ইউএনও বায়েজীদের প্রমোদ ও দুর্নীতি: লোহাগাড়ায় দাপ্তরিক শৃঙ্খলার চরম বিপর্যয়!
সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করা, স্বৈরাচারী ক্ষমতার অপব্যবহার, সীমাহীন দুর্নীতির অক্টোপাসে পুরো উপজেলাকে জিম্মি করা এবং চরম নৈতিক স্খলনের এক কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক মোঃ বায়েজীদ-বিন-আখন্দ। দেশে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সূচি সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা নির্ধারণ করা হলেও লোহাগাড়ায় তা স্রেফ তামাশায় পরিণত হয়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি শেষে ১ জুন (সোমবার) থেকে দেশের সব দপ্তর পূর্ণোদ্যমে চালু হলেও এই শীর্ষ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে নিয়মের কোনো বালাই নেই। সরকারি আইনি ও দাপ্তরিক আদেশকে রীতিমতো বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি পুরো সেবা ব্যবস্থাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী নাগরিক এবং লোহাগাড়া ইউএনও কার্যালয়ের কর্মচারীদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংবাদমাধ্যমের একটি বিশেষ অনুসন্ধানী দল লোহাগাড়ায় সরেজমিনে অবস্থান নেয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি দপ্তরগুলোতে ঠিক সকাল ৯টায় কার্যক্রম শুরু করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ইউএনও বায়েজীদ-বিন-আখন্দ অধিকাংশ কার্যদিবসেই সকাল ১১টা বা দুপুর ১২টার আগে কার্যালয়ে পদার্পণ করেন না। একজন শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তার এমন চরম খামখেয়ালিপনা ও দায়িত্বহীনতায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত সেবাপ্রার্থী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
অনুসন্ধানের দিন সকাল থেকেই কার্যালয়ে হাজির হন নুর নাহার বেগম নামের এক মধ্যবয়সী অসহায় নারী। নিজের জরুরি পারিবারিক সমস্যা নিয়ে সকাল ৯টার আগেই তিনি কার্যালয়ের সামনে এসে বসেন। ঘড়ির কাঁটায় বেলা ১১টা পার হলেও দেখা মেলেনি ইউএনওর। দীর্ঘ দুই ঘণ্টারও বেশি সময় তীব্র গরমে অপেক্ষায় থেকে চরম হতাশায় ওই নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদককে কর্মচারীকে ভেবে আকুতি জানান, “বাবা, নির্বাহী কর্মকর্তা স্যারকে কি একটি ডাক দেওয়া যাবে? আমি সকাল থেকে বসে আছি।” সেবাপ্রাপ্তির আশায় একজন সাধারণ নাগরিকের এমন আকুল আকুতি উপস্থিত অন্য নাগরিকদেরও স্তব্ধ করে দেয়।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ইউএনওর অপেশাদার আচরণের কারণে সাধারণ মানুষ সঠিক সময়ে সেবা পাচ্ছেন না। আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, কোনো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বা অপরাধের তথ্য দিতে তাঁর সরকারি নম্বরে কল দেওয়া হলে তিনি কল ধরেন না। সামাজিক বা আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেন না। ফলে জনগণ ও প্রশাসনের মধ্যে একটি সুবিশাল দূরত্বের দেয়াল তৈরি হয়েছে।
তবে বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের খতিয়ান কেবল অফিস ফাঁকিবাজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন এবং মাদক সংশ্লিষ্টতার মতো অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগ তুলেছেন খোদ তাঁর কার্যালয়ে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
