রেলের হাজার একর জমি বেদখল: উদ্ধারে ধীরগতি
আইনি জটিলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কর্মকর্তাদের দূরদর্শিতা ও প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে যুগযুগ ধরে বেদখল হয়ে আছে রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের কয়েক হাজার একর জমি। এসব জমি উদ্ধারে তেমন তৎপরতা নেই সংশ্লিষ্টদের। উদ্ধার অভিযান চলে ধীর গতিতে। মাঝে মাঝে কিছু জমি উদ্ধার করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আবারো বেদখল হয়ে যায়। এসব দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অনবরত দখল বেদখলের খেলায় মেতে রয়েছে ভূমিদস্যু চক্র। কর্মকর্তারা বলছেন, রেলের বেহাত জমি উদ্ধারে আগে দরকার রাজনৈতিক সদ্দিচ্ছা। এটি ছাড়া উদ্ধার কাজে গতি আসবেনা। সরকারের সদ্দিচ্ছা থাকলে জমি উদ্ধার সময়ের ব্যাপারমাত্র। তারপরও হয়তো রেলপথ মন্ত্রণালয়কে মামলা মোকাবেলা করতে হবে। জবর দখলকারীদের বেশিরভাগের সঙ্গেই রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক আছে। এ কারণেই অধিকাংশ সময় দখলমুক্ত করা যায় না। তবে রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও জমি দখলে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। তবে রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের ভূসম্পত্তি শাখার হিসাব অনুযায়ী অবৈধ দখলীয় জমির পরিমাণ ৬১৯ দশমিক ৬৭ একর। আর গত একবছরে উদ্ধারের পরিমাণ ৪ দশমিক ৬৩৫ একর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলখদাররা কেউ কেউ জমিতে অবৈধভাবে বহুতল ভবনও নির্মাণ করেছে। আবার কেউ একতলা ভবন নির্মাণের পর দোতলার কাজ শুরুর অপেক্ষায়। আবার অনেকে বিশাল রেলভূমি দখলে নিয়ে বস্তি তৈরি করে ভাড়ায় লগিয়ত করে জমিদার সেজে বসে আছেন। এসব বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে অপরাধীরা। অবাদে চালাচ্ছে মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম।
রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের অনুমোদন ছাড়া রেলের কোনো জায়গা লিজ দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। কোনো জায়গা বরাদ্দের ক্ষেত্রে আবেদনপত্র পাওয়ার পর সার্বিক যাচাই-বাছাই করে তা এক বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে রেল কর্তৃপক্ষ প্রতিবার এক বছর করে লিজের মেয়াদ বাড়াতে পারে। তবে সম্পত্তি বিভাগের মতামত ছাড়া রেলের অন্য কোনো বিভাগের জমি লিজের অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার নেই। কিন্তু রেলেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে সংস্থাটির বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি বেহাত হয়ে আছে। আবার লিজ নিয়ে রেলের শর্ত ভঙ্গ করে স্থাপনা নির্মাণ বা রেলের প্রয়োজনে লিজ বাতিল করা হলে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করে দখল বজায় রাখেন।
রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের এস্টেট শাখার তথ্য বলছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে মোট জমির পরিমাণ ২৪৪৪০ দশমিক ৯৩ একর। এর মধ্যে অপারেশন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৫০৩১ দশমিক ৩১ একর। অপারেশন কাজের বাইরে জমি আছে ৯৪০৯ দশমিক ৬২ একর। এরমধ্যে লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে ৫৬০৪ দশমিক ৭৯৬৪ একর এবং নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করেছে ৩৬৫ দশমিক ৮৯ একর। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে অবৈধ দখলে আছে ৪৫৫ দশমিক ৫৯ একর ও এবং বেসরকারি ও ব্যক্তির দখলে রয়েছে ২৫২ দশমিক ৫৫২ একর অর্থাৎ মোট অবৈধ দখলে ৭০৮ দশমিক ১৪২ একর। অব্যবহৃত জমির পরিমাণ ৩৫৫১ দশমিক ৩০৮ একর।
