স্বার্থ ফুরালে সবাই পর

মানুষ সামাজিক জীব, তাই প্রতিটি মানুষকেই সমাজ নিয়ে বসবাস করতে হয়। মানুষ কখনোই একা বাস করতে পারে না। আর এই সমাজ গঠনে নানাবিদ প্রয়োজনে মানুষ মানুষের সাথে পরিচিত হয়। একে অপরের সাথে সম্পর্কে জড়ায়। সেই সম্পর্ক হতে পারে, পারিবারিক, সামাজিক, আত্মীয়তা বা বন্ধুত্ব। মানুষের জীবনে সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে, অনেক সময় দেখা যায় যে, কিছু সম্পর্ক শুধুমাত্র স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। যখন সেই স্বার্থ ফুরিয়ে যায়, তখন সেই সম্পর্কও ভেঙে পড়ে। তবে বন্ধুত্ব এমন একটা সম্পর্ক যেখানে কোন স্বার্থ নেই, বা থাকার কথা নয়। যদি সেটি হয় সত্যিকারের বন্ধুত্ব। কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব আজ তেমন একটা নেই। বেশিরভাগই স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। এটাকে আসলে বন্ধুত্ব বলা চলেনা। বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক কেবলই গড়ে উঠে স্বার্থের প্রয়োজনে। ফলে দেখা যায়, স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক স্থায়ী হয় না।
বন্ধু নিয়ে ইংরেজ চলচ্চিত্র অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক এবং সুরকার চার্লি চ্যাপলিন বলেছিলেন, ”আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু হলো আয়না, কারণ আমি যখন কাঁদি তখন সে হাসে না।” কারন সম্ভবত মানুষের মাঝে এমন স্বচ্ছ কোন বন্ধু তিনি খুজে পাননি।
ব্রিটিশ জনপ্রিয় কবি এবং প্রভাবশালী সাহিত্যিক আলফ্রেড টেনিসন বলেছিলেন, “বন্ধুত্ব হলো জীবনের ভালোকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে এবং মন্দকে ভাগ করে দেয়।” কিন্তু বাস্তবতা তার ধারে কাছেও দেখা যায়না। বর্তমানে বন্ধুরা (কথিত) জীবনের ভালো গুনকে কবর দিয়ে মাটির নিচ থেকে হলেও কিছু না কিছু মন্দ বিষয় তুলে আনবে। আবার সেটা হতে পারে মিথ্যা বা কাল্পনিকও।
ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের মতে, ”একজন সত্যিকারের বন্ধু তোমাকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্য করে।” কিন্তু আমাদের সমাজের কতিপয় বন্ধু আপনাকে পিছন দিকে টেনে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করে।
প্রসিদ্ধ গ্রিক ধ্রুপদী নাট্যকার ইউরিপিদিস এর মতে একজন বিশ্বস্ত বন্ধু দশ হাজার আত্মীয়ের সমান।
মানুষের মধ্যে সবচেয়ে আপন সম্পর্ক হচ্ছে বন্ধুত্ব। সেটি যে কারো সাথে গড়ে উঠতে পারে। সেটা পরিবারের সদস্য বলেন আর সমাজের যেকোন ব্যক্তি এমনকি পশু পাখির সাথেও মানুষের বন্ধুত্ব হয়ে থাকে। মা, বাবা, ভাই, বোন ও আত্মীয় স্বজনের সম্পর্কের একটা নির্দিষ্ট গন্ডি থাকলেও বন্ধুত্বের মাঝে কোন সীমা নেই, তার বিস্তৃতি সীমাহীন। আবার প্রতিটি আদর্শ মা বাবাও তার সন্তানের কাছে বন্ধুর মতো। তাই আমি এখানে বন্ধু নিয়ে কিছু অমর বানীর কথা উল্লেখ করেছি। বর্তমান সমাজে এই মধুর সম্পর্কটিও এখন স্বার্থের কাছে নতি স্বীকার করে। যতক্ষণ স্বার্থ থাকে ততক্ষণ সম্পর্ক থাকে আর স্বার্থ ফুরালেই সে শত্রুর ভূকিায় অবতীর্ন হয়।
আবার সমাজের চতুর্দিকে খেয়াল করলেই দেখবেন, ভাইয়ের সাথে ভাই বোনের অমিল, শত্রুতা। কেন জানেন, সেটা স্বার্থের কারণে। ছোটকালে মা যদি আমার চেয়ে আমার বড়ভাইকে বেশি আদর করতো বা তাকে আমার চেয়ে ভালো বলতো তখন কান্না করতাম, যাতে আমাকে বেশি ভালোবাসে। আর যদি আমাকে বেশি ভালো না বাসত তাহলে মায়ের থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিতাম। এটাই স্বার্থ। এখন বুঝেছি প্রত্যেক মা ই তার সন্তানকে ভালোবাসে কিন্তু সেই মুহুর্তে আমার কম হয়েছিল মনে করে মায়ের সাথে রাগ করতেও ভুল করিনি। একইভাবে সকল আত্মীয়দের ক্ষেত্রেও তাই।
বর্তমান সমাজে, পরিবারের নিজেদের মধ্যে ঝগড়ার বেশিরভাগই হয়ে থাকে অর্থ সম্পদ সংশ্লিষ্ট। একভাই আরেক ভাইকে পৈত্রিক সম্পদ থেকে বঞ্চিত বা ভাগ কম/বেশি করতে চায়, বোনদেরকে প্রাপ্য অংশ দিতে চায়না। আর এসব নিয়ে শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি, একপর্যয়ে তা সংঘাতে রূপ নেয়। এখানেও স্বার্থের বিষয়টি মূল ভূমিকায় থাকে। আর যদি আপনার অংশটা কাউকে ছেড়ে দেন তাহলে আপনি পৃথিবীর সেরা মানুষ। আর হিসাব খুজলেই আপনি দোষী বা পর। সেই আপন পর হিসেবে কাউকে অতিরিক্ত সুবিধা দিতে না পারলে সবাই পর।
আমি এখানে স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক নিয়ে কিছু আলোচনা করছি।
* স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্কের গঠন
স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক সাধারণত অস্থায়ী হয়। এই ধরনের সম্পর্কের মধ্যে আন্তরিকতা ও ভালোবাসার অভাব থাকে। মানুষ একে অপরকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। যেমন, একজন ব্যক্তি অন্যজনকে তার কাজের জন্য ব্যবহার করে, বা আর্থিক সুবিধা লাভের জন্য সম্পর্ক স্থাপন করে। আবার স্বার্থ ফুরালে পর হয়ে যায়। এই ধরনের সম্পর্কের মধ্যে সাধারণত বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার অভাব থাকে।
* স্বার্থ ফুরালে সম্পর্কের অবস্থা
যখন সেই সম্পর্কের স্বার্থ ফুরিয়ে যায়, তখন সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে, সম্পর্কটি ভেঙে যায় বা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এই ধরনের সম্পর্কের মধ্যে সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব বা ভালোবাসা গড়ে ওঠে না। যেমন, একটি ব্যবসায়িক সম্পর্ক শুধুমাত্র লাভের জন্য গড়ে ওঠে, যখন সেই লাভের উৎস বন্ধ হয়ে যায়, তখন সম্পর্কের গুরুত্ব কমে যায়। এখানে শুধু আত্মীয় স্বজনই নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলোও স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। যে দেশ যার কাছ থেকে যত সুবিধা পাবে সেই দেশ তাদের কাছে ততই আপন হবে। আবার স্বার্থ যখন শেষ হয়ে যায় বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও তখন পর হয়ে যায়, এমনকি শত্রুতেও রূপান্তরিত হয়ে যায়।
* সামাজিক ও মানসিক প্রভাব
স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কের সামাজিক ও মানসিক প্রভাব রয়েছে। এই ধরনের সম্পর্কের মধ্যে মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়, যা সমাজে অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে। এছাড়া, এই ধরনের সম্পর্কের মধ্যে মানুষের আত্মমুল্যায়নের অভাব দেখা যায়, কারণ তারা জানে যে, তাদের মূল্য শুধুমাত্র তাদের উপকারিতার জন্য।
* সম্পর্কের স্থায়ীত্বের জন্য সুপারিশ
দীর্ঘস্থায়ী ও সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে, সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে আন্তরিকতা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি থাকা উচিত। এছাড়া, সম্পর্কের মধ্যে খোলামেলা যোগাযোগ ও সমঝোতা থাকা প্রয়োজন। নিজের স্বার্থ দেখার আগে বিপরীত দিকে খেয়াল করতে হবে। আমাকে দিতে গিয়ে অন্যজন কোন কষ্ট পাচ্ছে কিনা। পরোপকার করার জন্য প্রতিযোগীতা করা। ভাবতে হবে যে শুধু ওরাই কেন মানুষের কল্যাণে কাজ করবে? চাইলে আমিও পারি। এবং আপনাকে দেখে অন্যজন শিখবে। সম্পর্ক হোক উপকারের মন মানসিকতা নিয়ে। কিছু পাওয়ার অঅশায় নয়। তাহলে এই ধরনের সম্পর্ক শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সুখই নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করে।
* উপসংহার
স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক অস্থায়ী ও অস্থির হয়। এই ধরনের সম্পর্কের মধ্যে আন্তরিকতা ও ভালোবাসার অভাব থাকে, যা সম্পর্কের স্থায়ীত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই, সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে আন্তরিকতা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা, যাতে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী ও সুস্থ হয়। স্বার্থের কারনে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ধরে রাখা খুবই কঠিন বা অসম্ভব। কারন কোন একজন ব্যক্তি সারাজীন কাউকে সুবিধা দিয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করলেও যে স্বার্থপর সে বেঈমানী করবেই। যে ব্যক্তি কারো উপকারের কথা মনে না রেখে শুধু দোষ খুজে বেড়ায় সেটাকে কোন সম্পর্কের আওতায় রাখা উচিৎ নয়। কারন সে একমুহুর্তে হাজারটা উপকারের কথা ভুলে গিয়ে শত্রু হয়ে যায়। এমন সম্পর্ক কাম্য নয়। সুতরাং সম্পর্ক হোক বন্ধুত্বপূর্ণ যে বন্ধু হাসিমুখে হাজারটা ভুল ক্ষমা করতে পারে। শুধরে দিতে পারে। নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। আসুন আমরা পরস্পর পরস্পরের এমন বন্ধু হয়ে ওঠি।
এমএসএম / এমএসএম

স্বার্থ ফুরালে সবাই পর

বইবিমুখ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, সন্ধ্যা প্রদীপে পড়ার রেওয়াজে পড়েছে ভাটা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জ

কোচিং-এর গোলকধাঁধায়, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে গুরুত্ব নেই

সাংবাদিকের দল সমর্থন গণতন্ত্রের জন্য হুমকি

ইঁদুরের কৃতজ্ঞতা

নাগরিক সেবা ও প্রত্যাশার সংকট: রাষ্ট্রীয় কর্মচারী কোথায়?

টেকসই সমাজ গঠনে সাম্য একটি অপরিহার্য ভিত্তি

শুভ জন্মাষ্টমী : সত্য, সুন্দর ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় শান্তির বার্তা

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অপরিহার্য

জনগণের অংশগ্রহণে নির্বাচিতরাই কাশ্মীরের শাসক

স্বৈরশাসকের বিদায়, বিদ্রোহ ও পলায়ন
