ঢাকা শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬

সুস্থ জীবনের স্বার্থে খাদ্যে ভেজাল রোধ জরুরী


এসএম পিন্টু photo এসএম পিন্টু
প্রকাশিত: ২৮-১-২০২৬ দুপুর ৪:১৭

মানুষের জীবনের মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য অন্যতম। খাদ্য শুধু ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের শারীরিক গঠন, মানসিক বিকাশ, কর্মক্ষমতা ও জীবনের সামগ্রিক গুণগত মান নির্ধারণ করে। একটি জাতির সুস্থতা ও উন্নয়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই জাতির জনগণের খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্যের মানের উপর। অথচ বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, খাদ্যে ভেজাল একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও খাদ্যে ভেজাল আজ জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে। এই সমস্যা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই খাদ্যে ভেজাল রোধ করা সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
খাদ্যে ভেজাল বলতে বোঝায়, খাদ্যের গুণগত মান নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বা আর্থিক লাভের আশায় খাদ্যের সঙ্গে ক্ষতিকর, নিম্নমানের বা অননুমোদিত উপাদান মেশানো। অনেক সময় খাবারের রং সুন্দর করতে, ওজন বাড়াতে, পচন রোধ করতে বা বেশি লাভের আশায় রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয়, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ বাজারের অধিকাংশ খাদ্যপণ্যই কোনো না কোনোভাবে ভেজালের শিকার। দুধ, মাছ, ফল, শাকসবজি, মসলা, চাল, তেল, মিষ্টি, শিশুখাদ্য—এমন কোনো খাদ্যপণ্য নেই যেখানে ভেজালের অভিযোগ নেই।
খাদ্যে ভেজালের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত মুনাফার লোভ। অসাধু ব্যবসায়ীরা অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্য মেশায়। তারা জানে এই ভেজাল মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর, তবুও শুধুমাত্র লাভের লোভে তারা মানবিকতা বিসর্জন দেয়। সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের দুর্বলতাও এর বড় কারণ। যেখানে বিবেক দুর্বল, সেখানে মানুষের জীবনের চেয়ে অর্থের মূল্য বেশি হয়ে ওঠে।
আরেকটি বড় কারণ হলো প্রশাসনিক দুর্বলতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব। যদিও বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা আইন রয়েছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়, বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কাজ করছে—তবুও বাস্তব চিত্র হলো, ভেজাল রোধে কার্যকর ও ধারাবাহিক নজরদারি এখনও পর্যাপ্ত নয়। অনেক সময় অভিযান সাময়িকভাবে হয়, এরপর আবার পরিস্থিতি আগের মতো হয়ে যায়। কোথাও কোথাও দুর্নীতি, অবহেলা বা প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে অপরাধীরা শাস্তির বাইরে থেকে যায়।
ভোক্তাদের সচেতনতার অভাবও খাদ্যে ভেজাল বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। সাধারণ মানুষ অনেক সময় জানে না কোন খাবার ভেজাল, কীভাবে খাঁটি খাদ্য চিনতে হয়, কিংবা কোন রাসায়নিক পদার্থ কতটা ক্ষতিকর। অজ্ঞতার সুযোগ নিয়েই অসাধু ব্যবসায়ীরা সহজে বাজারে ভেজাল পণ্য ছড়িয়ে দিতে পারে। যদি ভোক্তারা সচেতন হতো, প্রশ্ন করতো, খাঁটি পণ্যের দাবি করতো—তবে ব্যবসায়ীরাও বাধ্য হতো মান বজায় রাখতে।
এছাড়া আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারও খাদ্যে ভেজালের একটি বড় উৎস। ফল ও সবজি দ্রুত বড় করতে, পোকামাকড় নষ্ট করতে কৃষকরা অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করেন। এসব রাসায়নিক খাদ্যের সঙ্গে মানবদেহে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে।
খাদ্যে ভেজালের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এর প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানুষের দেহে দীর্ঘমেয়াদি রোগ সৃষ্টি করে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে পেটের সমস্যা, ডায়রিয়া, বমি, গ্যাস্ট্রিক, খাদ্যে বিষক্রিয়া, লিভারের সমস্যা, কিডনি বিকল হওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এমনকি ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ পর্যন্ত হতে পারে। চিকিৎসকরা মনে করেন, দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ খাদ্যে অতিরিক্ত রাসায়নিক ও ভেজাল।
শিশুদের ক্ষেত্রে খাদ্যে ভেজালের প্রভাব আরও ভয়াবহ। শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ, অথচ তারা প্রতিনিয়ত ভেজাল দুধ, ভেজাল শিশুখাদ্য, রঙ মেশানো মিষ্টি ও ফাস্টফুড গ্রহণ করছে। এর ফলে শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, মেধা বিকাশে সমস্যা দেখা দেয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। অপুষ্টি, মানসিক দুর্বলতা ও বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, যা জাতির জন্য এক ভয়ংকর সংকেত।
খাদ্যে ভেজালের কারণে শুধু ব্যক্তি বা পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রও ক্ষতির মুখে পড়ে। ভেজাল খাদ্যজনিত রোগের কারণে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়, হাসপাতালের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়, কর্মক্ষম মানুষ অসুস্থ হয়ে উৎপাদনশীলতা হারায়। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়, নাগরিক জীবনে হতাশা ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজালের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দুধে পানি মেশানো তো প্রায় সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দুধ ঘন দেখানোর জন্য ডিটারজেন্ট, ইউরিয়া, স্টার্চ বা কৃত্রিম ঘনকারক ব্যবহার করা হয়। ফলের দিকে তাকালেই দেখা যায়, আম, কলা, আপেল, আনারসসহ বিভিন্ন ফলে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেন বা অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়। এসব রাসায়নিক মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
মাছ ও মাংসে দীর্ঘদিন সতেজ দেখানোর জন্য ফরমালিন ব্যবহারের অভিযোগ বহুবার সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ফরমালিন একটি অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক, যা ক্যান্সারসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। শাকসবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক, মরিচের গুঁড়ায় ইটের গুঁড়া, হলুদে টেক্সটাইল ডাই, মসলায় করাতের গুঁড়া, এসব ভেজালের উদাহরণ এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। মিষ্টি ও বেকারির পণ্যে উজ্জ্বল রঙ আনতে অননুমোদিত কেমিক্যাল রঙ ব্যবহার করা হয়, যা শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
রমজান মাস এলেই বাজারে ইফতার সামগ্রীর ভেজাল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। বেগুনি, জিলাপি, পিয়াজু, শরবত, এসব খাবারে ব্যবহৃত তেল, রঙ ও উপকরণ অনেক সময়ই অস্বাস্থ্যকর ও নিম্নমানের হয়। এছাড়া রাস্তার পাশের ফাস্টফুড, হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারেও স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।
খাদ্যে ভেজাল রোধে সরকার কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন ভ্রাম্যমাণ আদালত, জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব উদ্যোগ আরও শক্তিশালী ও ধারাবাহিক না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। আইনের কঠোর প্রয়োগ, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা ছাড়া খাদ্যে ভেজাল বন্ধ করা কঠিন।
এই সমস্যার সমাধানে কেবল সরকার নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে দায়িত্ব নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা বাড়াতে হবে, ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে, গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। পরিবার থেকেই শিশুদের শেখাতে হবে কোন খাবার স্বাস্থ্যকর, কেন ভেজাল থেকে দূরে থাকতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের উচিত ভেজাল দেখলে প্রতিবাদ করা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং খাঁটি পণ্যের দাবি জানানো।
খাদ্যে ভেজাল রোধ করা মানে শুধু খাবার বিশুদ্ধ রাখা নয়, বরং মানুষের জীবন রক্ষা করা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখা এবং একটি শক্তিশালী জাতি গড়ে তোলা। একটি সুস্থ জাতিই পারে উন্নত রাষ্ট্র গঠন করতে। তাই খাদ্যে ভেজাল রোধকে আমাদের জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। এটি হতে হবে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ, নৈতিকতার অংশ এবং নাগরিক কর্তব্যের অংশ।
পরিশেষে বলা যায়, খাদ্যে ভেজাল একটি নীরব মহামারি, যা ধীরে ধীরে আমাদের শরীর, সমাজ ও ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করছে। এই ভয়াবহ সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি, তিন স্তরেই সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। খাদ্যে ভেজাল রোধ করা মানেই জীবন রক্ষা করা, জাতিকে রক্ষা করা, ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

