যে দিনে বদলে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৩৬তম দিন। ৫ আগস্টের সেই সকালটি ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সকাল। আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলন, শত শত প্রাণহানি, কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ, গণগ্রেপ্তার এবং দেশজুড়ে চরম অস্থিরতার পর সেদিন শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। দিন শেষ হওয়ার আগেই বদলে যায় দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা। লাখো ছাত্র-জনতার ঢল, রাজপথে জনসমুদ্র, প্রশাসনিক কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন এবং একের পর এক নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় দশকের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। দেশ ছাড়েন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
৩৫ জুলাইয়ের সিদ্ধান্তেই তৈরি হয় ৩৬ জুলাইয়ের ইতিহাস
৪ আগস্ট, অর্থাৎ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৩৫তম দিনে সারাদেশে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আকস্মিক সিদ্ধান্তই আন্দোলনের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগত পদক্ষেপ ছিল। আন্দোলনের পরবর্তী গতি নির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সরকার সেদিন সন্ধ্যা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে এবং ৫ আগস্ট থেকে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। তবে এসব পদক্ষেপ আন্দোলনকারীদের রাজধানীমুখী যাত্রা থামাতে পারেনি।
কারফিউ উপেক্ষা করে রাজধানীর পথে
৫ আগস্ট ভোর হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। কেউ বাসে, কেউ ট্রাকে, কেউ মোটরসাইকেলে, আবার অনেকে পায়ে হেঁটে কিংবা নৌপথে রাজধানীর দিকে যাত্রা করেন। অনেক স্থানে যান চলাচল সীমিত থাকলেও বিকল্প পথ ব্যবহার করে আন্দোলনকারীরা এগিয়ে আসেন।
রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা থাকলেও মানুষের ঢল থামানো সম্ভব হয়নি। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী, যাত্রাবাড়ী, আবদুল্লাহপুর, চন্দ্রা ও অন্যান্য প্রবেশমুখ দিয়ে দলে দলে মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করেন।
রাজপথে জনসমুদ্র
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগ, ফার্মগেট, বাংলামোটর, কাকরাইল, প্রেসক্লাব, পল্টন, গুলিস্তান, নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, ধানমন্ডি, বাড্ডা ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ঢল নামে। ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, নারীরা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজপথে মানুষের উপস্থিতি এতটাই ব্যাপক ছিল যে অনেক জায়গায় যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন।
গণভবনের দিকে অগ্রযাত্রা
দুপুরের দিকে আন্দোলনকারীদের বড় একটি অংশ গণভবনের দিকে অগ্রসর হয়। একই সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিলেও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে।
দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা কার্যত আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা
দিনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। এরপরই আওয়ামী লীগের টানা প্রায় দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে।
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। অনেক জায়গায় আনন্দ মিছিল, উল্লাস এবং বিজয় মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা
ক্ষমতার পরিবর্তনের খবরের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি স্থাপনা, রাজনৈতিক কার্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসে। এসব ঘটনা নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি ওঠে।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
সরকার পতনের পর দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিবর্তন দেখা দেয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবী সংগঠন এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।
পরবর্তী দিনগুলোতে রাষ্ট্রপতি, রাজনৈতিক দল, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।
ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়
৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দিন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলন, প্রাণহানি, সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এই দিনেই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। অনেকের কাছে এটি ছিল দীর্ঘদিনের আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি, আবার অনেকে এটিকে বাংলাদেশের গণআন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘মার্চ টু ঢাকা’ ছিল শুধু একটি কর্মসূচি নয়; এটি ছিল আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তি, জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি নির্ধারক পরীক্ষা। কর্মসূচির সময় এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত, সারাদেশ থেকে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার পালাবদলের পথ তৈরি করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহে ৫ আগস্ট তাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণ, যেখান থেকে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়। ইতিহাসের পাতায় ‘জুলাই ৩৬’ চিরকাল স্মরণীয় থাকবে ‘মার্চ টু ঢাকা’ থেকে ক্ষমতার পালাবদলের দিন হিসেবে।
এমএসএম / এমএসএম
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে নাহার একাডেমি হাই স্কুলে আলোচনা সভা, দোয়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা
শাহজালালের কার্গো ভিলেজে আবার আগুন: নিরাপত্তা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
যে দিনে বদলে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস
ব্রিজের নিচে পড়েছিল মাথা ও দুই হাত, সবুজবাগে মিলল নারীর খণ্ডিত মরদেহ
ড্যাবের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জিয়া ও খালেদা জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধাঞ্জলি
বাংলাদেশ কংগ্রেসের ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভা: ১০ দফা প্রস্তাব পেশ
ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা চত্বরে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ, ঢামেকে আহত ৭
উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত, ১৩ দালালের কারাদণ্ড
শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারি বাঙলা কলেজে ডিসিইউর গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামনে মুক্তিযোদ্ধাদের মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামনে মুক্তিযোদ্ধাদের মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান
বাটজার সভাপতি সাফওয়ান, সম্পাদক ইমন