শিক্ষানুরাগী জননেতা মাদার বখশ এঁর প্রয়াণ স্মরণে শ্রদ্ধা
উত্তরবঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ "রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়" সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার অগ্রনায়ক এবং চলনবিল এলাকাকে আবাদীভূমি করে তোলা প্রকল্পের অন্যতম চিন্তাবিদ ‘মাদার বখশ (১৯০৭--১৯৬৭)’-এর ৫৪-তম প্রয়াণ দিবস স্মরণে এই লেখা। ১৯৬৭ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
চিরকালের অবহেলিত উত্তরবঙ্গের উন্নতির জন্য যাঁরা নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন তাঁদের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অগ্রনায়ক, সাবেক বঙ্গীয় ও পূর্ববঙ্গ আইনসভার সদস্য, বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব মাদার বখশ অন্যতম। রাজশাহী শহরে শিক্ষা-বিস্তারে এমএলএ মাদার বখশের অবদান চিরস্মরণীয়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মাদার বখশ তৎকালীন রাজশাহী জেলা বর্তমান নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার স্থাপনদীঘি গ্রামে এক অস্বচ্ছল কৃষকপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রবেশিকা পরীক্ষার সার্টিফিকেট অনুযায়ী তাঁর জন্ম-সাল ১৯০৫ হলেও প্রকৃত জন্ম-সাল ১৯০৭। পিতা বলিউদ্দিন মণ্ডলের সাংসারিক অবস্থা অস্বচ্ছল হওয়ার কারণে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য মাদার বখশকে অনেক কঠোর সাধনা করতে হয়।
গ্রামের পাঠশালার পাঠচুকিয়ে সিংড়ার চৌগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন মাদার বখশ। ১৯২২ সালে চৌগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। রাজশাহী কলেজ থেকে আইএ এবং বিএ পাস করেন যথাক্রমে ১৯২৪ ও ১৯২৬ সালে। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৮ সালে তিনি ইতিহাসে স্নাতকোত্তর এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯২৯ সালে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি প্রথমে জায়গীর থেকে ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে, কখনো পত্রিকা বিলির কাজ করে পড়াশোনার খরচ চালান। পরে কিছুদিন কলকাতা কারমাইকেল আবাসিক হলে অবস্থান করেন। কারমাইকেল আবাসিক হলে অবস্থানকালে তাঁর রুমমেট ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ এনামুল হক।
কর্মজীবনের প্রথমে মাদার বখশ পোরশা হাই মাদ্রাসা এবং মুর্শিদাবাদের সালার উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে কিছুকাল শিক্ষকতা করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি রাজশাহী জজ আদালতে আাইন পেশার সঙ্গে যুক্ত হন। প্রতিভার গুণে এবং সমাজের অবহেলিত ও নিগৃহীত মানুষকে বিনা-পারিশ্রমিকে আইনি সহযোগিতা করে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রভূত সুনাম অর্জন করেন। চারদিকে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় তিনি রাজশাহী জজ আদালতের তৎকালীন প্রখ্যাত আইনজীবী খান বাহাদুর ইমাদউদ্দীনের সংস্পর্শ লাভ করে তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩৭ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজশাহীতে আগমন এবং তাঁর প্রচেষ্টায় রাজশাহীতে মুসলিম লীগের একটি শক্তিশালী কমিটি গঠিত হয়। শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের পিতা আবদুল হামিদ মিয়া সভাপতি এবং মাদার বখশ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সংগঠনের কাজে নিবেদিত হয়ে অল্পদিনের মধ্যেই নিজেকে একজন দক্ষ সংগঠক ও জননন্দিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। ১৯৪৬ সালে সমগ্র ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাংগা দেখা দিলে রাজশাহী শহরেও এই দাংগার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সে সময় মাদার বখশ সাম্প্রদায়িক দাংগা বন্ধ করতে শহরের সব জায়গায় ছুটে যান। মাদার বখশের সঙ্গে মুসলিম লীগের সভাপতি আবদুল হামিদ, আতাউর রহমান, কংগ্রেসের বিপ্লবীনেতা প্রভাষচন্দ্র লাহিড়ী, অ্যাডভোকেট বীরেন্দ্রনাথ সরকার এবং ছাত্র নেতাদের মধ্যে একরামুল হক, আবুল কাশেম চৌধুরী, মোহাম্মদ সুলতান, গোলাম রহমান প্রমুখ স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাজশাহী শহরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা সম্ভব হয়।
মাদার বখশ ১৯৪৬ সালে আত্রাই, বাগমারা ও মান্দা থানার নির্বাচনী এলাকা থেকে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান সৃষ্টির পরে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ববঙ্গ আইনসভার সদস্য (এমএলএ) ছিলেন তিনি। ভাষা আন্দোলনে মাদার বখশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজশাহী কলেজ ছাত্রসংসদের প্রথম সভায় বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ এবং ছাত্রসংসদের সভাপতি ড. মমতাজ উদ্দিন আহমদ সংসদের কার্যবিবরণীতে তা লিপিবদ্ধ না করায় রাজশাহী কলেজে চরম আন্দোলন শুরু হয়। মিছিল আর হরতাল প্রতিদিনের ঘটনায় পরিণত হয়। মুসলিম লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা এবং সরকার দলীয় লোক হয়েও মাদার বখশ ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর ঢাকায় মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক গুলি বর্ষণের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া না হলে আইন পরিষদের সদস্যপদ ত্যাগ করারও হুমকি প্রদান করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে অনুষ্ঠিত জনসভায় রাজশাহীর ভুবনমোহন পার্কের বক্তৃতামঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন :
“খুনী নূরুল আমিন সরকারের আইন পরিষদের একজন সদস্য হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়াতে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে।-- যদি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া না হয় তবে আমি সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করবো।” তাঁর এই উক্তির কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়।
