ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৬

স্বৈরাচার মরে না, বারবার ফিরে আসে


এসএম পিন্টু photo এসএম পিন্টু
প্রকাশিত: ২৪-১২-২০২৫ দুপুর ৪:২১

স্বৈরাচার কোনো ব্যক্তির নাম নয়, কোনো নির্দিষ্ট শাসকের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে না। স্বৈরাচার একটি মানসিকতা, একটি শাসনপ্রবণতা, একটি ক্ষমতার দর্শন, যা সময়ের ব্যবধানে রূপ বদলায়, মুখোশ পাল্টায়, নতুন ভাষা শেখে, কিন্তু তার মূল চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখে। ইতিহাসে বহুবার আমরা দেখেছি, কোনো স্বৈরশাসকের পতনের পর মানুষ ভেবেছে, এই বুঝি শেষ, এবার মুক্তি এল। কিন্তু কিছুদিন, কিছু বছর বা কিছু দশক পর সেই একই সমাজ আবারও কোনো না কোনো রূপে স্বৈরাচারের কোলে ফিরে গেছে। তাই বলা হয়, স্বৈরাচার মরে না; তাকে হত্যা করা যায় না, কেবল সাময়িকভাবে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়। সুযোগ পেলেই সে ফিরে আসে, আরও নির্মম, আরও কৌশলী হয়ে।

স্বৈরাচারের জন্ম হয় সমাজের ভেতরেই। এটি বাইরের কোনো আগ্রাসন নয়, যে শুধু অস্ত্র দিয়ে ঠেকানো যাবে। সমাজ যখন প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, নাগরিক যখন নিজের অধিকার অন্যের হাতে তুলে দেয়, যখন নিরাপত্তার বিনিময়ে স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া হয়, তখনই স্বৈরাচার ধীরে ধীরে শিকড় গাড়ে। মানুষ প্রথমে ক্লান্ত হয় বিশৃঙ্খলায়, অস্থিরতায়, দ্বন্দ্বে। তখন সে একজন “শক্ত মানুষ” খোঁজে, যে সব সমস্যার সহজ সমাধান দেবে, কঠোর হাতে শাসন করবে, বিরোধীদের চুপ করাবে। এই আকাক্সক্ষাই স্বৈরাচারের প্রথম খাদ্য।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের শেষ দিকে জনগণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জটিলতায় বিরক্ত হয়ে একনায়কতন্ত্রের দিকে ঝুঁকেছিল। জুলিয়াস সিজার হত্যার মধ্য দিয়ে তারা ভেবেছিল স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, অগাস্টাসের হাতে রোম আরও সংগঠিত, আরও প্রাতিষ্ঠানিক স্বৈরশাসনে প্রবেশ করল। অর্থাৎ ব্যক্তি বদলাল, কিন্তু শাসনচিন্তা বদলাল না। এটাই স্বৈরাচারের বৈশিষ্ট্য, একজন যায়, আরেকজন আসে; কাঠামো থেকে যায়।

স্বৈরাচার কেন বারবার ফিরে আসে, এর একটি বড় কারণ মানুষের স্মৃতিভ্রংশ। প্রতিটি প্রজন্ম ভাবে, আগের স্বৈরাচার খারাপ ছিল, কিন্তু এবার যিনি আসছেন তিনি আলাদা। তিনি “উন্নয়ন করবেন”, “দেশকে শক্ত করবেন”, “শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবেন”। এই উন্নয়ন ও শৃঙ্খলার মোড়কেই স্বৈরাচার সবচেয়ে দক্ষভাবে ব্যবহার করে। মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয় ধাপে ধাপে, এমনভাবে যে মানুষ টেরই পায় না, কবে সে নীরব বন্দি হয়ে গেছে।

বিশ শতকের ইউরোপ এই সত্যের সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ছিল অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত, সামাজিকভাবে ক্ষতবিক্ষত, আত্মমর্যাদায় চূর্ণ। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই অ্যাডলফ হিটলার উঠে এসেছিলেন। তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেই ক্ষমতায় এসেছিলেন, জনগণের ভোটেই। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর তিনি একে একে গণতন্ত্রের সব দরজা বন্ধ করে দেন। সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে নেন, বিচারব্যবস্থাকে দলীয় হাতিয়ার বানান, ভিন্নমতকে রাষ্ট্রদ্রোহ ঘোষণা করেন। নাৎসি জার্মানির পতনের পর বিশ্ব ভেবেছিল, এই ভয়াবহতা আর ফিরবে না। কিন্তু আজও ইউরোপের নানা দেশে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান দেখিয়ে দেয়, স্বৈরাচারের বীজ পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।