নাম প্রকাশ না করার কঠোর শর্তে প্রশাসনের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিশ্চিত করেছেন যে, ইউএনও তাঁর সরকারি বাসভবনকে এক প্রকার প্রমোদশালায় পরিণত করেছেন। সেখানে প্রায়শই গভীর রাত পর্যন্ত গান-বাজনার জমকালো আসর বসে। শুধু তাই নয়, সরকারি বাসভবনের ভেতরেই নিষিদ্ধ মাদক ইয়াবা সেবন এবং নিয়মিত বিদেশি মদের আড্ডা বসে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানের এই পর্যায়ে বায়েজীদের মধ্যরাতের প্রমোদ ভ্রমণের বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করেছেন তাঁর দপ্তরের এক কর্মী ও সরকারি গাড়ির চালক। তাঁরা জানান, প্রতি রাতে লোহাগাড়ার সীমান্তঘেঁষা পার্বত্য জেলা বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় ছোটেন ইউএনও। কোনো দাপ্তরিক অনুমোদন বা সরকারি অভিযান ছাড়াই, গভীর রাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি মূলত পাহাড়ি চোলাই মদ পান করতেই সেখানে যান। বান্দরবানের একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ভিআইপি ভোজনালয়সহ কিছু গোপন আস্তানায় প্রতি রাতেই বসে তাঁর পাহাড়ি মদের আসর। মদ পানের পর মধ্যরাত বা শেষ রাতে তিনি বাসভবনে ফেরেন। নৈশকালীন এই প্রমোদ ভ্রমণ ও অতিরিক্ত মদ্যপানের তীব্র ক্লান্তির কারণেই তিনি দিনভর সরকারি দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত থাকেন এবং দুপুর পর্যন্ত ঘুমান। যার খেসারত দিতে হচ্ছে লোহাগাড়ার সাধারণ জনগণকে। বাসভবনের ভেতরে অবৈধভাবে গান-বাজনার জন্য প্রস্তুত করা গোপন কক্ষে রাতের অন্ধকারে কারা যাতায়াত করেন, সেই সংক্রান্ত বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ভিডিও ও স্থিরচিত্রও এখন সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে।
এদিকে, সরকার নির্ধারিত সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের কড়া আইন লোহাগাড়ায় স্রেফ উপহাসের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইউএনওর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রছায়ায় স্থানীয় বড় বড় বিপণিবিতান এবং যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া কৃত্রিম ঘাসের বাণিজ্যিক খেলার মাঠগুলো গভীর রাত পর্যন্ত আলো জ্বালিয়ে দেদারসে ব্যবসা চালাচ্ছে। এতে চরম বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, অবৈধভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার বিনিময়ে ইউএনওকে দিতে হয় মোটা অঙ্কের অবৈধ মাসোহারা। আর এই অবৈধ অর্থ ও চাঁদাবাজি সংগ্রহের কলকাঠি নাড়েন তাঁর কার্যালয়ের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ ফয়সাল আমির। ফয়সাল আমিরের এই চাঁদাবাজ চক্রের কারণে আইন তার নিজস্ব গতি হারিয়েছে এবং সরকারের বিদ্যুৎ সাশ্রয় নীতি পুরোপুরি ভেস্তে গেছে।অভিযোগ রয়েছে, কোনো অবৈধ বালু উত্তোলন, পাহাড়ি মাটি কাটা, পাহাড় নিধন বা মাদকের আস্তানার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে ইউএনওকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার অনুরোধ করা হলে, সেই তথ্য অভিযানের আগেই অপরাধী চক্রের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে প্রশাসনের গাড়ি পৌঁছানোর আগেই অপরাধীরা সটকে পড়ে। এই তথ্য পাচারের পেছনেও ইউএনও ও তাঁর ঘনিষ্ঠ চক্রের সরাসরি হাত রয়েছে। বায়েজীদ-বিন-আখন্দ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে লোহাগাড়ায় ভূমিদস্যু, অবৈধ দখলদার ও অপরাধীদের দাপট বহুগুণ বেড়েছে, অথচ দৃশ্যমান কোনো বড় অভিযান পরিচালিত হয়নি।
দপ্তরের ক্ষুব্ধ কর্মচারীরা বলেন, “আমরা নিজেদের দরকারে অল্প সময়ের জন্য অফিসের বাইরে গেলে আমাদের সঙ্গে রূঢ় ও অমানবিক দুর্ব্যবহার করা হয়। অথচ স্যার নিজে দিনের পর দিন অফিসে আসেন না। অফিসে এলেও মানুষের ওপর বিরক্তি প্রকাশ করেন ও গালাগাল করেন। আমাদের চাকরি জীবনে এমন স্বেচ্ছাচারী কর্মকর্তা দেখিনি।”