১৯৫০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মাদার বখশ রাজশাহী পৌরসভার (বর্তমানে রাজশাহী সিটি করপোরেশন) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ২২ জুন ১৯৫৬ পর্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫১ সালে রাজশাহী শহরে তিনিই প্রথম রিকসা চালু করান। উত্তরবঙ্গের প্রতি সরকারের অবহেলা ও বিমাতাসুলভ আচরণ তিনি মেনে নিতে পারেন নি। এ ব্যাপারে তিনি তদানিন্তন সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতেও দ্বিধাবোধ করেন নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় মাদার বখশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এমএলএ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাজশাহী কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ড. আই এইচ জুবেরীর সহায়তায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার একটি খসড়া তৈরি করেন এবং তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আন্দোলন গড়ে তোলেন। সরকারের নিকট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জোর দাবি পেশ করার উদ্দেশ্যে ১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের সমন্বয়ে ৬৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৫১ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন রাজশাহী এসে এ দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেও পরে নানা ষড়যন্ত্রের কারণে তা বাস্তবায়িত হতে বিলম্ব হয়। সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা বানচালের চেষ্টা করতে থাকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি পূরণে সরকারের বৈরী মনোভাব বুঝতে পেরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের লক্ষ্যে গঠিত কমিটি ১৯৫১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাজশাহীর ঈদগাহ ময়দানে উত্তরবঙ্গের মুসলিম লীগ সদস্য এবং এমএলএ-দের সমন্বয়ে এক অধিবেশন আহবান করে। উক্ত অধিবেশনে সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে মাদার বখশ বলেন :
“যদি রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা না হয় তবে উত্তরবঙ্গকে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ বলে দাবি করতে আমরা বাধ্য হব।” তাঁর এ বক্তব্য সুধী মহলে অভূতপূর্ব সাড়া জাগায় এবং সরকারের টনক নড়ে।
অবশেষে মাদার বখশের কর্মপ্রয়াসের মাধ্যমে এবং এতদঅঞ্চলের শিক্ষানুরাগী ও সমাজ সচেতন নেতৃবৃন্দের সহায়তায় তৎকালীন সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ সপ্তম বাজেট অধিবেশনে “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট” পাস হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মাদার বখশের মহৎ চিন্তা, প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা ও নৈপূণ্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই অপরাহ্নে ড. আই এইচ জুবেরী (ড. ইতরাত হোসেন জুবেরী), এমএ, পিএইচডি (এডিন) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে যোগ দেন এবং নব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়কে সংগঠিত করার লক্ষ্যে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।
মাদার বখশের প্রচেষ্টায় ১৯৫৪ সালে রাজশাহী সোবহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে রাজশাহী কোর্ট একাডেমি) স্থাপিত হয়। এছাড়া রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (১৯৪৯ সালে স্থাপিত রাজশাহী মেডিকেল স্কুলটি সরকার কর্তৃক গৃহীত হয় ১৯৫৫ সালে এবং মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত হয় ১৯৫৮ সালে), রাজশাহী মুসলিম হাই স্কুল (১৯৪৭), লক্ষ্মীপুর গার্লস হাই স্কুল (১৯৬০), শাহমখদুম ইনস্টিটিউট, রাজশাহী হোমিও প্যাথিক কলেজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে তাঁর রয়েছে অসামান্য অবদান।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগ চালু হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধে তিনি খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে আইন বিভাগকে গড়ে তুলতে সহায়তা করেন। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী মাদার বখশ ছিলেন একজন সদালাপী এবং রসিক ব্যক্তি। চলনবিল এলাকাকে আবাদীভূমি করে তোলার প্রকল্পেরও তিনি ছিলেন অন্যতম চিন্তাবিদ।
জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ মাদার বখশ ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৬৭ সালের ২০ জানুয়ারি শুক্রবার বিকেল তিনটায় মৃত্যুবরণ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষানুরাগী ব্যক্তির নামে একটি ছাত্রাবাসের নামকরণ “মাদার বখশ হল” করে তাঁর অমর কীর্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। (তথ্যসূত্র : বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস)।
এমএসএম / এমএসএম
রৌমারীতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী মাদক মামলায় গ্রেফতার
পঞ্চগড়ে শিল্প ব্যক্তিদের সাথে স্থানীয় পণ্য ব্র্যান্ডিং এবং বিপণন বিষয়ক কর্মশালা
গোপালগঞ্জকে এগিয়ে নিতে মেধাবী শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে - সাংসদ কে.এম বাবর
ফুলদী নদীর ওপর সেতু নির্মাণে সরকারের আন্তরিকতার কমতি নেই: প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ
ইমুতে প্রেম, মোবাইলে বিয়ে, ভিসা ছাড়াই ভারতে স্বামীর কাছে যেতে গিয়ে শিশুসহ নারী আটক
হোমনায় মাদকের বিরুদ্ধে সংবাদ করায় সাংবাদিকের উপর হামলা
ঈদ সামনে রেখে চান্দাইকোনা পশুর হাটে কঠোর নজরদারি, মাঠে পুলিশ ও র্যাব
মনোহরদীর রামপুরে বালু উত্তোলনের দায়ে দুইজনকে কারাদণ্ড
ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজারহাটে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট, অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ
যশোর-খুলনা মহাসড়কে ত্রিমুখী সংঘর্ষে মা-ছেলেসহ নিহত-৪
জুড়ীর সীমান্তে ৫২ বিজিবির ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত
পটুয়াখালীতে প্রধান শিক্ষকের অবসর প্রস্তুতির কাগজ নিয়ে হাজির হলেন ডিপিইও বিদায় অনুষ্ঠানে