবাই জাহান্নামের ওপর দিয়ে গমনকারী, এ কথা আপনার পরওয়ারদিগারের ওপর আবশ্যক ফয়সালাকৃত। অতঃপর আমি সেসব মানুষকে মুক্তি দেব যারা আল্লাহকে ভয় করত, আর অত্যাচারীদের জাহান্নামে হাঁটুভরে নিক্ষেপ করব।’ (সুরা মারিয়াম : ৭০-৭২)
পুলসিরাত অতিক্রম করে অন্য পাড়ে পৌঁছলে পাওয়া যাবে জান্নাতের দরজা। সেখানে প্রিয়নবী (সা.) থাকবেন। তিনি জান্নাতিদের স্বাগত জানাবেন। সব নবীরাই থাকবেন সেখানে। তবে আমাদের নবীজি থাকবেন সবার আগে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি ও আমার উম্মতই সর্বপ্রথম পুলসিরাত অতিক্রম করব। সেদিন নবী-রাসুলরা ছাড়া অন্য কেউ কথা বলতে সাহস করবে না। আর নবী-রাসুলদের দোয়া হবে আল্লাহুম্মা সাল্লিম, সাল্লিম’ হে আল্লাহ! নিরাপদে রাখো, শান্তি দাও।’ (মুসলিম : ১৮২)
পুলসিরাত হবে চুলের চেয়ে চিকন। তরবারির চেয়ে অধিক ধারালো। কঠিন অন্ধকারময়। এর নিচে গভীরে জাহান্নামও অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে। এ পুলের ওপরে আংটা লাগানো থাকবে। নিচে থাকবে কাঁটা যাতে পা দুটোকে ক্ষতবিক্ষত করে দেবে। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘পুলসিরাত চুলের চেয়ে সরু এবং তরবারির ধার অপেক্ষা তীক্ষèতর হবে।’ (মুসলিম : ১৮৩)
পুলসিরাত হলো পিচ্ছিল জিনিস, যার ওপর বাবলা গাছের কাঁটার মতো কাঁটা রয়েছে। ওর দুই ধারে ফেরেশতাদের সারি থাকবে, যাদের হাতে জাহান্নামের আংকুশ থাকবে।
ওটা দিয়ে ধরে ধরে তারা লোকদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! পুলসিরাত কী? তিনি বললেন, তা মারাত্মক পিচ্ছিল জায়গা, যার ওপর লোহার আংটা থাকবে এবং বড় ও বাঁকা কাঁটা থাকবে, যা দেখতে নজদ এলাকার সাদান গাছের কাঁটার মতো।’ (মুসলিম : ১৮৩)
সবাইকে পুলসিরাত পার হতে হবে। তবে পার হওয়ার গতি হবে একেকজনের একেক রকম। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘সবাইকে পুলসিরাত অতিক্রম করতে হবে। এটিই হচ্ছে আগুনের পাশে দাঁড়ানো। কিছু লোক বিদ্যুৎ গতিতে পার হয়ে যাবে, কেউ পার হবে বায়ুর গতিতে, কেউ দ্রুতগামী উটের গতিতে এবং কেউ দ্রুতগামী মানুষের চলার গতিতে পার হয়ে যাবে। সবশেষে যে মুসলমান ওটা অতিক্রম করবে সে হবে ওই ব্যক্তি যার শুধু পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির ওপর নূর (আলো) থাকবে। সে পড়ে উঠে পার হয়ে যাবে (তাফসিরে ইবনে আবি হাতেম সূত্রে তাফসিরে ইবনে কাসির : ৫/২৫৪)। বলা যায়, আমল অনুযায়ী পুলসিরাত পারাপারের কষ্ট অনুভব হবে। ঈমানহীনতা এবং বদ আমলের কারণে তাদের পা পিছলে গিয়ে জাহান্নামের গর্তে গিয়ে পড়বে। তাদের আর্তচিৎকারে সেখানে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।
