অসুস্থতার বিনিময়ে পাপ থেকে মুক্তি
পৃথিবীতে মানুষকে রোগব্যাধি, সুখ-সুস্থতা ইত্যাদি বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন করে পরীক্ষা করা হয়। রোগব্যাধি, মহামারি, দুর্যোগ- এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। আল্লাহ এসব রোগব্যাধি দিয়ে ঈমানদারদের গুনাহ মাফ করেন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। আল্লাহর হুকুমে অনেক নবী-রাসুল ও সাহাবায়ে কেরামও অসুস্থ হয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামকেও মহামারির মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। মূলত মুমিনদের রোগব্যাধি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা ও গুনাহর কাফফারা হিসেবে গণ্য হয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের যে কষ্টই হোক না কেন; এমনকি তার শরীরে যদি কোনো কাঁটা বিঁধে বা সে কোনো বিপদে পতিত হয়, সবকিছুই তার গুনাহর কাফফারা হয়’ (তিরমিজি : ৩০৩৮)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান পুরুষ বা নারীর জ্বর বা মাথাব্যথা হলে এর মাধ্যমে তার গুনাহগুলো এমনভাবে ঝরে পড়ে যে, সরিষা দানা পরিমাণও বাকি থাকে না, যদিও তার গুনাহ উহুদ পাহাড় পরিমাণ হয়।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ : ৩/২৯)
রোগব্যাধি আল্লাহর পক্ষ থেকে : বিপদ-মসিবত ও রোগব্যাধি দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। সুস্থতা-অসুস্থতার মালিকও তিনি। কোনো ব্যক্তি বা বস্তু কাউকে রোগাক্রান্ত করতে পারে না। সুস্থও করতে পারে না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) ‘ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই’ বললে জনৈক বেদুইন আরব জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! তা হলে সেই উটপালের অবস্থা কী, যা কোনো বালুকাময় প্রান্তরে অবস্থান করে এবং সুস্থ-সবল থাকে? অতঃপর সেখানে কোনো খুজলি-পাঁচড়ায় আক্রান্ত উট এসে পড়ে এবং সবগুলোকে ওই রোগে আক্রান্ত করে ছাড়ে? উত্তরে নবীজি (সা.) বললেন- তা হলে প্রথম উটটিকে কে রোগাক্রান্ত করেছিল? যে মহান আল্লাহ প্রথম উটটিকে রোগাক্রান্ত করেছিলেন, তিনিই তো অন্যান্য উটকে আক্রান্ত করেছেন (মুসলিম : ৫৭৪২)! তবে আল্লাহ কোনো রোগে সংক্রমিত হওয়ার গুণ দিয়ে থাকলে তা সংক্রমিত হবে। তা থেকে নিরাপদে থাকতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘অসুস্থ উটগুলোকে সুস্থ পশুর দলে পাঠিয়ে দেবে না।’ (মুসলিম : ২৮৭৩)
রোগে সওয়াব ও মর্যাদা বৃদ্ধি : রোগের কষ্টে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে মুমিন বান্দার নেকি অর্জিত হয় এবং মহান আল্লাহ রোগীকে এমন মর্যাদা দান করেন, যা সে আমলের মাধ্যমে অর্জন করতে সক্ষম ছিল না। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এমন মর্যাদা নির্ধারিত থাকে, যা সে তার আমলের মাধ্যমে লাভ করতে সক্ষম ছিল না। তখন আল্লাহ তার দেহ, সম্পদ অথবা তার সন্তানকে বিপদগ্রস্ত করেন।
অতঃপর তাকে সেই বিপদে ধৈর্যধারণের সক্ষমতা দান করেন। অবশেষে তাকে সেই মর্যাদায় পৌঁছে দেন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ছিল।’ (মুসনাদ আহমাদ : ২২৩৩৮; আবু দাউদ, হাদিস : ৩০৯০)
জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ : অসুস্থ ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়। ফলে সে আখেরাতে জাহান্নামের আগুন থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারে। একবার আল্লাহর রাসুল (সা.) আবু হুরায়রা (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে একজন জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখতে গেলেন। তিনি রোগীকে বলেন, ‘সুসংবাদ গ্রহণ করো! কেননা মহান আল্লাহ বলেন, এই (রোগ) আমার আগুন, যা আমি দুনিয়াতে আমার মুমিন বান্দার ওপর চাপিয়ে দিই, যাতে আখেরাতের আগুনের পরিপূরক হয়ে যায়।’ (ইবনে মাজাহ : ৩৪৭০)
রোগব্যাধি জান্নাতের উপায় : আল্লাহ রোগব্যাধি দিয়ে মুমিন বান্দাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। বান্দা যদি এই পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হয়, তা হলে দুনিয়ার এই কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ তাকে আখেরাতে সম্মানিত করেন এবং তাকে এত বিশাল পুরস্কার প্রদান করেন যে দুনিয়ার সুস্থ ব্যক্তিরা নিজেদের রোগ না হওয়ার জন্য আক্ষেপ করবে। জাবের (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কেয়ামতের দিন বিপদে পতিত ব্যক্তিদের যখন প্রতিদান দেওয়া হবে, তখন (পৃথিবীর) বিপদমুক্ত মানুষ আফসোস করে বলবে, হায়! দুনিয়াতে যদি কাঁচি দ্বারা তাদের শরীরের চামড়া কেটে টুকরো টুকরো করে দেওয়া হতো!’ (তিরমিজি : ২৪০২)
কবরের শাস্তি থেকে মুক্তি : মহান আল্লাহ মুমিন বান্দাকে এমন কিছু রোগ দিয়ে থাকেন, যে রোগে মৃত্যুবরণকারী বান্দাকে কবরের আজাব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। সুলাইমান ইবনে সুরাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পেটের অসুখ যাকে হত্যা করেছে, তাকে কবরের শাস্তি দেওয়া হবে না।’ (তিরমিজি : ১০৬৪)
শহিদের মর্যাদা লাভ : কিছু রোগব্যাধি আছে যারা সেই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে তারা শহিদের মর্যাদা লাভ করতে পারে। রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর রাস্তায় নিহত ব্যক্তি ছাড়াও আরও সাতজন ‘শহিদ’ আছেন। তারা হলেন- মহামারিতে মৃত (মুমিন) ব্যক্তি, পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি, ‘জাতুল জাম্ব’ (নানা ধরনের পেটের রোগ, যেমন গর্ভে সন্তান মরে যাওয়া ইত্যাদি) নামক কঠিন রোগে মৃত ব্যক্তি, (কলেরা, ডায়রিয়া বা অনুরূপ) পেটের পীড়ায় মৃত ব্যক্তি, আগুনে পুড়ে মৃত ব্যক্তি, দেয়াল ধসে চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মারা যাওয়া নারী (আবু দাউদ : ৩১১১)।
রোগব্যাধি সারা বছরের স্বাভাবিক বিষয়। তবে কিছু সময় রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। বন্যা, বৃষ্টি, ঝড়, শীত, গ্রীষ্ম ইত্যাদি বিভিন্ন দুর্যোগে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় ধৈর্যধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। এর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের গুনাহ ক্ষমা করেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। আল্লাহ সঠিক বোঝার তওফিক দিন।
Aminur / Aminur
পরশ্রীকাতরতা মানুষের যে ক্ষতি করে
অসুস্থতার বিনিময়ে পাপ থেকে মুক্তি
অব্যাহত আমলে সমৃদ্ধ জীবন
ধনীরা যে সত্যগুলো গোপন রাখতে চায়ঃ শায়খ মু. নুমান রিডার
শীতার্তদের পাশে দাঁড়ান
জুলুমের পরিণাম নিজের ওপরই ফিরে আসে
জুমার নামাজ কতক্ষণ পর্যন্ত দেরি করে পড়া যায়?
নতুন বছর শোভিত হোক পুণ্যে
মৃত্যুর ঘটনায় জীবিতদের কর্তব্য
তীব্র শীতে মসজিদের পথে : ত্যাগ ও প্রাপ্তি
মাদক থেকে পাপ ও অপরাধের সূচনা
আমানতদার ব্যক্তির মর্যাদা ও পুরস্কার