জানা যায়, রেলওয়ের পুর্বাঞ্চলের এস্টেট শাখার হিসাব অনুযায়ী ৭০৮ একর জমি অবৈধ দখলে থাকলেও অব্যবহৃত ৩৫৫১ একর জমির বেশিরভাগই অবৈধ দখলদারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া অপারেশন কাজে ব্যবহৃত জমির একটি অংশেও চলে দখলবাজের রাজত্ব। এরমধ্যে রেললাইনের উভয় পাশে ১০ ফুটের মধ্যে অনেক স্থানে গড়ে ওঠেছে দোকানপাট ও বসতি। কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকায়ও অবৈধভাবে গড়ে ওঠেছে হাজার হাজার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও ভাড়া বাসা। আবার অবৈধভাবে ব্যবহার করছে রেলের বিদ্যুৎ ও চোরা লাইনের গ্যাস।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, রেলের বিপুল পরিমান জমি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে ভূমিদস্যুরা। এরমধ্যে চট্টগ্রাম শহরের মতিঝর্ণা এলাকায় রেলওয়ের ২৬ একর জমির ওপর পাহাড় কেটে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন। ওই জমিতে ৮টি পাঁচতলা, ১০টি চারতলা, ১৬টি তিনতলা, ৩২টি দ্বিতল, ৫৫টি একতলা, ৩৫০টি সেমিপাকা, ১০৫০টি কাঁচাঘর, ৪টি পাকা মসজিদ, ৩টি পাকা মাদ্রাসা, ১টি সেমিপাকা মন্দির, ২টি সেমিপাকা বিদ্যালয়, ৫১০ দোকানঘরসহ আনুমানিক ৬ হাজার অবৈধ দখলদার বিদ্যমান রয়েছে। রেলওয়ে স্টেশন-সংলগ্ন আইস ফ্যাক্টরি রোড, কদমতলী, পাহাড়তলী, টাইগার পাস, খুলশী, আমবাগান, আকবর শাহ, ফয়’স লেক, অক্সিজেন, বায়েজীদসহ বিভিন্ন এলাকায় রেলওয়ের মূল্যবান জমি দখলে নিয়ে বহুতল ভবন, মার্কেট ও বসতবাড়ি তৈরি করা হয়েছে। রেলের জমিতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অফিস। দখল থেকে রক্ষা পায়নি রেললাইনের আশপাশের খালি জায়গা, পাহাড়, টিলাও। ঢাকা চট্টগ্রামসহ সারাদেশে রেললাইনের রেললাইনের দুই ধারে দখলের পাশাপাশি মাদকের আখড়া গড়ে তুলেছে বিভিন্ন সিন্ডিকেট। সিআরবি সংলগ্ন তুলাতলি বস্তি ও গোয়াল পাড়ায় রেলের জায়গায় ঘর তৈরি করে ভাড়া দেয়া হয়েছে এসব এলাকায় অবাদে বিক্রি হচ্ছে মাদক, এলাকটি হয়ে ওঠেছে অপরাধের অভয়ারণ্য। এছাড়া নগরের ২ নাম্বার গেইট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, জান আলী হাট স্টেশনের আশেপাশে ব্যাপক হারে বেড়েছে অবৈধ দখলদারের সংখ্যা। কিছুদিন আগে এসব জায়গা থেকে দোকান পাট উচ্ছেদ করা হলেও উচ্ছেদ কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই আবার দখল হয়ে গেছে। রেলওয়ের কয়েকটি পুকুর দখল করে রেখেছে রেল কর্মচারিরা।
অবৈধ দখলে চট্টগ্রামের চেয়ে ঢাকার অবস্থা আরো ভয়াবহ। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ‘ফুলবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন’র জমি দখল করে ভূমিদস্যুরা গড়ে তুলেছে বহুতল ভবন। বর্তমানে স্টেশনটির কোনো চিহ্নই নেই। ভূমিদস্যুরা একটি মামলায় পরাজিত হলে অন্য আরেকটি মামলা দায়ের করে এবং অবৈধভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করে। ৩.৯৭ একর জায়গায় ৫০৭টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। যার মধ্যে ৩২টি বহুতল ভবন আছে। ১০ তলা ভবন ৭টি, ৬টি তলা ভবন ৭টি, ৫ তলা ভবন ৬টি, ৪ তলা ভবন ৫টি, ৩ তলা ভবন ৬টি, ২ তলা ভবন ৩টি, ২টি ৪ তলা মসজিদসহ মোট ৫০৭টি পাকা স্থাপনা রয়েছে বলে রেলওয়ে সুত্র জানায়। এছাড়াও রেললাইনের আশেপাশে গড়ে ওঠেছে বস্তি ঘর।
রেলের বিপুল পরিমান জমি অবৈধ দখলে থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনে তা উদ্ধার না করে বাইরে থেকে জমি কিনছে সংস্থাটি। গাজীপুরের ধীরাশ্রমে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল (আইসিডি) নির্মাণে ২২২ একর জমি অধিগ্রহণ করার প্রকল্পটি রেল মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এই দুই প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ৬ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা।
এদিকে গত বছরের জুলাই মাসে রেলওয়ের জায়গা অবৈধ দখলদারদের তালিকা দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। দেশের বিভিন্ন জেলায় রেলওয়ের কী পরিমাণ জমি অবৈধ দখলে আছে, তা এবং অবৈধ দখলকারীদের তালিকা তৈরি করে ৩০ দিনের মধ্যে দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। রেলওয়ে সচিব ও মহাপরিচালকের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে সুত্র জানায়। মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) এক সম্পূরক আবেদনের শুনানি শেষে ওই আদেশ দেয়া হয়েছিল।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুনরায় দখল ও লোকবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা সুজন চৌধুরী বলেন, ”আমরা আমাদের সাধ্যমত অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে জবরদখল মুক্ত করার চেষ্টা করছি। তবে উদ্ধার হওয়া জমি কোন কাজে ব্যবহার হবে তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে আবারো দখল হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় দখলদারদের উচ্ছেদ করা হলেও সে অপরাধের শাস্তি পাচ্ছেনা। ফলে তার ভেতর সচেতনতা বা ভয় কোনটাই কাজ করছেনা। এমতাবস্থায় উচ্ছেদের পাশাপাশি কঠিন শাস্তির আওতায় আনতে পারলে তারা ২য়বার দখল করার সাহস পেতোনা। সামনের উচ্ছেদ অভিযানে কোন কঠিন শাস্তির খবর পাবো কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদেরও অনেক সিমাবদ্ধতা আছে আমরা চাইলেই আইনের কঠিন ধারাগুলো সবক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারিনা। তবে রেল তথা সরকারি স্বার্থে আমরা আরো কঠোর হবো। দখলদারদের এবার উচ্ছেদের পাশাপাশি আর্থিক দন্ড বা কারাদন্ডও প্রদান করা হবে। ২য়বার দখলের শাস্তি হবে আরো কঠিন।”
এমএসএম / এমএসএম
ঠিকাদারের গাফিলতিতে ধ্বসে গেছে মাদ্রাসা ভবন
আত্রাইয়ে সেই কারামুক্ত অসহায় বৃদ্ধা রাহেলার পাশে ইউএনও শেখ মো. আলাউল ইসলাম
আত্রাইয়ে বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থী শেখ রেজাউল ইসলাম রেজুর গণসংযোগে নেতাকর্মীদের ঢল
বেনাপোল বন্দরে শুল্কফাঁকির পার্টসের চালান জব্দ
রাজস্থলীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত
বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম ইমাম উদ্দিনের ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
কুড়িগ্রামে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারনা শুরু
কুমিল্লায় নির্বাচনি প্রচারে মাঠে প্রার্থীরা
রাঙ্গামাটিতে সিএনজির উপর মালবাহী ট্রাক চাপায় এক নারী যাত্রী নিহত
শালিখায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত
মান্দায় গরীবের সম্বল কেড়ে নিলেন- এক ইউপি সদস্য
বাগেরহাটের ফকিরহাটে চুরি করতে এসে গৃহিণীকে হত্যার অভিযোগ