নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারেক রহমানের স্বপ্ন ও বাস্তবায়ন
১৭ বছর পর দেশের মাটিতে পৌছেই নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্নের কথা জানালেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কিন্তু তাঁর এই স্বপ্ন ও বাস্তবায়নের বিষয়টি আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার করেও বাংলাদেশ এখনো গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে রাজনৈতিক দর্শন, ভাবনা ও রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন, তা মূলত একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্নকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। এর আগে যত সরকারই এসেছে সবাই জনগণের কথা বললেও বাস্তবে নিজের ও নিজ দলের লোকদের স্বার্থ দেখেছেন সবাই। কিন্তু বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের সন্তান হিসেবে তিনি যে প্ল্যানের কথা বলছেন তা জনগণের কল্যাণেরই ইঙ্গিত করে। এর আগেও তিনি রাষ্ট্র সংস্কারে যে ৩১ দফা দিয়েছেন তাতেও তিনি নিজেকে একজন সুনাগরিকের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর কথা, চলন, আচরণ ও ভাষায় অনেকটাই পরিপাটি লিডারশিপ প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য ও রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার আলোকে আমার এই বিশ্লেষণ।
নিরাপদ বাংলাদেশ বলতে তারেক রহমান কেবল শারীরিক নিরাপত্তা বোঝান না; বরং তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, নাগরিক নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। তার বক্তব্য ও রাজনৈতিক নথিপত্রে বারবার উঠে আসে, রাষ্ট্র তখনই নিরাপদ হয়, যখন নাগরিক নিরাপদ বোধ করে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক চিন্তার একটি বড় ভিত্তি হলো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। তিনি বিশ্বাস করেন, নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রথম শর্ত অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কারণ ভোটাধিকার হরণ হলে নাগরিক রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে এবং সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি হয়। তারেক রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশে নির্বাচন হবে জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলনের মাধ্যম, যেখানে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে।
আইনের শাসন তারেক রহমানের ভাবনায় আরেকটি কেন্দ্রীয় উপাদান। তিনি বারবার বলেছেন, আইন সবার জন্য সমান না হলে রাষ্ট্র কখনো নিরাপদ হতে পারে না। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে ছাড় দেওয়া বা কাউকে টার্গেট করা, এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, বিচার বিভাগ স্বাধীন ও শক্তিশালী হলে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, অপরাধ কমে এবং নাগরিক আস্থা ফিরে আসে।
নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারেক রহমান মানবাধিকারকে মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে দেখেন। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, এসবকে তিনি রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর বলে মনে করেন। তার রাজনৈতিক দর্শনে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা মানে নাগরিকের কণ্ঠরোধ নয়; বরং ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করা। তিনি বিশ্বাস করেন, ভয়ের রাজনীতি কখনো টেকসই নিরাপত্তা দিতে পারে না।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তারেক রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি মনে করেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বৈষম্য বাড়লে সমাজে অপরাধ, চরমপন্থা ও অস্থিরতা বাড়ে। তাই নিরাপদ বাংলাদেশ মানে কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি, সুশাসনভিত্তিক উন্নয়ন এবং দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা। তার বক্তব্যে বারবার উঠে আসে, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের জীবনে নিরাপত্তা ও স্বস্তি আনে।
তারেক রহমানের চিন্তায় তরুণ সমাজ বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ; তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলে রাষ্ট্রও অনিরাপদ হয়ে পড়ে। তিনি তরুণদের জন্য শিক্ষা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলেন। তার মতে, তরুণরা যদি দেশ গড়ার অংশীদার হতে পারে, তবে সহিংসতা ও হতাশা কমবে, রাষ্ট্র হবে স্থিতিশীল।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়েও তারেক রহমান স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, স্বাধীন গণমাধ্যম রাষ্ট্রের আয়না। গণমাধ্যম কণ্ঠরোধ করা মানে রাষ্ট্রকে অন্ধ করে দেওয়া। নিরাপদ বাংলাদেশে সাংবাদিকরা ভয়ের বাইরে থেকে সত্য তুলে ধরবে, নাগরিক সমাজ প্রশ্ন তুলবে, সমালোচনা করবে, আর রাষ্ট্র তা গ্রহণ করবে।
নারীর নিরাপত্তা তারেক রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশের একটি অপরিহার্য অংশ। তিনি মনে করেন, নারীরা নিরাপদ না হলে সমাজ কখনো নিরাপদ হতে পারে না। নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ, আইনি সুরক্ষা জোরদার এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। তার দৃষ্টিতে নারীর ক্ষমতায়ন মানে কেবল অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নয়; বরং সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়েও তারেক রহমান কথা বলেন। ধর্ম, জাতিসত্তা বা রাজনৈতিক মতের কারণে কাউকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানো হলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়। তার স্বপ্নের বাংলাদেশে সবাই সমান নাগরিক, সবার অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত।
বাস্তবায়নের প্রশ্নে তারেক রহমানের ভাবনায় রয়েছে রাজনৈতিক সংস্কার। তিনি বিশ্বাস করেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক রাজনীতি গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক হতে হবে, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এতে রাজনীতিতে সহিংসতা কমবে, আস্থার সংকট কাটবে।
তারেক রহমানের নিরাপদ বাংলাদেশের ধারণা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রদর্শন। তিনি মনে করেন, প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাধানই দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে পারে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি সহনশীল, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
সব মিলিয়ে, নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারেক রহমানের স্বপ্ন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রূপরেখা, যেখানে ক্ষমতার উৎস হবে জনগণ, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য। বাস্তবায়নের পথ সহজ নয়, বাধা ও বিতর্ক আছে, কিন্তু এই স্বপ্ন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার জায়গা তৈরি করে। রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হবে, যখন মানুষ ভয়ের নয়, আস্থার মধ্যে বসবাস করবে, তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথা।
তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই প্ল্যান বাস্তবায়ন এতোটা সহজ নয়, কারন দেশের জনগণ অন্যভাবে অভ্যস্ত। তাই তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে নিত্যনতুন কৌশলের সাথে প্রত্যেক নেতার চরিত্র উত্তম হওয়া উচিৎ। কথার সাথে কাজ ও বাস্তবতার মিল থাকলে বাংলাদেশের উন্নয়ন কেউ ঠেকাতে পারবে না। তবে কিছু দুষ্টু লোক সব সমাজেই থাকে, তাদের থেকে সতর্ক থাকলে এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন ততটাও কঠিন হবে বলে মনে করিনা। আমরা এটা বিশ্বাস করতে পারি তিনি দেশকে সঠিক পথেই নিয়ে যাবেন, দীর্ঘ প্রবাস জীবনের শিক্ষা যদি বাস্তবে রূপ দিতে পারেন তবে জনগণও তাঁর সাথে থাকবেন বলে মনে করি।
লেখক: সাংবাদিক ও কবি, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।
এমএসএম / এমএসএম
বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান
ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ
জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো
পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়
ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়
বেগম খালেদা জিয়া: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস
স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে বিবেক ও নৈতিকতা
সংকট কালের স্থিতিশীল নেতৃত্বে তারেক রহমান
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তা: তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি
নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারেক রহমানের স্বপ্ন ও বাস্তবায়ন
স্বৈরাচার মরে না, বারবার ফিরে আসে
আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও জনআস্থা: হাদীর রাজনৈতিক দর্শন