ঢাকা বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থান : ১৯ শহীদের রক্তে ইতিহাস গড়েছিল নরসিংদী


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৫-৮-২০২৬ দুপুর ১২:৩৫

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সেই আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়গুলোর একটি রচিত হয় নরসিংদীতে। গুলি, সংঘর্ষ, কারফিউ, জেলা কারাগারে হামলা, প্রাণহানি এবং শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের ঘটনাপ্রবাহে জেলাটি হয়ে ওঠে গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দুই বছর পরও সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের স্মৃতি যেমন অমলিন, তেমনি নিহতদের স্বজনদের প্রধান প্রত্যাশা—প্রকৃত দায়ীদের বিচার।

নরসিংদী জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে জেলায় ১৯ জন নিহত এবং অন্তত ৫০৭ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষার্থী, তরুণ, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ।

১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে নরসিংদীতে প্রথম মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি কলেজ, আইডিয়াল কলেজসহ জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন।

১০ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের স্থিতাবস্থা আদেশের পরও আন্দোলন থামেনি। শিক্ষার্থীরা শহরের প্রধান সড়কে অবস্থান নিয়ে কর্মসূচি চালিয়ে যান। ১৪ ও ১৫ জুলাই সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশের মধ্য দিয়ে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।

আন্দোলনের মোড় ঘোরানো দিন ১৮ জুলাই ছিল নরসিংদীর আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন। জেলখানা মোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে রাবার বুলেটের আঘাতে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহমিদ ভূঁইয়া তামিম (১৫)। তিনি কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শিক্ষার্থী ছিলেন।

এদিনই গুলিতে নিহত হন মো. ইমন মিয়া (২২), শিবপুরের সরকারি শহীদ আসাদ কলেজের শিক্ষার্থী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তাহমিদের মরদেহ স্ট্রেচারে রেখে আন্দোলনকারীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় আবারও গুলি ছোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ১৯ জুলাই সকালে জেলখানা মোড়ে ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পরে বিক্ষোভকারীরা নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা চালান। অগ্নিসংযোগ ও বন্দি পালানোর ঘটনায় সারা দেশে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।

জেলা কারাগার থেকে মোট ৮২৬ জন বন্দি পালিয়ে যান, যার মধ্যে ৯ জন জঙ্গি ছিলেন। পরবর্তীতে বেশিরভাগ বন্দি আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তার হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এখনও পলাতক। এদিন শহরের ভেলানগর, জেলখানা মোড়, ইটাখোলা ও মাধবদীতে গুলিতে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ নিহত হন।

নিহতরা হলেন- আমজাদ হোসেন (২২), মো. শিয়াম (১৮), হৃদয় মীর (১৮), সুজন মিয়া (১৭), শাওন আহমেদ (১৮), আশিকুল ইসলাম রাব্বি (২০), মো. নাহিদ মিয়া (২০), আলী হোসেন (৪৫), হাসান মিয়া (৪৫) ও মো. কামাল মিয়া (৩৯)।

নিহতদের মধ্যে অন্তত বেশির ভাগের বয়স ছিল মাত্র ১৫ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। কেউ ছিলেন স্কুল বা কলেজ শিক্ষার্থী, কেউ রিকশাচালক, ঝালমুড়ি বিক্রেতা, দিনমজুর কিংবা শ্রমিক। অনেক পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যও প্রাণ হারান।

১৮ জুলাই জেলখানা মোড়ে গুলিবিদ্ধ আজিজুল মিয়া (২৬) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুলাই মারা যান, মো. মাইন উদ্দিন (২৩) নরসিংদী সদরের ভেলানগরে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মো. মোস্তফা (৩০) ১৯ জুলাই নরসিংদী সদরে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান, মো. সুমন মিয়া (২০) ২০ জুলাই মাধবদী থানার সামনে পিঠে গুলিবিদ্ধ হন, টানা ৩৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৩ আগস্ট রাজধানীর বিএসএমএমইউ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

২০ ও ২১ জুলাই কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলে নরসিংদী শহর কার্যত অচল হয়ে পড়ে। জুলাইয়ের শেষ দিকে আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবি ছাড়িয়ে সরকারবিরোধী এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়। ৪ আগস্ট নরসিংদীতে আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ে। নরসিংদীতে বের হয় বিজয় মিছিল। আনন্দ মিছিলে পুরো জেলায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