তবে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের জন্য তার অতিক্রম হবে অনেক দ্রুতগতি ও সহজে। পুলসিরাত অতিক্রমের বিষয়টি তারা টেরই পাবে না। হজরত খালেদ ইবনে মাদান (রা.) বলেন, জান্নাতিরা জান্নাতে পৌঁছে যাওয়ার পর বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো ওয়াদা করেছিলেন যে, সবাইকে জাহান্নাম অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু আমরা তো তা অতিক্রম করলাম না। উত্তরে তাদের বলা হবে, তোমরা ওটা অতিক্রম করেই এসেছ। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা
ওই সময় আগুনকে ঠান্ডা করে দিয়েছিলেন।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)
পুলসিরাত পাড়ি দেওয়ার সময় সবাইকে আমল অনুপাতে বিশেষ আলো দেওয়া হবে। সবাই যার যার আলো অনুপাতে পার হতে পারবে এ অন্ধকারময় সেতু। নবী (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন ও মুনাফিক সবাইকে একটি করে নূর ও আলো দেওয়া হবে। সবাই যার যার আলো দিয়ে পুলসিরাত পার হবে।’ (মুসলিম)
পুলসিরাতের বিভীষিকাময় পথ পাড়ি দেওয়ার কঠিন সময়ে সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। কেউ কাউকে স্মরণ করবে না। মানুষ নিজ চোখে মা-বাবাকে দেখবে; কিন্তু তাদের জন্য কোনো ফিকির করবে না। সেখানে তো একটাই ফিকির থাকবে কীভাবে নিজে পার হওয়া যায়! হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘একদিন তিনি জাহান্নামের কথা স্মরণ করে কেঁদে ফেললেন। তখন রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কাঁদছ কেন? তিনি বললেন, দোজখের আগুনের কথা স্মরণ হয়েছে তাই কাঁদছি। কেয়ামতের দিন আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে স্মরণ করবেন কি? জবাবে রাসুল (সা.) বললেন, হে আয়েশা, জেনে রাখো, তিনটি জায়গা এমন হবে যেখানে কেউ কাউকে স্মরণ করবে না ১. মিজানের কাছে যতক্ষণ না সে জেনে নেবে যে, তার আমলের পাল্লা ভারী রয়েছে নাকি হালকা? ২. আমলনামা পাওয়ার সময় যখন তাকে বলা হবে, আরে অমুক! এই নাও তোমার আমলনামা এবং তা পড়ে দেখো। যে পর্যন্ত না সে জেনে নেবে যে, তা তাকে ডান হাতে দেওয়া হয়েছে নাকি পেছন থেকে বাম হাতে দেওয়া হয়েছে? এবং ৩. পুলসিরাত যখন তা জাহান্নামের ওপর স্থাপন করা হবে।’ (আবু দাউদ : ৪৭৫৫)
পুলসিরাত হবে অনেক দীর্ঘ সময়ের রাস্তা। ১৫ হাজার বছরের রাস্তার কথা পাওয়া যায়। হজরত ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) বলেন, পুলসিরাতের ভ্রমণ হবে ১৫ হাজার বছরের। পাঁচ হাজার বছর পুলে উঠতে, পাঁচ হাজার বছর নিচে নামতে আর পাঁচ হাজার বছর হলো চলতে (আল বুদুরুস সাফেরা, পৃষ্ঠা : ৩৩৪)। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে পুলসিরাত দ্রুতগতিতে পার হওয়ার তওফিক দান করুন।
এমএসএম / এমএসএম
পরকালের বিভীষিকাময় পথ ‘পুলসিরাত’
নবীজির মেরাজের সফর আমাদের শিক্ষা
সম্পদ খরচে হিসাব প্রয়োজন
ভ্রমণে সত্যের সন্ধান
পরশ্রীকাতরতা মানুষের যে ক্ষতি করে
অসুস্থতার বিনিময়ে পাপ থেকে মুক্তি
অব্যাহত আমলে সমৃদ্ধ জীবন
ধনীরা যে সত্যগুলো গোপন রাখতে চায়ঃ শায়খ মু. নুমান রিডার
শীতার্তদের পাশে দাঁড়ান
জুলুমের পরিণাম নিজের ওপরই ফিরে আসে
জুমার নামাজ কতক্ষণ পর্যন্ত দেরি করে পড়া যায়?
নতুন বছর শোভিত হোক পুণ্যে