ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য বাঁশঝাড়


বারহাট্টা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি photo বারহাট্টা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২৩-৭-২০২৬ দুপুর ৩:৬

একসময়ে গ্রামীণ জনপদে বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ের ঐতিহ্য ছিল গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ। গ্রামে কারো বাড়ির পাশে বাঁশঝাড় ছিল না এমনটা কল্পনাও করা যেত না। ‘যেখানে গ্রাম সেখানেই বাঁশঝাড়’- এমনটাই ছিল স্বাভাবিক। অথচ আধুনিকতার ছোঁয়ায় নগরায়নের ফলে সারা দেশের মতো বারহাট্টার প্রকৃতি থেকেও উজাড় হচ্ছে প্রকৃতির দুর্যোগ প্রতিরোধক ও পরিবেশের পরম বন্ধু বাঁশঝাড়। বাঁশের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য বাঁশ ও বেতের কুটির শিল্প। এ শিল্পের সাথে জড়িতরা এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে।

'বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই/মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?' কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী তার 'কাজলা দিদি' কবিতায় বাঁশ বাগানের গ্রামীণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। তেমনি পল্লীকবি বন্দে আলী মিয়া 'আমাদের গ্রাম' কবিতায় বাঁশঝাড়ের চমৎকার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন কবির ভাষায়- 'আম গাছ, জাম গাছ, বাঁশ ঝাড় যেন, মিলে মিশে আছে ওরা আত্মীয় হেনা।' এছাড়া, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বাঁশরি' এবং সুনির্মল বসুর 'বাঁশের বাঁশি' কবিতায় বাঁশের নান্দনিক রূপ ও গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। প্রত্যেকটি গ্রামীণ জনপদে বাঁশ ছিল প্রকৃতির এক অপূর্ব দান। বর্তমানে নির্বিচারে বাঁশ কাটা, দেখভাল ও পরিচর্যার অভাবে বাঁশ আজ উজাড় হচ্ছে। প্রকৃতি হারাচ্ছে ভারসাম্য।

সরজমিনে উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও বয়োজ্যেষ্ঠ কয়েকজনের সাথে কথা বললে তারা সকালের সময়কে জানান, একসময়ে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বিশাল এলাকাজুড়ে ছোট-বড় অনেক বাঁশঝাড় ছিল। আমাদের এলাকার গ্রামাঞ্চলে এমন কিছু বাঁশঝাড় ছিল যেগুলোতে বাঁশের ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে, সূর্যের আলো পর্যন্ত অনেক সময় বাঁশঝাড়ের মাটি স্পর্শ করতে পারতো না। ঐসব বাঁশঝাড় বেষ্টিত জঙ্গলে নানা জাতের পশু-পাখিও বাস করতো। যে কারণে দিনের বেলায়ও অনেকে বাঁশঝাড়ের ভেতরে ঢুকতে সাহস পেতেন না। বাঁশের ঘনত্বে ঘন অন্ধকারের জন্য গা ছমছম করে উঠতো। তবে লোকজন জীবনের তাগিদে বন-জঙ্গল ও বাঁশঝাড় কেটে নানান স্থাপনা নির্মাণ করছেন। ফলে এখন আর আগের মতো বাঁশঝাড়ের গাঢ় অন্ধকার চোখে পড়ে না।

তারা আরও বলেন, বাঙালির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাঁশের প্রয়োজন। অতীতে গ্রামাঞ্চলে শিশু জন্ম গ্রহণ করলে কিংবা গাভীর বাচ্চা হলে নাড়ি কাটার জন্য ব্যবহার করা হত কচি বাঁশের ধাঁরালো মাথা। মুসলমান কেউ মারা গেলে কবরের ওপর বাঁশের মাচা করে কিংবা ফাঁটিয়ে বিছিয়ে দেয়া হয়। হিন্দু হলেও মৃত্যুর পর শ্মশানে নেয়া থেকে শুরু করে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাঁশের ব্যবহার করা হয়। আগে আমাদের গ্রামীণ জনপদের বিশাল অংশ জুড়ে ছিল বাঁশঝাড়। এক সময়ে প্রতিটি জমির মালিকদের ঐতিহ্যবাহী সম্পদ ছিল বাঁশঝাড়। আর আজ সেই বাঁশঝাড় প্রায় বিলুপ্তির পথে। বাঁশঝাড়গুলো কেটে বিনাশ করে সেখানে আম, জাম, লিচু, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলের বাগান তৈরী করা হয়েছে। এমন অবহেলা চলতে থাকলে মানুষ মরে যাওয়ার পর কবরে যে বাঁশের চালি দেওয়ার জন্য যে বাঁশ দরকার হয় তাও পাওয়া যাবে কিনা এ অশংকা করছেন তারা।

এ বিষয়ে কথা হয় বাঁশ-বেতের কুটির শিল্পের সাথে জড়িত নিতাই ক্ষত্রিয়, অবনী সিংহ, নিতাই সরকারসহ আরও কয়েকজনের সাথে তারা  বলেন, আগে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র যেমন- কুলা, ডালা, টুপরি, কুড়ি চালুন, তালাই, টোপা, ঝাঁটা হোঁচা, মই, মাছ ধরার খালুই, পলো, দারকি, ধীল, চাঁই, বানা এবং বিভিন্ন সৌখিন খেলনা সামগ্রী নিজেরা বাড়িতে তৈরি করে বারহাট্টা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার বাজারে এনে বিক্রি করেছি, তখন ভাল লাভ হতো। কিন্তু এখন তেমন একটা লাভ হয় না। আগে গ্রমে অনেক বাঁশ পাওয়া যেতো, বাঁশের দামও ছিল কম। অল্প দামে বাঁশ কিনে বাঁশ-বেতের বিভিন্ন জিনিসপত্র বানাতাম। পরে তা হাটে হাটে বিক্রি করতাম। তবে এখন আগের মতো বাঁশ পাওয়া যায় না। আর যা পাওয়া যায় দামও অনেক বেশি। বেশি দামে বাঁশ কিনে জিনিস তৈরি করলে বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। এতে করে ক্রেতারা কিনতে চায় না। রাত-দিন খেটে যা তৈরি করি হাটবাজারে সে তুলনায় বিক্রি নেই। অভাবের তাড়নায় আমাদের গোত্রের অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। উপযুক্ত কাজ এবং অভিজ্ঞতার অভাবে আমরা অন্য পেশায় যেতে পারিনি। তাই কষ্ট করে হলেও এই পেশায় লেগে আছি।

উপজেলা সদরের বাঁশ ব্যবসায়ী করিম মিয়া, জামাল উদ্দিন, বাউসী এলাকার জজ মিয়া, হাফিজ খাঁ জানান, বাঁশঝাড় কমে যাওয়ায় এখন বাঁশ আর সহজলভ্য নয়। এ কারণেই দিনে দিনে বাড়ছে বাঁশের দাম। কিছুদিন আগেও একটি বাঁশের দাম ছিলো ১০০ টাকা। এখন বেড়ে দাড়িয়েছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। একটা বাঁশ বিক্রি করলে সব খরচ বাদ দিয়ে ২০-৫০ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়।

বাউসী অর্দ্ধচন্দ্র উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের (স্কুল ও কলেজ) বাংলা বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক বিজয় চন্দ্র দাস বলেন, আমি গ্রামের ছেলে। একসময় আমার বাড়ির পেছনে বড় বাঁশঝাড় ছিল। আমাদের এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশেই বাঁশঝাড় ছিল। কিন্তু এখন সেই বাঁশঝাড় আর নেই। তবে এখনো অল্প কিছু বাঁশ আছে। তাও হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে নির্বিচারে বাঁশ কাটা, দেখভাল ও পরিচর্যার অভাবে বাঁশঝাড় ক্রমশই কমে যাচ্ছে। উজাড় হচ্ছে প্রকৃতির দুর্যোগ প্রতিরোধক ও পরিবেশের পরম বন্ধু বাঁশঝাড়। কালের বিবর্তনে ও নগরায়নের ফলে বাঁশঝাড় কমে যাওয়ায় হারাতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশে তৈরি কুটির শিল্পও।