স্বৈরাচার বারবার ফিরে আসে কারণ এটি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার বিষয় নয়, এটি সামাজিক মানসিকতার ফল। যে সমাজে প্রশ্ন করাকে অপরাধ মনে করা হয়, যেখানে “নেতা জানেন সব” এই বিশ্বাস গড়ে ওঠে, যেখানে ভিন্নমতকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে দেখা হয়, সেই সমাজে স্বৈরাচারের পুনরাগমন অবশ্যম্ভাবী। মানুষ যখন নিজেই নিজের চিন্তার দায়িত্ব অন্যের কাঁধে তুলে দেয়, তখন সে অজান্তেই নিজের শৃঙ্খল তৈরি করে।

রাশিয়ার ইতিহাসও এই চক্রের এক ক্লাসিক উদাহরণ। জারতন্ত্রের পতনের পর মানুষ ভেবেছিল তারা মুক্তি পেল। কিন্তু খুব দ্রুতই স্টালিনের হাতে রাষ্ট্র পরিণত হলো আরও ভয়ঙ্কর স্বৈরশাসনে। লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা, গুলাগ, ভয়, সবই রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হলো। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আবারও আশা জাগে গণতন্ত্রের। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ভøাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া আবার শক্ত একনায়কতান্ত্রিক শাসনের দিকে ফিরে গেছে। এখানে স্পষ্ট বোঝা যায়, ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও ক্ষমতার কাঠামোই স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি ঘটায়।
স্বৈরাচার নিজেকে টিকিয়ে রাখে ভয় ও সুবিধার মাধ্যমে। একদিকে বিরোধীদের জন্য ভয়, অন্যদিকে অনুগতদের জন্য সুবিধা। রাষ্ট্রের সম্পদ, পদ, ক্ষমতা ভাগ করে দিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী শ্রেণি তৈরি করা হয়, যারা স্বৈরাচার টিকে থাকার প্রহরী হিসেবে কাজ করে। এই শ্রেণি পরিবর্তনের ভয় পায়, কারণ পরিবর্তন মানেই তাদের বিশেষ সুবিধার অবসান। ফলে স্বৈরাচার পতনের মুখে পড়লেও তার শেকড় উপড়ে ফেলা কঠিন হয়ে যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বৈরাচার সবসময় বন্দুক নিয়ে আসে না। আধুনিক স্বৈরাচার অনেক সময় নির্বাচন করে, সংবিধানের কথা বলে, উন্নয়নের পরিসংখ্যান দেখায়। কিন্তু এসবের আড়ালে নাগরিক স্বাধীনতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়। মানুষ ভাবে, “আমার তো কিছু হচ্ছে না”, এই আত্মতুষ্টিই স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় শক্তি। যতদিন ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত না লাগে, ততদিন অনেকেই নীরব থাকে। কিন্তু যখন আঘাত আসে, তখন প্রতিবাদ করার জায়গাগুলো ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।
স্বৈরাচার মরে না কারণ তাকে হত্যা করার জন্য যে শক্ত ভিত দরকার, সচেতন নাগরিক, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, প্রশ্নকারী গণমাধ্যম, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, এসব গড়ে তোলা সবচেয়ে কঠিন কাজ। বিপ্লব দিয়ে শাসক বদলানো যায়, কিন্তু সংস্কৃতি বদলানো যায় না সহজে। তাই বিপ্লবের পরও পুরনো অভ্যাস, পুরনো ভীতি, পুরনো আনুগত্য ফিরে আসে নতুন রূপে।

স্বৈরাচার বারবার ফিরে আসে, এর প্রমাণ শুধু ইউরোপ বা রাশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মহাদেশেই এই চক্র ঘুরে ফিরে দেখা যায়। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার ইতিহাস পড়লে বোঝা যায়, স্বৈরাচার কীভাবে পতনের পরও নতুন মুখোশ পরে ক্ষমতায় ফিরে আসে। এখানে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়, স্বৈরাচার কখনোই নিজেকে “স্বৈরাচার” বলে পরিচয় দেয় না। সে নিজেকে বলে “উদ্ধারক”, “জাতির রক্ষাকর্তা”, “স্থিতিশীলতার প্রতীক”।
লাতিন আমেরিকার দিকে তাকালে চিলির উদাহরণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৩ সালে জেনারেল অগুস্তো পিনোশে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। তাঁর শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ গুম, হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়। যখন পিনোশের পতন ঘটে, তখন চিলির মানুষ বিশ্বাস করেছিল, এই অধ্যায় শেষ। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। পিনোশে সরাসরি ক্ষমতায় না থাকলেও তাঁর তৈরি করা সংবিধান, তাঁর গড়ে তোলা ক্ষমতার কাঠামো বহু বছর ধরে বহাল থাকে। গণতন্ত্র ফিরে এলেও স্বৈরাচারের ছায়া সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে যায়। অর্থাৎ স্বৈরাচার শুধু শাসকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সে প্রতিষ্ঠান ও নিয়মের ভেতর লুকিয়ে থাকে।

আর্জেন্টিনার ইতিহাসেও একই ছবি দেখা যায়। একের পর এক সামরিক শাসন, তারপর গণতন্ত্র, আবার অস্থিরতা, এই দোলাচল প্রমাণ করে যে স্বৈরাচারের শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে কেবল নির্বাচন যথেষ্ট নয়। বিচার না হলে, অতীতের অপরাধের জবাবদিহি না হলে, সমাজে আবারও সেই একই শক্তির পুনরুত্থান ঘটে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় বীমা।

মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি আরও ভয়াবহ ও জটিল। মিসরের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। হোসনি মুবারকের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পতনের পর আরব বসন্তের সময় মানুষ ভেবেছিল, অবশেষে মুক্তি। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ আবারও প্রতিষ্ঠিত হলো। নতুন শাসক এলেন, নতুন ভাষা ব্যবহার করলেন, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, ভিন্নমত দমন, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, সবকিছু আগের মতোই রইল। এখানে বোঝা যায়, স্বৈরাচার শুধু একজন ব্যক্তির বিদায়ে শেষ হয় না; রাষ্ট্রের ভেতরের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী, যদি গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তাহলে স্বৈরাচার ফিরে আসবেই।

ইরানের উদাহরণ আরও ভিন্ন, কিন্তু শিক্ষণীয়। শাহের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের মাধ্যমে যে বিপ্লব হলো, তা মানুষকে আশার আলো দেখিয়েছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই একটি ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠল, যেখানে ভিন্নমত দমন হলো আরও কঠোরভাবে। এখানে দেখা যায়, স্বৈরাচার ধর্ম, জাতীয়তাবাদ বা আদর্শ, যে কোনো মোড়ক ব্যবহার করতে পারে। মোড়ক বদলায়, কিন্তু শাসনের চরিত্র বদলায় না।

আফ্রিকায় স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তির পেছনে রয়েছে উপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা। বহু দেশ স্বাধীনতার পর গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু দুর্বল প্রতিষ্ঠান, জাতিগত বিভাজন ও সামরিক বাহিনীর আধিপত্য সেই স্বপ্নকে ভেঙে দেয়। উগান্ডার ইদি আমিন, জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবে, এরা সবাই প্রথমে “মুক্তিদাতা” হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। পরে তারাই পরিণত হন ভয়াবহ স্বৈরশাসকে। মুগাবের পতনের পরও জিম্বাবুয়ে প্রকৃত গণতন্ত্রে যেতে পারেনি, কারণ শাসক বদলালেও ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলায়নি।

এই সব উদাহরণ থেকে একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়, স্বৈরাচার ফিরে আসে যখন গণতন্ত্রকে শুধু ভোটের অঙ্কে সীমাবদ্ধ করা হয়। নির্বাচন হয়, কিন্তু নির্বাচন সুষ্ঠু নয়। সংসদ থাকে, কিন্তু সংসদ ক্ষমতাহীন। আদালত থাকে, কিন্তু স্বাধীন নয়। সংবাদমাধ্যম থাকে, কিন্তু প্রশ্ন করতে পারে না। এই ছদ্ম-গণতন্ত্রই স্বৈরাচারের সবচেয়ে আরামদায়ক আশ্রয়।

স্বৈরাচার গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করার আগেই তাকে নিজের মতো করে ব্যবহার করে। সে নির্বাচনকে বৈধতার সিল হিসেবে নেয়, সংবিধানকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে, আইনকে দমন-পীড়নের অস্ত্র বানায়। ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়, বুঝতে পারে না, তারা আসলে গণতন্ত্রে আছে নাকি স্বৈরতন্ত্রে। এই বিভ্রান্তি যত দীর্ঘ হয়, স্বৈরাচারের শেকড় তত গভীর হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি। অনেক সময় আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো স্বৈরাচারকে টিকিয়ে রাখে “স্থিতিশীলতা”, “নিরাপত্তা” বা “স্বার্থ”-এর নামে। কোনো স্বৈরশাসক যদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষা করে, বা বড় শক্তির অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ নিশ্চিত করে, তাহলে তার মানবাধিকার লঙ্ঘন উপেক্ষিত হয়। ফলে স্বৈরাচার শুধু ঘরোয়া নয়, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থারও পৃষ্ঠপোষকতা পায়।

এখানেই স্বৈরাচারের আরেকটি রূপ প্রকাশ পায়, সে কেবল দেশের ভেতরে দমন চালায় না, আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। উন্নয়নের গল্প শোনায়, অবকাঠামোর ছবি দেখায়, জিডিপির পরিসংখ্যান তুলে ধরে। এতে করে অনেক নাগরিকও প্রশ্ন তোলা থেকে বিরত থাকে,“উন্নয়ন তো হচ্ছে!” এই উন্নয়ন-কেন্দ্রিক নীরবতাই স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় বিজয়।

স্বৈরাচার ফিরে আসে কারণ সমাজে প্রতিবাদের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘ দমন-পীড়নের ফলে মানুষ ভয় পেতে শেখে, আপস করতে শেখে, নীরব থাকতে শেখে। এক সময় এই নীরবতা অভ্যাসে পরিণত হয়। নতুন প্রজন্ম বড় হয় এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে প্রশ্ন করা অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। ফলে স্বৈরাচার শুধু রাষ্ট্র নয়, মানুষের মনও দখল করে নেয়।

স্বৈরাচার বারবার ফিরে আসে কারণ গণতন্ত্র বারবার ব্যর্থ হয়, এই কথাটি শুনতে কঠোর মনে হলেও ইতিহাসের নিরিখে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। অধিকাংশ সমাজেই গণতন্ত্রকে শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়, একটি নির্বাচন-নির্ভর প্রক্রিয়া হিসেবে বোঝা হয়। কিন্তু গণতন্ত্র আসলে একটি সংস্কৃতি, একটি মানসিকতা, একটি দৈনন্দিন চর্চা। যখন এই চর্চা দুর্বল হয়, তখন গণতন্ত্র নামমাত্র থেকে যায়, আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করে স্বৈরাচার।

গণতন্ত্র ব্যর্থ হয় প্রথমত তখনই, যখন নাগরিকরা নিজেদের দায়িত্ব ভুলে যায়। ভোট দেওয়াকে দায়িত্বের শেষ ধাপ মনে করা হয়, শুরু নয়। মানুষ মনে করে, পাঁচ বছর পর একদিন ভোট দিলেই তার কর্তব্য শেষ। এই ধারণা স্বৈরাচারের জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। কারণ স্বৈরাচার জানে, নাগরিক যদি নিয়মিত প্রশ্ন না করে, জবাবদিহি না চায়, তাহলে ধীরে ধীরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা যাবে, কেউ টেরও পাবে না।

দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্র ব্যর্থ হয় যখন প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি নির্ভর হয়ে পড়ে। শক্তিশালী গণতন্ত্রে ব্যক্তি আসে-যায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। দুর্বল গণতন্ত্রে উল্টোটা ঘটে, প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকে, ব্যক্তি শক্তিশালী হয়। আদালত, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্থা, প্রশাসন, সবকিছু যদি শাসকের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে গণতন্ত্র কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে থাকে না। এই পরিস্থিতিতে স্বৈরাচারের পুনরাগমন অবশ্যম্ভাবী।

মিডিয়ার ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস দেখায়, স্বৈরাচার কখনোই প্রথমে বন্দুক দিয়ে আসে না; সে আসে ভাষা দিয়ে, বয়ান দিয়ে, গল্প দিয়ে। আর এই গল্প ছড়িয়ে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো মিডিয়া। যখন মিডিয়া স্বাধীন থাকে, তখন স্বৈরাচারের জন্য ক্ষমতা দখল কঠিন হয়। কিন্তু যখন মিডিয়া মালিকানার দখলে, রাজনৈতিক আনুগত্যের কাছে বন্দি বা ভয়ভীতির শিকার হয়, তখন সে স্বৈরাচারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

বিশ শতকের ইউরোপে নাৎসি জার্মানি এর সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ। জোসেফ গোয়েবলসের নেতৃত্বে নাৎসি প্রচারণা যন্ত্র কেবল সংবাদ পরিবেশন করত না, তারা বাস্তবতাই তৈরি করত। মিথ্যাকে সত্য বানানো, শত্রু তৈরি করা, ভিন্নমতকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা, এসবই মিডিয়ার মাধ্যমে করা হয়েছিল। আধুনিক যুগে এই প্রচারণা আরও সূক্ষ্ম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ট্রল আর্মি, ভুয়া খবর, সব মিলিয়ে স্বৈরাচার এখন অনেক বেশি দক্ষ।

বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা আরও জটিল। বুদ্ধিজীবীরা সমাজের বিবেক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ইতিহাস বলে, স্বৈরাচার সবচেয়ে ভয় পায় না সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে; সে ভয় পায় চিন্তাশীল মানুষের প্রশ্নে। তাই স্বৈরাচার প্রথমেই চেষ্টা করে বুদ্ধিজীবীদের কিনে নিতে, ভয় দেখাতে বা কোণঠাসা করতে। কেউ কেউ সুবিধার লোভে শাসকের সঙ্গে আপস করেন, কেউ ভয়ের কারণে নীরব থাকেন, কেউ আবার “স্থিতিশীলতা” বা “জাতীয় স্বার্থ”-এর নামে স্বৈরাচারকে যৌক্তিকতা দেন।

এই আপসের সংস্কৃতি সমাজে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যখন সাধারণ মানুষ দেখে, শিক্ষক, লেখক, বিশ্লেষকরা ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলছেন না, তখন তারাও ধরে নেয়, সব ঠিকই আছে। এভাবেই স্বৈরাচার সামাজিক সম্মতি তৈরি করে নেয়। এক সময় এই সম্মতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে স্বৈরাচারের বিরোধিতা করাই অস্বাভাবিক মনে হয়।

