ভ্যাট ফাঁকিতে মশগুল
*সঠিকভাবে আদায় হলে টাকার পরিমান বাড়বে কয়েকগুণ, বাজেট ঘাটতিতে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
কোন রকমে ফাঁকি দিতে পারলেই যেন জিতে গেলেন, চট্টগ্রামে এমনভাবেই ভ্যাট ফাঁকিতে মশগুল রয়েছে ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তা সিন্ডিকেট। কেউ মাসোয়ারা আবার কেউ রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ভ্যাট অফিসের কর্মকর্তাদের বশে এনে প্রতিনিয়ত চালাচ্ছেন এই ফাঁকির মহোৎসব। তবে বড়বড় কোম্পানির কছে কর্মকর্তারা অসহায় বলে দাবি করছেন ভ্যাট অফিসের অনেকেই।
জানা যায় চট্টগ্রামের অধিকাংশ ব্যবসায়ী সঠিক পরিমানে নিয়মিত ভ্যাট পরিশোধ করছেনা। এর মধ্যে একটি শ্রেণি আছে যারা ভ্যাট অফিসের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে মাসিক চুক্তি করে ভ্যাট আদায় করে। সেখানে বিক্রির হিসাবে ভ্যাট আদায় হয়না, হয় মাসিক চুক্তিতে। যেখানে ভ্যাট আসার কথা ১ লাখ সেখানে সরকারকে দেয় ১০ হাজার আর কর্মকর্তাদের ঘুষ বাবদে দেয় ২০/৩০ হাজার টাকা, বাকি টাকাটা আত্মসাৎ করে ব্যবসায়ীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরীর মাঝারি মানের একটি কমিউনিটি সেন্টারের ম্যানেজার জানান, আমাদের প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া ৪০ হাজার, আবার খাবারের জন্য আসে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। প্রতি মাসে এমন কমপক্ষে ২০ টা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। আমরা প্রতিমাসে ভ্যাট প্রদান করি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আর কর্মকর্তাদের জন্য কিছু বখশিশ দিয়ে দিলেই হয়ে যায়। আমার জানামতে প্রায় সবাই এভাইে মাসিক চুক্তিতে ভ্যাট প্রদান করে থাকেন।
ভ্যাট অফিসের সুত্র জানায় কমিউনিটি সেন্টারের ভাড়া এবং খাবারের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য। সেক্ষেত্রে এই কমিউিনিটি সেন্টারে প্রতিমাসে ৯০ লাখ টাকা হিসেবে ভ্যাট দেওয়ার কথা প্রায় ১৩ লাখ টাকা। এরকম একটি ক্লাবেই প্রতিমাসে ১০/১২ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে কর্মকর্তাদের সামান্য লোভের কারনে। অথচ চট্টগ্রাম শহর ও গ্রামে ছোটবড় প্রায় একহাজার কমিউনিটি সেন্টার রয়েছে, যারা এভাবেই ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে সরকারকে ঠকাচ্ছে প্রতিনিয়ত। একইভাবে নগরীর জামালখান এলাকায় একটি রেষ্টুরেন্টে মাসে ৭০ হাজার টাকা ভ্যাট দিয়ে থাকেন, কিন্তু তাদের দৈনিক বিক্রি ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা হিসেবে মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা। সে হিসেবে ৫ শতাংশ হারে মাসে ভ্যাট আসার কথা ৫ লাখ টাকা, একইভাবে লালখান বাজার এলাকার একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর মাসে ৮০/৯০ হাজার টাকা চুক্তিভিত্তিক ভ্যাট দিয়ে থাকেন, কিন্তু তারা দৈনিক ৫ লাখ টাকাও বিক্রি করে থাকেন। একইভাবে ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে চট্টগ্রামের এলিট শ্রেণির আবাসিক হোটেল, খাবার হোটেল, কমিউনিটি সেন্টার, দেশি - বিদেশি মদের দোকান, ক্লাব ও রেস্টুরেন্ট বারসমুহ। এরকম মাসিক চুক্তির ভিত্তিতে ভ্যাট আদায়ের বিষয়টি স্বীকারও করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
সরকারের এই খাত থেকে রাজস্ব আদায়ে আরো সক্রিয় হলে ভ্যাট আদায়ের পরিমান আরো কয়েকগুণ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যা বাজেটের ঘাটতি পুরণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে বলেও মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।
আবার নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভ্যাট অফিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান রাজনৈতিক প্রভাববের কাছে আমরা অসহায়। সঠিক পরিমানে ভ্যাট দাবি করলে আমাদের বিএনপি জামায়াতের লোক বানানো হয়। আর তাদের ভ্যাট ফাঁকিতে সহায়তা করলে আমরা হয়ে যাই তাদের আপনজন। আমরাও মনে করি আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিৎ। রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যেন তার কোন প্রভাব দেখানো না হয়।
আবার কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে বছরের পর বছর কেউ ভ্যাট আদায়ের জন্য কোন রকম যোগাযোগও করেনি, আর তারাও ভ্যাট দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি। ৫/৬ বছর পরে কয়েক কোটি টাকা ভ্যাট দাবি করে বসে। ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি ভ্যাট গোয়েন্দার একটি দল সীতাকুণ্ডে এসি বাজার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়, সেখানে বলা হয়েছিল, এসি বাজার ২০১৪ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত মোট ১২১ কোটি ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ৩৫৭ টাকার পণ্য সরবরাহ করে। তদন্তে দেখা যায় এই সময়ে তাদের প্রকৃত বিক্রয় '১২৬ কোটি ৭৭ লাখ ৯ হাজার ৮৫৮ টাকা। এই বিক্রয় গোপন রাখায় এসি বাজার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ৫৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৭৫ টাকা। অন্যদিকে, লিমিটেড কোম্পানির বিভিন্ন ধরনের ব্যয়ের উপর ভ্যাট প্রযোজ্য হলেও তা যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়নি। এতে ভ্যাট ফাঁকি হয়েছে ৬২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। উভয় ক্ষেত্রে সময়মতো ভ্যাট পরিশোধ না করায় ভ্যাট আইন অনুযায়ী ২% হারে সুদ আরোপ হবে মোট ৮৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। মোট ভ্যাট ফাঁকি হয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা ও সুদসহ ২ কোটি ৩ লাখ টাকা আদায়যোগ্য হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনটি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল।