কথা হয় বারহট্টা সরকারি কলেজের জীববিজ্ঞান বিষয়ের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র প্রভাষক মজিবুল হকের সাথে তিনি বলেন, বাঁশ ফাঁপা কান্ড বিশিষ্ট একটি ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। বাঁশের বিস্তৃতি অতি ব্যাপক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কম বেশী জন্মায়। বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ রয়েছে, তবে সবচেয়ে পরিচিত ও সাধারণ জাতের বাঁশের বৈজ্ঞানিক নাম- 'Bambusa vulgaris'। এছাড়াও, আমাদের দেশে জনপ্রিয় মুলি বাঁশের বৈজ্ঞানিক নাম- 'Melocanna baccifera' এবং তল্লা বাঁশের বৈজ্ঞানিক নাম- 'Bambusa tulda'। বাঁশ গাছ অন্য যে কোন গাছের তুলনায় দ্রুত গতিতে ক্ষতিকর কার্বন গ্যাস শুষে নিতে সক্ষম এবং এর শিকড় মাটি ক্ষয়ে যাওয়া রোধ করতে পারে। বাঁশ জাতীয় উদ্ভিদ মাটি এবং পানি থেকে ধাতু এবং অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ নিজের শিকড়ের মধ্যে শোষনের মাধ্যমে বিশুদ্ধায়নের বিষয়ে খুব কার্যকরী বলে প্রমাণিত। বিভিন্ন প্রকার ওষুধি কাজে প্রয়োগসহ ‘ব্যামবো ম্যাসেস’ এখন জনপ্রিয় থেরাপি। এছাড়াও বাঁশের শেকড় অবিশ্বাস্য রকম দৃঢ় যা মাটির ক্ষয়রোধে ভূমিকা রাখে এবং এর পাতা পড়ার পর তা মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে মাটিকে পুনরুজ্জীবিত করে। বাঁশের শেকড় মাটির নিচে অনেকদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। কোনো ক্ষেত্রে ১০০ মিটার পর্যন্তও যায়। ফলে একজনের বাঁশঝাড়ের শেকড় তার প্রতিবেশীর সীমানার মধ্যেও ঢুকে পড়তে পারে। প্রকৃতি ও জীবন রক্ষায় বাঁশ চাষ, তার সম্প্রসারণ ও বিকাশের জন্য গড়ে তুলতে হবে বাঁশ নার্সারি। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উন্নতমানের দ্রুত বর্ধনশীল বাঁশের আবাদ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে বাঁশের সবুজ বেস্টনি যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। রক্ষা পেতে পারে আমাদের জীববৈচিত্র।

বারহাট্টা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক জানান, একসময়ে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের গৃহস্থালীর ব্যবহারের জিনিসপত্রের মধ্যে বাঁশই ছিল প্রধান। গ্রামের প্রায় শতকরা ৫০ জন মানুষই বাঁশের বাড়িঘর নির্মাণ করে থাকতেন। বিশেষ করে ঘরের খুঁটি, বেড়া ইত্যাদি তৈরি হতো বাঁশ থেকে।। বাঁশের ঘর আরামদায়ক ও ভূমিকম্পরোধক। বাঁশের ঘর তৈরিতে খরচও অনেক কম।

তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও বেশ বড় বড় বাঁশঝাড় চোখে পড়তো। তবে সময়ের স্রোতে তা হারিয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ বাঁশগাছ কেটে সেই জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করছেন। তাছাড়া আগের মতো বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রও মানুষ তেমন একটা ব্যবহার করেন না। সবমিলিয়ে দিন দিন বাঁশঝাড় হারিয়ে যাচ্ছে। বাঁশগাছ রক্ষায় সবার এগিয়ে আসতে হবে।

এমএসএম / এমএসএম

তারাগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড বিষয়ে অবহিতকরণ ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

অগ্রণী ব্যাংকে চুরির চেষ্টা ব্যর্থ, আনসারের অভিযানে আটক ১

জাল ওয়ারিশানে সম্পত্তি দখল চেষ্টার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

গোদাগাড়ীতে কৃষিজমিতে মুরগির বিষ্ঠা ফেলার অভিযোগে নাবা পোল্ট্রি ফার্মকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা

নাগরপুরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে জখম প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ

পাবনায় আকিফ আনাস ডেইরিকে নিরাপদ খাদ্য আইনে তিন লাখ টাকা জরিমানা

মধুখালীতে বাইসাইকেল ও সেলাই মেশিন বিতরণ করলেন সংসদ সদস্য ড. মো. ইলিয়াস মোল্লা

শরণখোলায় বেসরকারি হাসপাতালের ওয়াশরুম থেকে নার্সের মরদেহ উদ্ধার

চাঁবিপ্রবির নতুন ভিসি অধ্যাপক ড. এম আতিকুর রহমান

সাব-রেজি: অফিসে দলিল লেখকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ

সাতক্ষীরায় প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তিমূলক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গণমাধ্যমের শীর্ষক কর্মশালা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পেশাজীবী দলের সভাপতি সেলিম রেজা, সম্পাদক মনির

টুঙ্গিপাড়ায় ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু