ঢাকা সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৫

আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থা ও বৈশ্বিক বাস্তবতা


রায়হান আহমেদ তপাদার  photo রায়হান আহমেদ তপাদার
প্রকাশিত: ২০-৯-২০২৫ দুপুর ১১:৫৩

এটা অনস্বীকার্য যে মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য আইন তৈরি করা হয়, অন্যভাবে বললে মানুষের অধিকার সুরক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই আইনই মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের সহযোগী উপাদান বা হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে, বিশেষত আইন যখন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়, যাতে অতিবিস্তৃত, অস্পষ্ট এবং অসংগতিপূর্ণ ধারা থাকে কিংবা আইনের দুর্বল ও সিলেকটিভ প্রয়োগ হয়; আইনকে ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যা নির্বিচার আটকের ন্যায্যতা দেয়, মৌলিক স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে এবং বৈষম্যমূলক চর্চাকে উৎসাহিত করে। আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে সেসব দেশে, যেখানে আইনের শাসন ভঙ্গুর, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সীমিত এবং গণতন্ত্রের ঘাটতি থাকে। সম্প্রতি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনটি ভূরাজনৈতিক উত্থানের পটভূমির ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।এটি মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছে। সেই নীতিতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে বিশ্ববাণিজ্য অনেকটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকারগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। মিত্র এবং প্রতিপক্ষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আক্রমণাত্মক বাণিজ্যনীতি তাদের একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে উৎসাহিত করেছে। এমনকি তারা কম শুল্ক নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের জবরদস্তিমূলক মনোভাবের কারণে চীন ও রাশিয়াকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলেছে। ভারতের ওপর তার বাণিজ্য আক্রমণ এবং রাশিয়ার তেল আমদানির অতিরিক্ত জরিমানা আরোপের ফলে নয়াদিল্লির সঙ্গে কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা কৌশলগত সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এটি ভারতকে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করতে উৎসাহিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য সাত বছর পর চীন সফরে গেছেন।এ বিষয়গুলোর অগ্রগতির জন্য সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনের পরিবেশকে নতুন রূপ দিয়েছে। ২০০১ সালে ইউরেশিয়ান সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটি সবচেয়ে বড় সমাবেশ। এতে ১০টি সদস্য রাষ্ট্রের নেতা এবং ১৬টি পর্যবেক্ষক বা সংলাপ অংশীদার দেশের পাশাপাশি ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংস্থা এসসিও বিশ্বের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি প্রতিনিধিত্ব করে এবং বিশ্ব অর্থনীতির এক চতুর্থাংশের পরিচালনায় ভূমিকা রাখে। এ শীর্ষ সম্মেলনটি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তিনি বিশ্বব্যবস্থায় নতুন কোনো বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারেন। সেখানে ট্রাম্পের নীতির দ্বন্দ্বের বিপরীতে সহযোগিতার দিকে বেশি জোর দেবে। ট্রাম্পের পদক্ষেপে সৃষ্ট অস্থির আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে চীন স্থিতিশীলতা এবং আরও দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রস্তাব দিয়েছে। এটি গ্লোবাল সাউথের জন্য এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বরে পরিণত হবে। এই শীর্ষ সম্মেলনটি তার প্রতীকী রূপ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বার্তা, দক্ষিণ সংহতি প্রদর্শন এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে ছিল। কেউ কেউ বলেছিলেন, ‘ভূরাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্নির্মাণের’ লক্ষ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রেসিডেন্ট শির ভাষণে ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আহ্বান জানানো হয়। তিনি বহুপক্ষীয়তার জন্য চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি এটিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জাতিসংঘকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করে তিনি কিছু দেশের পেশিশক্তিমূলক আচরণ প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি বিশ্বব্যাপী স্নায়ু যুদ্ধ থাকার তীব্র নিন্দা করেন, যা বিশ্বকে তাড়া করে চলেছে। তিনি আধিপত্যবাদের বিপক্ষে স্পষ্ট অবস্থান এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের বিরোধিতা করেন। বিশ্বব্যাপী শাসনব্যবস্থা এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। আন্তর্জাতিক আইন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৃহত্তর কণ্ঠস্বর এক করে সব রাষ্ট্রের সমান অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ ঘোষণা করেন তিনি। প্রেসিডেন্ট শি নতুন এসসিও উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছেন। এসসিও সদস্যদের জন্য দুই বিলিয়ন আরএমবি অনুদান এবং ১০ বিলিয়ন ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটি প্রথমবারের মতো উন্নয়ন অর্থ তহবিলের মাধ্যমে এ সংস্থাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে। এটি বিশ্বব্যাপী অর্থব্যবস্থায় চীনের অবস্থানকে দৃঢ় করেছে। শীর্ষ সম্মেলনে জারি করা তিয়ানজিন ঘোষণাপত্রে ন্যায়সঙ্গত বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ সমালোচনা করা হয়েছে। যে সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানের জন্য সংঘাতমূলক পদ্ধতির বিরোধিতা করে তারাই যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছে। তারা একতরফা বলপ্রয়োগমূলক ব্যবস্থা’ প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও রয়েছে। এই সংস্থার মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পদক্ষেপের প্রতি গোপন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে ২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। এগুলোকে জাতিসংঘ সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করা হয়েছে।এতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষ এবং গাজার বিপর্যয়কর মানবিক পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং ফিলিস্তিনি সমস্যার ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তির আহ্বান জানানো হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কথাও স্পষ্ট উল্লেখ ছিল। ঘোষণাপত্রের একটি বড় অংশ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে নিবেদিত ছিল। এটি পাহেলগাম এবং জাফার এক্সপ্রেসে সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা করা হয়েছে।
এ বছরের দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনের আগে প্রেসিডেন্ট  শি এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
বৈঠকে পর উভয় পক্ষের ইতিবাচক বক্তব্য তাদের সম্পর্কের উষ্ণতা প্রতিফলিত করে। অথচ ২০২০ সালে তাদের সম্পর্ক তিক্ততার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। ভারত তার পূর্ব সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির স্বাভাবিকীকরণের জন্য কিছু শর্তযুক্ত করেছিল। তখন চীনারা জোর দিয়ে বলেছিল-দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। ভারতীয়রা এখন চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে ফিরে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। চীন-ভারত সম্পর্কের বরফ গলানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে গত আগস্টে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তির মাধ্যমে কিছুটা নমনীয় হওয়ার পথে ছিল। তিয়ানজিনে দুই নেতার মধ্যে বৈঠকে সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল। ট্রাম্পের ভারতের প্রতি অবমাননাকর আচরণে মোদি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এটি ভারতের জন্য নতুন করে কোনো গতি আনতে পারে। সেই পরিবর্তন কতটা কৌশলগত তা এখন কিছুটা উন্মুক্ত। চীন-ভারত পুনঃসম্পর্ক নিয়ে ভাবাটা ভুল হতে পারে। কারণ তাদের মধ্যে মিল হওয়ার চাইতে ভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। ভারতের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বৈরী মনোভাবের কারণে ভারতের বিরোধীদল মোদি সরকারকে ‘নতজানু পররাষ্ট্র নীতি’ গ্রহণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল। অন্য যে বিষয়টি মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল তা হলো প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। এটি উভয় দেশের সম্পর্ক উন্নত এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের আকাঙ্ক্ষাকে জোরদার করেছে। এটি পাকিস্তানের তার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি স্বাধীন পথ খুঁজে পাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। শেহবাজ শরিফ প্রেসিডেন্ট শি এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। উভয় দেশ তাদের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও দৃঢ় করতে চায়। 
সিপিইসি-এর পরবর্তী পর্যায়ের সূচনা করতে এবং মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা ২০২৫-২০২৯ সালের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন এবং এক ডজনেরও বেশি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বর্তমান উষ্ণতার মধ্যেও চীন-পাকিস্তানের প্রধান কৌশলগত সম্পর্ক অগ্রাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনে আইনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা ও দুর্বলতারও দায় রয়েছে। যেমন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন অনুসারে সেনাবাহিনী, পুলিশ বা রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারে না। বিগত সরকারের শাসনামলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এসব বাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল। আইনি বাধা কমিশনকে রীতিমতো অকার্যকর করে রেখেছিল। এ ছাড়া কমিশনের অস্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, শুধু সুপারিশের ক্ষমতা এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব কমিশনকে দুর্বল করেছে।আইনের দুর্বল প্রয়োগ কিংবা আইন বাস্তবায়নে ব্যাপক ব্যর্থতাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। আইনের দুর্বল প্রয়োগ অপরাধীর জন্য দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরিতে সহায়তা করে। ফলে অপরাধীরা আইন এবং জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থেকে যান। এমন পরিবেশে আইন সুরক্ষার পরিবর্তে নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
আইনি কাঠামোকে মানুষের অধিকার রক্ষায় কার্যকর করতে হলে জনবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবাধিকার ভিত্তিক সংস্কারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। মানবাধিকার ভিত্তিক এবং রূপান্তরমূলক আইনি কাঠামো ছাড়া সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অসম্ভব। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন মনে করে, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার জন্য বেসরকারি খাত, প্রযুক্তি খাত এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার মধ্যে অংশীদারত্ব তৈরির উপায় বের করা উচিত।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক 

Aminur / Aminur