সারাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা-নির্যাতন, প্রশাসন নির্বিকার
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, শারীরিক নির্যাতন, প্রাণনাশের হুমকি, পেশাগত কাজে বাধা এবং হয়রানিমূলক মামলার ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বাংলাদেশে। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে যেমন সাংবাদিকদের হামলার শিকার হতে হচ্ছে, তেমনি দুর্নীতি, অনিয়ম, দখলবাজি ও অপরাধের খবর প্রকাশের পরও অনেকে হুমকি ও চাপের মুখে পড়ছেন। এসব ঘটনায় কোথাও মামলা হলেও অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর সারা দেশে ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। তাঁদের মধ্যে ১১৮ জন পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সরাসরি হামলার শিকার হন। অন্তত ২০ জন সাংবাদিক প্রাণনাশের হুমকি পান এবং ১২৩ জনের বিরুদ্ধে সংবাদ বা মতামত প্রকাশের জেরে মামলা হয়। একই বছরে তিন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া আরও চার সাংবাদিকের মরদেহ বিভিন্ন স্থান থেকে রহস্যজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এসব তথ্য দেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির গুরুতর চিত্র তুলে ধরে।
চলতি বছরের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা মিডিয়া ইনিশিয়েটিভ ফর ডেভেলপমেন্টের (এমআইডি) পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ২ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, গত তিন মাসে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১১২টি পৃথক ঘটনায় ১৬২ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ, সাংবাদিকদের ওপর চাপ ও সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর ধারাবাহিকতা রয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক কর্মী, অপরাধী চক্র এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বিভিন্ন ঘটনায় সামনে এসেছে। অবৈধ বালু উত্তোলন, জমি দখল, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা স্থানীয় বিরোধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হামলার শিকার সাংবাদিক থানায় অভিযোগ দিয়েও দ্রুত প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন। তবে প্রতিটি ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির দায় প্রমাণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাংবাদিকদের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর উদ্বেগ প্রকাশের বিষয়টি পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসসহ কয়েকটি সংগঠনের যৌথ বিবৃতিতে শরীয়তপুর, লক্ষ্মীপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে সংবাদ প্রকাশের জেরে হামলা এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সাংবাদিকদের মারধরের অভিযোগও ছিল। এসব ঘটনায় অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু হামলার পর মামলা নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো সাংবাদিক হুমকির কথা জানালে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলার পর দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা করা প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু অভিযোগের পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিককে ভয় দেখানো, হয়রানি করা কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা এবং হামলার অভিযোগ উভয় ক্ষেত্রেই আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় বিচারহীনতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোনো ঘটনায় মামলা হলেও তদন্তের অগ্রগতি, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার শেষ হওয়ার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ না পেলে জনমনে জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে কোনো মামলায় অগ্রগতি হয়নি এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট থানার নথি, তদন্তের অবস্থা এবং আদালতের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ ও প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে প্রতিটি ঘটনা প্রকাশ করাও গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে। স্বাধীন সাংবাদিকতা এই অধিকার চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সাংবাদিকেরা নিরাপদে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে না পারলে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরার সুযোগ সংকুচিত হয়। এর প্রভাব পড়ে নাগরিকের জানার অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ওপরও।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হামলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, হুমকির ঘটনায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসন, পুলিশ, গণমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
সারাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, বিষয়টি আর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা, তদন্তের স্বচ্ছতা এবং বিচার নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের জানার অধিকার রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।
এমএসএম / এমএসএম
চেতনায় নজরুল শীর্ষক আলোচনা ও স্বরলিপি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদের পরিচিতি সভা
অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর, সাধারণ মানুষের পাশে: ডেমরা থানার ওসি তাইফুর রহমান
বেসরকারি হাসপাতালের অনিয়ম প্রকাশের জেরে সম্পাদককে প্রাণনাশের হুমকি ও চাঁদা দাবির অভিযোগ
সারাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা-নির্যাতন, প্রশাসন নির্বিকার
বাড্ডায় ব্যবসায়ী লোকমানকে লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তদের হামলা, এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি
প্লাস্টিক সমিতির নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত ও সভাপতির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে মানববন্ধন
ভুয়া ঠিকানায় নোটিশ পাঠিয়ে ভোক্তা অধিকার ফাউন্ডেশনের নিবন্ধন বাতিলের অভিযোগ
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে নিজ ফ্ল্যাট পড়েছিল যুব মহিলা লীগ নেত্রীর গলা কাটা মরদেহ
যাত্রাবাড়ীতে ৪.৫০ লাখ টাকার ইয়াবাসহ ২ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার
এডিএম স্টার অ্যাওয়ার্ড পেলেন মনিরুজ্জামান অপূর্ব
পূর্ব শত্রুতার জেরে পথরোধ করে ছুরিকাঘাত ও ছিনতাই: ডেমরায় যুবকের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল
ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন ঘিরে আলোচনায় একাধিক নাম