ঢাকা শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬

ঈদযাত্রা আনন্দময় ও নিরাপদ হোক


লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল photo লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
প্রকাশিত: ১৪-৩-২০২৬ দুপুর ১:১০

পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। পবিত্র রমজানের এক মাস সিয়াম সাধনার পর এই উৎসব ঘিরে মানুষের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের কোনো সীমা থাকে না। ঈদের আনন্দ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ ছুটে যান নিজ নিজ বাড়িতে। রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর থেকে নিজ বাড়িতে ফেরার এই বার্ষিক যাত্রাকেই বলা হয় ঈদযাত্রা। প্রতি বছর ঈদকে সামনে রেখে শুরু হয় মানুষের এই ঘরমুখো স্রোত। কিন্তু আনন্দের এই যাত্রা অনেক সময় দুর্ভোগ, দুর্গতি, যানজট এবং দুর্ঘটনার কারণে বিষাদে পরিণত হয়। তাই ঈদযাত্রা যেন নির্বিঘ্ন, স্বস্তিদায়ক, আনন্দময় ও নিরাপদ হয়, তা নিশ্চিত করতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

ঈদযাত্রা একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীদের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। রাজধানীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কর্মরত মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেন। এই সময়ে পরিবহন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। বাস, ট্রেন ও লঞ্চে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টিকিট সংকট এবং সময়সূচি ভঙ্গের মতো নানা সমস্যাও দেখা দেয়। ফলে ঈদের আনন্দমুখর যাত্রা অনেক সময় হয়ে ওঠে কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষ করে সড়কপথে ঈদযাত্রার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়। অতিরিক্ত যানবাহন, চালকদের বেপরোয়া গতি, দীর্ঘ সময় ড্রাইভিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ে। প্রতি বছর ঈদের আগে ও পরে সড়কে দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং অনেকে আহত হন। একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণই কেড়ে নেয় না, বরং একটি পরিবারকে চিরদিনের জন্য শোকের সাগরে ডুবিয়ে দেয়। তাই ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করতে হলে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
ঈদযাত্রা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), পুলিশ বিভাগ, হাইওয়ে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মহাসড়কগুলোতে যানজট নিরসন, অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ, ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ এবং অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে মহাসড়কে পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন এবং দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নও ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মহাসড়কে চলমান নির্মাণকাজ থাকলে তা দ্রুত শেষ করা বা অন্তত ঈদের সময়ের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা প্রয়োজন। রাস্তার গর্ত মেরামত, সাইনবোর্ড ও ট্রাফিক নির্দেশনা স্পষ্ট করা এবং টোল প্লাজাগুলোতে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। সড়ক ও মহাসড়কের দুপাশের অবৈধ স্থাপনা, দোকানপাট ও ভাসমান বাজার অপসারণ করতে হবে। এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করলে যানজট অনেকাংশে কমে আসবে এবং যাত্রীরা স্বস্তি নিয়ে ভ্রমণ করতে পারবেন।
রেলপথে যাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল যাত্রা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের সময় বাংলাদেশ রেলওয়ের ওপর যাত্রীদের চাপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তাই ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো, সময়সূচি ঠিক রাখা এবং টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনলাইন টিকিট ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে যাতে কালোবাজারি বা দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমে। ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে।

নৌপথেও ঈদযাত্রায় বিপুল সংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ লঞ্চ ও ফেরির মাধ্যমে যাতায়াত করেন। এ ক্ষেত্রে নৌযানগুলোর ফিটনেস নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন বন্ধ করা এবং আবহাওয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীপথে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত তদারকি চালাতে হবে।

পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদেরও ঈদযাত্রা নিরাপদ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। চালকদের দায়িত্বশীল হতে হবে এবং বেপরোয়া গতি পরিহার করতে হবে। দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পরিবহন মালিকদের উচিত চালকদের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি না করা এবং যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা।

যাত্রীদের সচেতনতারও বিকল্প নেই। অনেক সময় যাত্রীরাই অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনে ওঠেন। বাসের ছাদে ওঠা, ট্রেনের দরজায় ঝুলে থাকা বা লঞ্চে অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে যাত্রা করা জীবনহানির কারণ হতে পারে। তাই যাত্রীদেরও নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে হলে সবারই দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ঈদযাত্রার সময় সড়কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। তারা যাত্রীদের সচেতন করতে, ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানাতে এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সড়ক চাইসহ (নিসচা) বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে আসছে এবং তাদের এই প্রচেষ্টা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

গণমাধ্যমও ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। টেলিভিশন, পত্রিকা এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো নিয়মিতভাবে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রতিবেদন প্রচার করতে পারে। দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করলে মানুষ সচেতন হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে উৎসাহিত হবে।

ঈদযাত্রা শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িত একটি বিষয়। সারা বছর পরিবার থেকে দূরে থাকা মানুষগুলো ঈদের সময় প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যেতে চান। এই যাত্রা যদি কষ্টকর বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে ঈদের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। তাই ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমেও ঈদযাত্রা সহজ করা সম্ভব। স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল টিকিটিং, রিয়েল-টাইম ট্রাফিক আপডেট এবং সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে যানজট ও দুর্ঘটনা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন, স্বস্তিদায়ক, আনন্দময় ও নিরাপদ করতে হলে সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ যাত্রী সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন, তবে ঈদযাত্রা হবে আনন্দের, ও স্বস্তির। দুর্ঘটনা ও দুর্ভোগমুক্ত নিরাপদ যাত্রাই হতে পারে ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।

পবিত্র ঈদ আমাদের জন্য শান্তি, সম্প্রীতি ও আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। সেই আনন্দকে পূর্ণতা দিতে হলে ঈদযাত্রাকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করা অত্যন্ত জরুরি। আসুন, আমরা সবাই মিলে সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করি যেখানে প্রতিটি মানুষ নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে নিজের প্রিয়জনের কাছে পৌঁছাতে পারে। সবার ঈদযাত্রা হোক নির্বিঘ্ন, স্বস্তিদায়ক, আনন্দময় ও নিরাপদ। পবিত্র ঈদের সময় প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠুক আনন্দময় ও স্মরণীয়। সবাইকে জানাই অগ্রিম ঈদের শুভেচ্ছা,  ঈদ মোবারক। 

লেখক পরিচিতিঃ
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), কেন্দ্রীয় কমিটি

এমএসএম / এমএসএম

আল-কুরআন বিজ্ঞান ও রমজান

ঈদযাত্রা আনন্দময় ও নিরাপদ হোক

ঈদের প্রহর গুনছে দেশ, পে-স্কেলহীন বাস্তবতায় তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের আনন্দ কতটুকু?

গণতান্ত্রিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ

হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা: ২.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য ঝুঁকিতে, বাংলাদেশের সামনে নতুন সতর্কবার্তা

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব

নতুন সংসদ, নতুন সাংসদ: প্রস্তুতির রাজনীতিতে বিএনপির নতুন অধ্যায়

দক্ষ জাতি গঠনের নতুন দিগন্ত: ১৭ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক জাতীয় প্রশিক্ষণ কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে?

‘ইরান-ইসরাইলের যুদ্ধে আমরা পক্ষভুক্ত নই’- ইরানের হামলা নিয়ে ইউএইর অবস্থান: একটি ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ

ট্যাক্স না বাড়িয়ে ঘুষ কমান, রাজস্ব বাড়বে

ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা, হুমকিতে বিশ্বনিরাপত্তা

ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, পতন অনিবার্য

৬ মাসের সময়সীমা বনাম ৬০ দিনের ধৈর্য: শাসন, সংকট ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন