মেগা প্রজেক্টে মেগা দুর্নীতি: যমুনা রেলসেতুর ৩ হাজার কোটি টাকা হাপিশ!
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন গতি আনা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিকে বেগবান করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল যমুনা নদীর ওপর ডাবল লাইনের মেগা রেলসেতু। মেগা প্রকল্পের জমকালো প্রচারণার আড়ালে চলেছে সীমাহীন প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, প্রচলিত আইনকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর প্রবণতা এবং সুপরিকল্পিত আর্থিক হরিলুটের এক অন্ধকার অধ্যায়। চলতি বছরের ১৮ মার্চ সেতুটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকেই একে একে বেরিয়ে আসছে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের নানা নজিরবিহীন তথ্য।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ অডিট শাখা, বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর (ফ্যাপাড) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক গোপনীয় নথি ও বিশেষ আর্থিক পরিদর্শন (এসএফআই) প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রকল্পের শুরু থেকেই স্বচ্ছতার নীতি বিসর্জন দিয়ে একটি অসাধু চক্র গড়ে ওঠে। নদীশাসনে ব্যবহৃত হয়নি এমন স্টিল পাইপের বিপরীতে ভুয়া হিসাব তৈরি, জালিয়াতির মাধ্যমে বিল পরিশোধ এবং কোনো প্রকার ডিটেইল মেজারমেন্ট শিট (ডিএমএস) ও বিল অব কোয়ান্টিটি (বিওকিউ) ছাড়াই আন্তর্জাতিক দরপত্রের শর্ত ভেঙে পছন্দের ঠিকাদারকে কোটি কোটি টাকা পাইয়ে দেওয়ার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। সব মিলিয়ে মেগা প্রকল্পটিতে অনিয়ম, অপচয় ও রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
ফ্যাপাডের ২০২০–২১ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শুধু একটি একক অর্থবছরেই প্রকল্পের অন্তত ৭০৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ব্যয় মারাত্মক অডিট আপত্তির মুখে পড়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং ও সিভিল কনস্ট্রাকশনের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে ডিএমএস ও বিওকিউ পরীক্ষা এবং ভেরিফিকেশন শেষে বিল পরিশোধের নিয়ম থাকলেও, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালকের একক প্রভাবে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ১২৭ কোটি টাকারও বেশি অর্থ তুলে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া, কোনো ধরনের সহায়ক ভাউচার ছাড়াই সিডি-ভ্যাট খাতের অযুহাতে ৩৪ কোটি টাকা বের করে নেওয়া এবং ব্যবহৃত না হওয়া স্টিল পাইপের বিপরীতে কাস্টমস ও ভ্যাটের ভুয়া নথি দেখিয়ে আরও সাড়ে ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে।
প্রকল্প চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর ‘ডিলে ড্যামেজ’ বা বিলম্ব জরিমানা আরোপ করা বাধ্যতামূলক ছিল। তবে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশে সেই জরিমানা মওকুফ করায় রাষ্ট্র নিশ্চিত ৯৯ কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়। পাশাপাশি ভ্যাট ও আয়কর কর্তন না করে অতিরিক্ত বিল ছাড় করায় ঠিকাদারকে প্রায় ৩৪ কোটি টাকার সম্ভাব্য কর ফাঁকির সুবিধা করে দেওয়ার বিষয়টিও অডিট নথিতে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও ব্যাপক কারসাজির তথ্য মিলছে। অডিট প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, জাপানি মুদ্রা 'ইয়েন'-এর হিসাবকে পুঁজি করে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের একটি সুনির্দিষ্ট ছক তৈরি করা হয়। প্রকল্পের 'মোবিলাইজেশন ও ডিমোবিলাইজেশন' (যন্ত্রপাতি ও জনবল আনা-নেওয়া) খাতে অস্বাভাবিকভাবে প্রায় ৪ হাজার ১৫২ কোটি টাকার সমপরিমাণ ইয়েন ব্যয় দেখানো হয়েছে, যা অডিট অধিদপ্তর থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
পরবর্তী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বিশেষ ফিন্যান্সিয়াল ইন্সপেকশন (এসএফআই) প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। জাইকার ঋণচুক্তি অনুযায়ী উন্নত দেশের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, তা অমান্য করে চুক্তিবহির্ভূত তৃতীয় দেশ থেকে নিন্মমানের মালামাল এনে ঠিকাদারকে ৪০৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এমনকি জাতীয় কাস্টমস হাউসের বাধ্যতামূলক ই-পদ্ধতি এড়িয়ে সন্দেহজনক প্রক্রিয়ায় সিডি-ভ্যাট বাবদ আরও ৪৩০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। দরপত্রের প্রাথমিক বাজেটেও কৃত্রিম স্ফীতি ঘটিয়ে অতিরিক্ত ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা গচ্ছা দেওয়ানো হয়। একই সঙ্গে সরকারি শিডিউলের বাইরে ক্যাফেটেরিয়া ও আবাসন নির্মাণের নামে ১১৩ কোটি টাকা এবং অবৈধ 'মূল্য সমন্বয়'-এর অযুহাতে ঠিকাদারের পকেটে অতিরিক্ত ২৫০ কোটি টাকা ঢালা হয়।
অডিট রিপোর্ট ও নথিপত্রের সমস্ত সূত্রে দুর্নীতির ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে যার নাম বারবার উঠে এসেছে, তিনি হলেন প্রকল্পের তৎকালীন পরিচালক ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান। মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীরা যেসব ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত দর কমানো কিংবা পরিমাপ পুনঃযাচাইয়ের লিখিত সুপারিশ দিয়েছিলেন, প্রকল্প পরিচালক মাসুদুর রহমান স্বহস্তে বিতর্কিত নোট লিখে সেসব সুপারিশ বাতিল করেন। "কাজের গতি অব্যাহত রাখা জরুরি" বা "দর কমালে মান ক্ষুণ্ণ হবে"-এ জাতীয় অজুহাতে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মতো বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়। এমনকি আন্তর্জাতিক দরপত্রের শর্ত পূরণে ব্যর্থ 'নন-রেসপনসিভ' বিডারকেও যোগ্য বানিয়ে শত শত কোটি টাকার কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা হওয়া নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মাসুদুর রহমানের এ ধরনের বিতর্কিত ভূমিকা কেবল যমুনা রেলসেতুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর আগে ঢাকা-টঙ্গী ডুয়াল গেজ লাইন সম্প্রসারণ এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকাকালেও তিনি কাজের ভেরিয়েশন অর্ডার অনুমোদন ও সময় বাড়ানোর অযুহাতে কমিশন বাণিজ্যের একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছিলেন। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের টপকে প্রশাসনিক দাপটে তিনি রেলওয়ের অন্যতম শীর্ষ পদ বাগিয়ে নেন। বর্তমানে তার ও তার পরিবারের নামে কক্সবাজারে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি, ঢাকায় মূল্যবান প্লট এবং একাধিক ব্যাংকে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ আমানতের সন্ধান মিলেছে।
এসব গুরুতর অনিয়ম ও অডিট আপত্তির বিষয়ে মতামত জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। কোনো ধরনের দাপ্তরিক কৈফিয়ত প্রদান না করে কিংবা নিজের সপক্ষে তথ্য তুলে না ধরে তিনি বিষয়গুলো এড়িয়ে যান এবং একপর্যায়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বর্তমানে এই মেগা আর্থিক অনিয়ম সামনে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়ে প্রকল্পের সমস্ত দরপত্র, মেজারমেন্ট শিট ও অডিট ফাইল তলব করেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাপানি অর্থায়নকারী সংস্থা জাইকা তাদের প্রকল্পের স্বচ্ছতার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ৩ হাজার কোটি টাকার এই জালিয়াতি প্রমাণিত হলে, তা কেবল দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করবে না, বরং ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য মেগা অবকাঠামো প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
এমএসএম / এমএসএম
অপহরণকারী সন্দেহে নারীসহ দুইজনকে পুলিশে দিল স্হানীয়রা
চাঁপাইনবাবগঞ্জে চোরাই মোটরসাইকেলসহ আন্তঃজেলা চোর চক্রের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির ৩ প্রার্থীর মনোনয়ন ফরম জমা
কাপাসিয়ায় শিক্ষার্থীদের ইভটিজিং, বখাটের ৩ মাসের কারাদন্ড দিলেন এসিল্যান্ড
বগুড়ায় ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
কালিহাতীতে চালককে জিম্মি করে মাইক্রোবাস নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, রামদা-রড উদ্ধার
জলাশয়ে প্রাণের জোয়ার, ত্রিশালে ছাড়া হলো মাছের পোনা
কাশবন থেকে রিভলবার ও গুলি উদ্ধার
সাতকানিয়ায় বিদায়ি ইউএনও মাহমুদুল হাসানের মহামারী!
অভাবের সংসারে অসমাপ্ত ঘর, রেহানার পাশে হারুন মোল্লা ফাউন্ডেশন।
গোদাগাড়ীতে সীমান্তবাসীর বিকল্প কর্মসংস্থানে বিজিবির প্রশিক্ষণ, সনদ পেলেন ২০ জন
মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম. এ. খালেক আটক