এছাড়া একই বছরের মে মাসে চিটাগং সিনিয়রস ক্লাবে একটি দলের পরিদর্শনে তল্লাশি ও যাচাই শেষে ৫ বছরে প্রায় আট কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি ধরা পড়ে। এবিষয়েও সেই সময়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট। সেসময় এনবিআরের নির্দেশে একটি ‘নিবারক দল’ গঠন করে চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট। দীর্ঘদিন গোয়েন্দা নজরদারি শেষে ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি নিশ্চিত হয় নিবারক দল। এ বিষয়ে মামলা করে ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারকে প্রতিবেদনও দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে পণ্য বিক্রি ও সেবা সরবরাহের ওপর প্রতিষ্ঠানটির ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক হিসাব করা হয়। এ সময়ে ক্লাবটি প্রায় ২৭ কোটি ৬১ লাখ টাকার সেবা সরবরাহ করেছে। যার প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক প্রায় এক কোটি ৮৪ লাখ টাকা। কিন্তু এরমধ্যে এক কোটি ৭৮ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়নি। মূলত মদ ও সিসা বিক্রির বিপরীতে এই সম্পূরক শুল্ক পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া ওই পাঁচ অর্থবছরে তিন কোটি ৬০ লাখ টাকার ভ্যাটের মধ্যে পরিশোধ করেছে মাত্র ২২ লাখ টাকা। একই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে চিটাগং ক্লাবে অভিযান চালিয়ে পাঁচ বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানান বিগত সময়েও মাসিক চুক্তির ভিত্তিতে ভ্যাট পরিশোধ করেছিল। হঠাৎ করে মাসোয়ারার পরিমান বৃদ্ধি বা এককালিন মোটা অংকের উৎকোচ দাবি করে সংশ্লিষ্ট দফতরের প্রভাবশালী কর্মকর্তা আর সেই দাবি মেটাতে না পারায় চালানো হয় অভিযান। সুত্রটি বলছে চট্টগ্রামে এরকম হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে মাসে নামমত্র ভ্যাট সরকারকে দিয়ে বেশিরভাগ টাকাই ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তারা মিলে আত্মসাৎ করে থাকেন।
এব্যপারে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এস এম নাজের হোছাইন বলেন, ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি যুগযুগ ধরেই চলে আসছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও লোভী শ্রেণির ব্যবসায়ীদের লোভের ফলে এই খাত থেকে সরকার বিপুল পরিমান রাজস্ব হারাচ্ছে। সঠিকভাবে ভ্যাট আদায়ের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে মনিটরিং দরকার বলে আমি মনে করছি। আমরা যে ভ্যাট সরকারকে দিচ্ছি তা রাজস্ব খাতে জমা হচ্ছে কিনা তা দেখার বা জানার ব্যবস্থা করা উচিৎ। আরেকটা বিষয় হচ্ছে প্রায় সময় ব্যবসায়ীরা বলে আমরা ভ্যাট দেই ট্যাক্স দেই কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়ীরা কোন ভ্যাট দেয়না তারা ভ্যাটটা ক্যারি করে মাত্র। ভোক্তা থেকে নিয়ে সরকারের কাছে পৌছে দেওয়া তাদের দায়িত্ব, কিন্তু সেখানেও তারা চুরি করে, গ্রাহক থেকে ১০ হাজার নিলে সরকারকে দেয় এক হাজার বাকিটা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে আত্মসাৎ করে। এব্যপারে সরকার আরো একটু সতর্ক হলে এই খাতের টাকা দিয়েই বাজেট ঘাটতি আরো কমাতে পারবে।
এব্যপারে কথা বলতে কাস্টম এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট এর চট্টগ্রামের দায়িত্বে থাকা কমিশনার সৈয়দ মুশফিকুর রহমানকে মুঠোফোনে কল দিলে প্রথমে কথা বুঝতে পারেননি বলে পরে কল দিতে বললেও, পরে কল এবং ক্ষুদেবার্তা দিয়েও আর কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এমএসএম / এমএসএম
ঠিকাদারের গাফিলতিতে ধ্বসে গেছে মাদ্রাসা ভবন
আত্রাইয়ে সেই কারামুক্ত অসহায় বৃদ্ধা রাহেলার পাশে ইউএনও শেখ মো. আলাউল ইসলাম
আত্রাইয়ে বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থী শেখ রেজাউল ইসলাম রেজুর গণসংযোগে নেতাকর্মীদের ঢল
বেনাপোল বন্দরে শুল্কফাঁকির পার্টসের চালান জব্দ
রাজস্থলীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত
বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম ইমাম উদ্দিনের ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
কুড়িগ্রামে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারনা শুরু
কুমিল্লায় নির্বাচনি প্রচারে মাঠে প্রার্থীরা
রাঙ্গামাটিতে সিএনজির উপর মালবাহী ট্রাক চাপায় এক নারী যাত্রী নিহত
শালিখায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত
মান্দায় গরীবের সম্বল কেড়ে নিলেন- এক ইউপি সদস্য
বাগেরহাটের ফকিরহাটে চুরি করতে এসে গৃহিণীকে হত্যার অভিযোগ