এই নজিরবিহীন নৈরাজ্য নিয়ে ‘সকালের সময়’ পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হলে তড়িঘড়ি করে দুই নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। লোহাগাড়ার নাগরিক সমাজের দাবি, মূল অপরাধী বায়েজীদ-বিন-আখন্দকে আড়াল ও দুর্নীতি ধামাচাপা দিতেই এই বদলির নাটক সাজানো হয়েছে। নাগরিক সমাজ অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ ও বিলাসী কর্মকর্তার অপসারণ এবং উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন।
ইউএনও বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বিরুদ্ধে ওঠা এসব গুরুতর অভিযোগ এবং প্রশাসনিক নৈরাজ্য নিয়ে চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ হোসাইনী বলেন, “সরকারি কর্মকর্তা হয়ে সরকারি নিয়ম অমান্য করা, দাপ্তরিক সময় ফাঁকি দেওয়া এবং সরকারি বাসভবনকে মাদকের আস্তানায় রূপান্তর করা কেবল চাকরির শৃঙ্খলা বিধিমালা (Discipline and Appeal Rules) লঙ্ঘন নয়, এটি ফৌজদারি অপরাধ। সরকারি পদে থেকে চাঁদাবাজি ও মাসোহারা তোলা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের কঠোর শাস্তিমূলক ধারার আওতায় পড়ে। একজন প্রাশাসনিক কর্মকর্তার এমন নৈতিক স্খলন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করে। অবিলম্বে তাঁর বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তসহ ফৌজদারি মামলা ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা আইনত জরুরি।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক মোঃ বায়েজীদ-বিন-আখন্দের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন প্রতিবেদক। একই সঙ্গে তাঁর সরকারি নম্বরে একাধিকবার কল এবং WhatsApp-এ বার্তা পাঠিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। এছাড়া প্রতিবেদক তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ইউএনও বায়েজীদ-বিন-আখন্দের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ শরীফ উদ্দিন বলেন, “সরকারি দপ্তরের নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তাদের অবশ্যই অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে। বিষয়টি আপনাদের কাছ থেকে জানার পর আমাদের নজরে এসেছে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে অফিস করার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, সরকারি আইন ও নির্দেশনা সবাইকে মেনে চলতে হবে। কোনো অভিযান পরিচালনার তথ্য আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
সরকারি বাংলোয় গান-বাজনার আসর বসানো এবং এ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে অভিযোগগুলো জেলা প্রশাসনের নজরে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।
এমএসএম / এমএসএম
অপহরণকারী সন্দেহে নারীসহ দুইজনকে পুলিশে দিল স্হানীয়রা
চাঁপাইনবাবগঞ্জে চোরাই মোটরসাইকেলসহ আন্তঃজেলা চোর চক্রের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির ৩ প্রার্থীর মনোনয়ন ফরম জমা
কাপাসিয়ায় শিক্ষার্থীদের ইভটিজিং, বখাটের ৩ মাসের কারাদন্ড দিলেন এসিল্যান্ড
বগুড়ায় ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
কালিহাতীতে চালককে জিম্মি করে মাইক্রোবাস নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, রামদা-রড উদ্ধার
জলাশয়ে প্রাণের জোয়ার, ত্রিশালে ছাড়া হলো মাছের পোনা
কাশবন থেকে রিভলবার ও গুলি উদ্ধার
সাতকানিয়ায় বিদায়ি ইউএনও মাহমুদুল হাসানের মহামারী!
অভাবের সংসারে অসমাপ্ত ঘর, রেহানার পাশে হারুন মোল্লা ফাউন্ডেশন।
গোদাগাড়ীতে সীমান্তবাসীর বিকল্প কর্মসংস্থানে বিজিবির প্রশিক্ষণ, সনদ পেলেন ২০ জন
মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম. এ. খালেক আটক