জুলাই যুদ্ধের অন্যতম অংশগ্রহণকারী ও ছাত্রনেতা মোহাম্মদ শামিম মিয়া জানান, তাহমিদ মারা যায়। তার লাশ নিয়ে যাওয়ার পথে লাশের ওপর পুলিশ গুলি করে। আমারও চোখে, মুখে ও হাতে গুলি লাগে। দৌড়ে এক পাশে চলে আসি। তাহমিদই নরসিংদীর সর্বপ্রথম শহীদ। আমরা গুলিবিদ্ধ হলেও হাসপাতালে যেতে ভয় পেতাম। কারণ চিকিৎসা নিতে স্লিপ লাগত, আর সেটি পুলিশের হাতে গেলে খোঁজখবর নিয়ে বাসায় চলে আসবে এই ভয়ে চিকিৎসাও নিতাম না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয় হয়েছে। দেশ স্বাধীন করতে পেরেছি।

নরসিংদী জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম সদস্য সচিব আলম মিয়া বলেন, জুলাই-আগস্ট আমাদের জন্য সহজ ছিল না। চোখের সামনে গোলাগুলি হয়েছে, মানুষ মরেছে, আহত হয়েছে। বাসায় থাকতে পারিনি। পুলিশ আন্দোলন করতে দেয়নি। পুলিশকে মোকাবিলা করতে ইট-পাটকেল হাতে নিয়েছি। আমরা জয় পেয়েছি। ফ্যাসিস্টকে বিতাড়িত করতে পেরেছি।

শহীদ তাহমিদের বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, তাহমিদ যেন বাংলার ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকে, এটাই শুধু আমরা চাই। প্রকৃত হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক এটাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি। এটা শুধু আমার দাবি নয়, সকল শহীদ পরিবারের দাবি।

মামলার ব্যাপারে নরসিংদী পুলিশ সুপার কার্যালয়ে গেলে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার যোগাযোগ করে ফোন রিসিভ হলেও নরসিংদী পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ্-আল-ফারুকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আজ বিজয়ের দুই বছর পূর্ণ হলেও অনেক শহীদ পরিবার এখনও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। অনেক বাবা-মা আজও তাদের হারানো সন্তানের শোকে অশ্রু ঝরাচ্ছেন। সময় পেরিয়ে গেলেও সেই শূন্যতা আর কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তারা আর কোনো দিন ফিরে পাবেন না তাদের সন্তানকে। তাই তাদের একটাই প্রত্যাশা- প্রকৃত হত্যাকারীদের বিচার হোক। কিন্তু সেই বিচার আদৌ হবে কি না, এই অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষা নিয়েই দিন কাটছে অনেক শহীদ পরিবারের।

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলনে ১৯ প্রাণহানি ও ৫০৭ জন আহত হওয়ার ঘটনায় নরসিংদী বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও রক্তাক্ত অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে আছে।

এমএসএম / এমএসএম

বাগেরহাটে গণ অভ্যুত্থান দিবস পালিত

‎কুতুবদিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা

Bangla QR ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে নরসিংদীতে সোনালী ব্যাংকের বর্ণাঢ্য র‌্যালি

জুলাই শহীদ হৃদয় ও নজরু‌লের লাশের সন্ধান ও শহীদি স্বীকৃতি দাবিতে গাজীপুরের প্রতিকী কফিন মিছিল

গুরুদাসপুরে পাট ধোয়ায় ব্যস্ত কৃষক, বিলাঞ্চলে সোনালী আঁশের সুবাস

পানিতে গেল ধানখেত, আগুনে পুড়ে ছাই দুই দোকান, ১২ লাখ টাকার ক্ষতি

বেনাপোল বন্দরে স্কেল কারসাজি করে রাজস্ব ফাঁকি: জড়িত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা

চাঁদপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষে শিবিরের ‘বিজয়ের দৌড়’

সুবর্ণচরে প্রথমবারের মতো উপজেলা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের লোগো উন্মোচন

সিটি ইউনিভার্সিটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে আলোচনা সভা ও চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত; স্মৃতি পাঠাগার গড়ার ঘোষণা

বরগুনায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে,পাকা ভবন নির্মাণ

ভারী বৃষ্টি-উজানের ঢলে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপরে

ছুটির আনন্দে ঘরমুখী মানুষের ঢল, গাজীপুরে মহাসড়কে তীব্র চাপ