 

Aminur / Aminur

পবিত্র শবে বরাত: হারিয়ে যেতে বসা আত্মার জন্য এক গভীর ডাক : মোহাম্মদ আনোয়ার

ঘুষ, দালাল ও হয়রানি: জনগণের রাষ্ট্রে জনগণই সবচেয়ে অসহায়!

সুস্থ জীবনের স্বার্থে খাদ্যে ভেজাল রোধ জরুরী

আস্থার রাজনীতি না অনিবার্যতা: তারেক রহমান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক শূন্যতা!

রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কঠিন পরীক্ষায় ত্রয়োদশ নির্বাচন

নির্বাচনী ট্রেইনে সব দল, ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিক জনগণ!

ঈমানের হেফাজতের নগরী মদিনা: মক্কার চেয়ে দ্বিগুণ বরকতের অন্তর্নিহিত রহস্য!

বিপ্লবের আশা-আকাঙ্ক্ষার যেন অপমৃত্যু না হয়

গণমানুষের আস্থার ঠিকানা হোক গণমাধ্যম

নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা: সরকার-বিরোধী উভয়েরই কল্যাণকর

শবে মেরাজের তাজাল্লি ও জিব্রাইল (আ.) এর সীমা: এক গভীর ও বিস্ময়কর সত্য!

অকুতোভয় সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা: ২২ বছরেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল পরিকল্পনাকারীরা

বিতর্ক থেকে বিবর্তন: তারেক রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তর