গণতন্ত্র ব্যর্থ হয় যখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বৈরাচারের পতনের পর যদি অপরাধের বিচার না হয়, যদি দমন-পীড়নের দায় কেউ না নেয়, তাহলে সমাজে একটি বার্তা যায়, ক্ষমতায় থাকলে সবকিছু করা যায়। এই বার্তাই ভবিষ্যতের স্বৈরাচারীদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, এমনকি ইউরোপেও দেখা গেছে, যেখানে অতীতের অপরাধের বিচার হয়নি, সেখানে স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি হয়েছে।

আরেকটি বড় কারণ হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। চরম বৈষম্য মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করে। এই হতাশাকে কাজে লাগিয়ে স্বৈরাচার উঠে আসে। সে বলে, “সব সমস্যার কারণ এই গোষ্ঠী বা এই বিরোধীরা।” মানুষ সহজ শত্রু খোঁজে, জটিল বাস্তবতা বুঝতে চায় না। এই শত্রু-নির্মাণ রাজনীতিই স্বৈরাচারের অন্যতম অস্ত্র।

গণতন্ত্র তখনই সবচেয়ে দুর্বল হয়, যখন তা আত্মরক্ষার ক্ষমতা হারায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যদি নিজেকে রক্ষা করার মতো আইন, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক ঐকমত্য তৈরি না করতে পারে, তাহলে স্বৈরাচার গণতন্ত্রের ভেতর দিয়েই ক্ষমতা দখল করে। হিটলার যেমন নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছিলেন, তেমনি অনেক আধুনিক স্বৈরশাসকও গণতন্ত্রের পথেই উঠে এসেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, গণতন্ত্র কি অতিরিক্ত সহনশীল হয়ে পড়ে? সব মত, সব শক্তিকে সমান জায়গা দিতে গিয়ে কি সে নিজের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে? ইতিহাসের উত্তর হলো, হ্যাঁ, যদি গণতন্ত্র তার মৌলিক মূল্যবোধ রক্ষা না করে, তবে সহনশীলতাই তার দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।

স্বৈরাচার ফিরে আসে কারণ সমাজে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শিক্ষা নেই। নাগরিকদের শেখানো হয় না, অধিকার মানে কী, দায়িত্ব মানে কী, রাষ্ট্র আর সরকারের পার্থক্য কী। ফলে মানুষ সহজেই সরকারকে রাষ্ট্র মনে করে, শাসককে দেশ বলে ভুল করে। এই বিভ্রান্তিই স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় শক্তি।

এই অংশের শেষে এসে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, স্বৈরাচার কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। গণতন্ত্রের ক্ষয়, নাগরিক দায়িত্বের অবক্ষয়, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের আপস, বিচারহীনতা ও বৈষম্য, সব মিলিয়ে স্বৈরাচারের পুনরাগমন ঘটে।
দক্ষিণ এশিয়া স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তির এক অনন্য ভূগোল। এখানে স্বৈরাচার সরাসরি সামরিক শাসন হিসেবেও এসেছে, আবার নির্বাচিত সরকারের আড়ালে কর্তৃত্ববাদ হিসেবেও গড়ে উঠেছে। এই অঞ্চলের ইতিহাস বলছে, স্বৈরাচার এখানে শুধু ফিরে আসে না, অনেক সময় দীর্ঘদিন টিকে থাকে এবং সামাজিকভাবে “স্বাভাবিক” হয়ে ওঠে। এর পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনীতিকে ঘিরে ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি।

ভারতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র হিসেবেও স্বৈরাচারী প্রবণতা থেকে সে মুক্ত নয়। ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থা ছিল নির্বাচিত সরকারের ভেতর থেকেই স্বৈরাচারের এক নগ্ন প্রকাশ। মৌলিক অধিকার স্থগিত, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, বিরোধীদের কারাবন্দি, সবই হয়েছিল “জাতীয় স্বার্থ” ও “স্থিতিশীলতা”-র নামে। জরুরি অবস্থা উঠে যাওয়ার পর ভারত গণতন্ত্রে ফিরে এলেও সেই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে দেয়, গণতন্ত্রের কাঠামোর ভেতরেই স্বৈরাচার লুকিয়ে থাকতে পারে।

পাকিস্তানের ইতিহাস আরও স্পষ্টভাবে দেখায়, কীভাবে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রের স্থায়ী ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হয়। একের পর এক সামরিক শাসক, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়াউল হক, পারভেজ মোশাররফ, দেশটিকে শাসন করেছেন। প্রতিবারই বলা হয়েছে, এই শাসন সাময়িক, গণতন্ত্রকে “শুদ্ধ” করতেই সেনাবাহিনী এসেছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি সামরিক শাসন গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করেছে, আর স্বৈরাচারের শেকড় আরও গভীর করেছে। এখানে দেখা যায়, স্বৈরাচার কেবল একজন শাসক নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় শক্তি-কাঠামো।

শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধের দীর্ঘ সময়জুড়ে নিরাপত্তার নামে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও সেই কেন্দ্রীকরণ পুরোপুরি ভাঙেনি। রাজাপাকসে পরিবারের শাসন দেখিয়েছে, যুদ্ধজয়ের নায়ক সহজেই স্বৈরশাসকে পরিণত হতে পারে, যদি জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকে। যুদ্ধের ভয় ও জাতীয়তাবাদ স্বৈরাচারের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি আরও গভীর ও বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি একের পর এক রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক হস্তক্ষেপ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। সামরিক শাসন, ছদ্ম-গণতন্ত্র, একদলীয় প্রবণতা, সবই কোনো না কোনো সময়ে দেখা গেছে। প্রতিবারই মানুষ আশা করেছে, এবার বুঝি শিক্ষা হলো, এবার বুঝি আর ফিরে আসবে না। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, স্বৈরাচারের প্রবণতা বারবার নতুন রূপে হাজির হয়েছে।

বাংলাদেশে স্বৈরাচার শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দলীয় আচরণের ভেতরও প্রোথিত। নেতা মানেই প্রশ্নাতীত, দল মানেই সবকিছুর ঊর্ধ্বে, এই মানসিকতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। ক্ষমতায় থাকলে সব বৈধ, ক্ষমতার বাইরে থাকলে সব অবৈধ, এই দ্বৈত মানদণ্ড স্বৈরাচারেরই লক্ষণ।

এখানে বিরোধী রাজনীতিকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা খুবই প্রবল। ভিন্নমতকে রাষ্ট্রবিরোধিতা, সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র, প্রশ্নকে দেশদ্রোহিতার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়। এই রাজনীতি শুধু ক্ষমতাসীনদের দোষ নয়; বিরোধীরাও ক্ষমতায় গেলে প্রায় একই আচরণ করে। ফলে স্বৈরাচার ব্যক্তি নয়, চক্রাকারে ঘুরে ফিরে আসে।

দক্ষিণ এশিয়ায় স্বৈরাচার দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আরেকটি কারণ হলো দুর্বল স্থানীয় সরকার ও নাগরিক প্রতিষ্ঠান। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ না হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রে জমা হয়। এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাই স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় জ্বালানি। যখন সব সিদ্ধান্ত কয়েকজনের হাতে থাকে, তখন ক্ষমতার অপব্যবহার অনিবার্য হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো প্রায়ই “স্থিতিশীলতা”র অজুহাতে স্বৈরাচারী প্রবণতাকে উপেক্ষা করে সুবিধা পায়। উন্নয়ন প্রকল্প, কৌশলগত অবস্থান, নিরাপত্তা সহযোগিতা, এসবের বিনিময়ে গণতন্ত্রের প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়। ফলে স্বৈরাচার শুধু দেশের ভেতরের সমস্যা থাকে না, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে।

এই অংশে এসে স্পষ্ট হয়, স্বৈরাচার দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মিত ঘটনা। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ক্ষমতার কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে, গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খায় আর স্বৈরাচার আবার মাথাচাড়া দেয়।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রশ্ন হলো, এই চক্র ভাঙার কোনো বাস্তব উপায় আছে কি? নাকি আমরা চিরকাল এই দোলাচলের মধ্যেই ঘুরপাক খাব? ইতিহাসের কিছু উদাহরণ বলছে, চাইলেই এই চক্র ভাঙা সম্ভব, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন।

স্বৈরাচার বারবার ফিরে আসে, এই সত্য যতটা কঠিন, তার বিপরীতে আরেকটি সত্যও আছে: স্বৈরাচার অপরাজেয় নয়। ইতিহাসে এমন দেশও আছে, যারা দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক পথে ফিরেছে এবং সেই পথকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, স্বৈরাচার থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব, তবে তাৎক্ষণিক নয়, বিপ্লবী আবেগে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও সামাজিক চর্চার মাধ্যমে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। নাৎসি শাসনের ভয়াবহ পতনের পর জার্মানি শুধু নতুন সরকার গঠন করেনি; তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকার করেছে অপরাধ, করেছে বিচার, করেছে শিক্ষা সংস্কার। নাৎসিবাদের ইতিহাস স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, লুকানো হয়নি, ঢেকে রাখা হয়নি। বিচারহীনতা নয়, বরং জবাবদিহিই ছিল পুনর্গঠনের ভিত্তি। এর ফলে নতুন প্রজন্ম বুঝেছে, স্বৈরাচার কী, কেন তা ভয়ংকর, এবং কেন তাকে কখনোই স্বাভাবিক ভাবা যাবে না।

স্পেনের উদাহরণও তাৎপর্যপূর্ণ। ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর স্পেন ধীরে ধীরে গণতন্ত্রে ফিরে আসে। এখানে কোনো রাতারাতি বিপ্লব হয়নি। বরং সংবিধানিক সংস্কার, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে একটি সহনশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। যদিও স্পেনের গণতন্ত্র নিখুঁত নয়, তবুও সেখানে স্বৈরাচারের প্রকাশ্য পুনরাগমন ঘটেনি, কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে শক্ত।

দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা আরও স্পষ্টভাবে দেখায়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্বৈরশাসন একই সঙ্গে টেকসই নয়। দীর্ঘ সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর দেশটি গণআন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে আসে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গণতন্ত্র আসার পরও নাগরিক আন্দোলন থেমে যায়নি। সরকার, আদালত, রাষ্ট্রপতি, সবাইকে নিয়মিত প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। দুর্নীতির দায়ে রাষ্ট্রপতিদের বিচার হওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত দিয়েছে। এই জবাবদিহির সংস্কৃতিই স্বৈরাচারের পুনরাগমন ঠেকিয়েছে।

লাতিন আমেরিকার কিছু দেশেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসেছে। চিলিতে পিনোশের রেখে যাওয়া সংবিধান পরিবর্তনের আন্দোলন দেখিয়েছে, স্বৈরাচারের কাঠামো ভাঙতে হলে আইন ও সংবিধানকেও নতুন করে ভাবতে হয়। যদিও পথ মসৃণ নয়, তবুও নাগরিক সচেতনতা ও ধারাবাহিক আন্দোলন স্বৈরাচারের উত্তরাধিকারকে চ্যালেঞ্জ করছে।

এই উদাহরণগুলো থেকে কয়েকটি সাধারণ শর্ত স্পষ্ট হয়। প্রথমত, স্বৈরাচারের পতনের পর প্রতিশোধ নয়, কিন্তু বিচার অপরিহার্য। বিচার ছাড়া সমাজে ন্যায়বোধ তৈরি হয় না। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চর্চা থাকতে হবে। নতুন প্রজন্ম যদি অতীত না জানে, তবে তারা একই ভুল করবে। তৃতীয়ত, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না। স্থানীয় সরকার, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সংগঠন, সবাইকে শক্ত হতে হয়।

স্বৈরাচার থেকে বেরিয়ে আসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো স্বাধীন মিডিয়া ও ডিজিটাল সচেতনতা। আধুনিক স্বৈরাচার প্রচারণার ওপর নির্ভরশীল। তাই তথ্য যাচাই, মতের বহুত্ব এবং মিডিয়ার স্বাধীনতা ছাড়া স্বৈরাচার ঠেকানো সম্ভব নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন স্বৈরাচারের হাতিয়ার হতে পারে, তেমনি সচেতন নাগরিকের হাতে এটি প্রতিরোধের অস্ত্রও হতে পারে।

এখানে নাগরিকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক যদি রাষ্ট্রকে প্রশ্ন না করে, সরকারকে রাষ্ট্র ভেবে বসে, তাহলে কোনো সংবিধানই তাকে রক্ষা করতে পারে না। গণতন্ত্রের আসল পাহারাদার কোনো বাহিনী নয়, নাগরিক নিজেই। এই উপলব্ধি ছাড়া স্বৈরাচারের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

তবে বাস্তবতা হলো, এই পথ দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য। গণতন্ত্র কোনো স্থায়ী অর্জন নয়; এটি প্রতিদিন নতুন করে রক্ষা করতে হয়। প্রতিটি প্রজন্মকে তার নিজের গণতন্ত্র নিজেকেই তৈরি করতে হয়। এক প্রজন্মের অর্জন পরের প্রজন্মের জন্য নিশ্চিত নয়, এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা।

এই অংশে এসে আমরা বুঝতে পারি, স্বৈরাচার ফিরে আসে কারণ সমাজ তাকে সুযোগ দেয়। আবার সমাজ চাইলে তাকে আটকে দিতেও পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা কোনটা বেছে নেব?
স্বৈরাচার ভবিষ্যতেও ফিরে আসবে, এই কথাটি অনুমান নয়, বরং ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতার যৌথ সতর্কবার্তা। কারণ স্বৈরাচার নিজেকে সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। আগের স্বৈরাচার ছিল দৃশ্যমান, সামরিক বুট, সেন্সরশিপ, কারফিউ। আধুনিক স্বৈরাচার অনেক বেশি নিঃশব্দ, অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। সে আজ আর শুধু বন্দুক দিয়ে শাসন করে না; সে ডেটা দিয়ে নজরদারি করে, অ্যালগরিদম দিয়ে মতামত নিয়ন্ত্রণ করে, এবং তথ্যের স্রোতকে নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে নেয়।

প্রযুক্তির যুগে স্বৈরাচার আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে কারণ মানুষ অনেক সময়ই বুঝতে পারে না, সে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। নজরদারি ক্যামেরা নিরাপত্তার নামে স্থাপন হয়, ব্যক্তিগত তথ্য উন্নয়নের নামে সংগ্রহ করা হয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতা “ডিজিটাল শৃঙ্খলা”-র নামে সীমিত করা হয়। এই সবই করা হয় আইন ও নীতিমালার আড়ালে। ফলে স্বৈরাচার আগের মতো নগ্ন নয়; সে এখন সুসজ্জিত, যুক্তিবাদী এবং পরিসংখ্যান-সজ্জিত।

চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা, বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল নজরদারি আইন, ইন্টারনেট শাটডাউন, এসব উদাহরণ দেখায়, ভবিষ্যতের স্বৈরাচার কতটা প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে পারে। কিন্তু এটাও সত্য, এই প্রযুক্তিই আবার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হাতিয়ার হতে পারে, যদি নাগরিকরা সচেতন ও সংগঠিত থাকে।

স্বৈরাচারের ভবিষ্যৎ রূপে আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো জাতীয়তাবাদের নতুন ভাষা। আধুনিক স্বৈরাচার নিজের সমালোচকদের “দেশবিরোধী”, “বিদেশি এজেন্ট” বা “সংস্কৃতিবিরোধী” বলে চিহ্নিত করে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আবেগী সংহতি তৈরি হয়, যেখানে যুক্তি নয়, পরিচয়ই মুখ্য হয়ে ওঠে। এই পরিচয়-রাজনীতিই স্বৈরাচারের জন্য সবচেয়ে উর্বর জমি।

এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে এসে মূল কথাটি আবার স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, স্বৈরাচার কোনো দৈত্য নয় যে তাকে একবার মেরে ফেললেই শেষ। সে একটি প্রবণতা, একটি মানসিকতা, একটি ক্ষমতার আকর্ষণ। তাই তার বিরুদ্ধে লড়াইও একদিনের নয়, একটি আন্দোলনের নয়, একটি দলেরও নয়। এটি একটি প্রজন্মগত লড়াই।

যে সমাজে প্রশ্ন করাকে শিক্ষা হিসেবে শেখানো হয় না, সেখানে স্বৈরাচার ফিরে আসবেই। যে রাষ্ট্রে ভিন্নমতকে সম্মান করা হয় না, সেখানে ক্ষমতা একদিন না একদিন দমনমূলক হয়ে উঠবেই। যে দেশে বিচারহীনতা স্বাভাবিক, সেখানে শাসকরা জানে, ক্ষমতায় থাকলে সবকিছু করা যায়। আর যে সমাজ উন্নয়নের বিনিময়ে স্বাধীনতা ছাড়তে রাজি, সে সমাজ অচিরেই দেখবে, উন্নয়ন আছে, কিন্তু নাগরিক নেই; রাষ্ট্র আছে, কিন্তু মানুষ নেই।

স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র কোনো বিপ্লবী স্লোগান নয়; এটি সচেতন নাগরিকত্ব। নিয়মিত প্রশ্ন করা, তথ্য যাচাই করা, ভিন্নমতের অধিকার রক্ষা করা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিজের পছন্দের শাসক হলেও তাকে জবাবদিহির আওতায় রাখা। গণতন্ত্র মানে শুধু “আমার লোক ক্ষমতায়” এই ধারণা ভাঙতে না পারলে স্বৈরাচার বারবারই ফিরে আসবে।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, স্বৈরাচার পতনের পর সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়টি শুরু হয়। কারণ তখন মানুষ আত্মতুষ্ট হয়, ভাবে কাজ শেষ। কিন্তু প্রকৃত কাজ শুরু হয় তখনই, প্রতিষ্ঠান গড়া, সংস্কৃতি বদলানো, স্মৃতি সংরক্ষণ করা। যারা ভুলে যায়, ইতিহাস তাদের আবার শাস্তি দেয়, একই গল্প, ভিন্ন চরিত্রে।

এই প্রবন্ধের শিরোনাম তাই কোনো অলংকার নয়,“স্বৈরাচার মরে না, বারবার ফিরে আসে”। কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে আরেকটি অঘোষিত সত্য, স্বৈরাচারকে চিরতরে জিততে দেওয়া হয় মানুষের নীরবতায়। মানুষ যখন কথা বলে, প্রশ্ন করে, প্রতিবাদ করে, তখনই স্বৈরাচার সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আমাদেরই, আমরা কি শুধু ইতিহাস পড়বো, নাকি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবো? স্বৈরাচার বারবার ফিরে আসে, কিন্তু সচেতন সমাজ চাইলে তাকে বারবারই পরাজিত করতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও কবি, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন। 

এমএসএম / এমএসএম

বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান

ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ

জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো

পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়

ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়

বেগম খালেদা জিয়া: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস

স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে বিবেক ও নৈতিকতা

সংকট কালের স্থিতিশীল নেতৃত্বে তারেক রহমান

স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তা: তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি

নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারেক রহমানের স্বপ্ন ও বাস্তবায়ন

স্বৈরাচার মরে না, বারবার ফিরে আসে

আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও জনআস্থা: হাদীর রাজনৈতিক দর্শন

গণতন্ত্রে উত্তরণে ঐক্যের বিকল্প নেই