ঢাকা বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

বিদেশি যন্ত্রাংশের নামে রেলে অর্থ লোপাটের ধুম


এসএম পিন্টু photo এসএম পিন্টু
প্রকাশিত: ৩-৬-২০২৬ দুপুর ১২:১৩

দেশের রেলখাতকে আধুনিক ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হলেও বাস্তবে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের কারণে এই খাত আজও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি অরিজিনাল যন্ত্রাংশ সরবরাহের নামে নিম্নমানের দেশীয় বা নকল খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের অভিযোগ দিন দিন উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিদেশি ব্র্যান্ডের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সরবরাহ করা হচ্ছে নিম্নমানের বা নকল পণ্য। এতে যেমন সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে ট্রেন দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
বিশ্বস্ত একাধিক সূত্রের দাবি, কিছু অসাধু ঠিকাদার ও কতিপয় লোভী কর্মকর্তার যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। টেন্ডারে বিদেশি অরিজিনাল যন্ত্রাংশের শর্ত থাকলেও বাস্তবে শতকরা ১০ থেকে ২০শতাংশ আসল যন্ত্রাংশ দেখিয়ে বাকি ৮০ ভাগই নিম্নমানের বা নকল মালামাল সরবরাহ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই যন্ত্রাংশের বাজারমূল্যের চেয়ে ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি দাম আদায় করা হচ্ছে। কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে রাষ্ট্র ও সাধারণ যাত্রীরা।
রেলওয়ের ইঞ্জিন, বগি, ব্রেকিং সিস্টেম, সিগন্যালিং, বিয়ারিং, কাপলিং, ইলেকট্রিক কম্পোনেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের মান নিয়ে কোনো আপস করার সুযোগ নেই। কারণ একটি ছোট যান্ত্রিক ত্রুটিও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। কিন্তু যখন নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়, তখন সেগুলো দ্রুত বিকল হয়ে পড়ে। ফলে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া, ইঞ্জিন বিকল হওয়া, ব্রেক ফেল করা কিংবা সিগন্যাল বিভ্রাটের মতো ঘটনা বাড়তে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলখাতে এই ধরনের দুর্নীতি শুধু আর্থিক নয়, এটি সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত অপরাধ। উন্নত বিশ্বে রেল খাতে ব্যবহৃত প্রতিটি যন্ত্রাংশের মান যাচাই অত্যন্ত কঠোরভাবে করা হয়। সেখানে বাংলাদেশে অনেক সময় কাগজে-কলমে বিদেশি ব্র্যান্ড দেখিয়ে বাস্তবে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে অনেক পুরোনো এলসির কাগজপত্র ও জাল সনদ ব্যবহার করা হয়।
রেলের কর্মরত অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মালামাল গ্রহণের দায়িত্ব ডিসিওএস / ইন্সপেকশনের হলেও  কেনাকাটার শর্তে পোর্ট ইন্সপেকশন বাধ্যতামূলক না করে শুধুমাত্র ইউজার বা ভোক্তা টেস্টকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে ব্যবহারকারী কতিপয় কর্মকর্তা মোটা অংকের কমিশনের বিনিময়ে নকল ও নিম্নমানের যন্ত্রাংশকে আসল বলে সার্টিফাইড করে। আর সেই নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে অনেক ইঞ্জিন ও কোচ নির্ধারিত সময়ের আগেই বিকল হয়ে পড়ে। এতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অথচ অরিজিনাল যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হলে দীর্ঘ সময় সেগুলো কার্যকর থাকত এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমে যেত।
সূত্র জানায়, বিদেশি মালামাল সরবরাহের জন্য সিসিএস দপ্তরে ৩৫টি প্রতিষ্ঠান (কম/বেশি) তালিকাভুক্ত আছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া সকলেই নকল যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে থাকেন বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে। 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার জানান, যন্ত্রাংশ কেনাকাটা থেকে রিসিভ করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত পরিমান ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না দিলে ভালো মানের যন্ত্রাংশকেও বিভিন্ন অযুহাতে খারাপ প্রমান করে হয়রানি করতে চায়, আর ঘুষ দিলে নিম্নমানের মালামালও সহজেই চালানো যায়। ফলে অনেকে ঘুষ দিয়ে নকল যন্ত্রাংশ সরবরাহ করতে বাধ্য হন। অপর একটি সূত্র জানায় পোর্ট দিয়ে আমদানি করা যন্ত্রের সরকারি শুল্ক,ভ্যাট, ট্যাক্স পরিশোধের পর দাম অনেক বেশি হয়ে থাকে বলে কেউ কেউ চোরাই পথে যন্ত্রাংশ আনার কথাও জানান। 
পোর্ট ইন্সপেকশন না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে ইন্সপেকশনের দায়িত্বে থাকা জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (ডিসিওএস) এম এ মুহিত বলেন, যন্ত্রাংশ গ্রহণ করে মান যাচাইয়ের জন্য ইউজারের নিকট পাঠানো হয়। ইউজার সন্তুষ্ট হলে আমরা পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করি। এক্ষেত্রে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ গ্রহণ করে ভালো মানের স্বীকৃতি দিলে তার দায়ভার ভোক্তার।
এবিষয়ে পাহাড়তলী ক্যারেজ এন্ড ওয়াগন মেরামত কারখানার ম্যানেজার রাজিব দেবনাথ বলেন, সেম্পলের যন্ত্রাংশগুলো মেশিনের মাধ্যমে টেস্ট করা হলেও শতভাগ করা হয় না। তবে আমরা নকল পণ্য গ্রহণ ও ব্যবহাওে সর্বোচ্চ সতর্ক। কেউ এরক কাজে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু ঠিকাদারদের দায়ী করলে হবে না। যেসব কর্মকর্তা নিম্নমানের যন্ত্রাংশ বুঝে গ্রহণ করেন কিংবা কমিশনের বিনিময়ে নীরব থাকেন, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাবকে পুঁজি করেই এই সিন্ডিকেট শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
রেলখাতে এই অনিয়ম বন্ধে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, বিদেশি যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান যাচাইয়ে পোর্ট ইন্সপেকশন বাধ্যতামূলক করতে হবে। পোর্ট থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে যাবে যন্ত্রাংশ মাঝে কোথাও নামলেই ভেজালে আশঙ্কা থাকবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি যন্ত্রাংশ ব্যবহারের আগে স্বাধীন টেকনিক্যাল টিমের মাধ্যমে পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ই-জিপি ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে সরবরাহ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে হবে। চতুর্থত, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ অডিট ও মনিটরিং ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা জরুরি।
এবিষয়ে জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এম আর মনজু বলেন, রেলে বিদেশি যন্ত্রাংশের নামে স্থানীয় ও নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহের মাধ্যমে অথ্য আত্মসাতের বিষয়টি দীর্ঘদিন যাবৎ শুনে আসছি। তবে এখন যেহেতেু গণমানুষের দল বিএনপি সরকার পরিচালনা করছে তাই এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ। তাছাড়া সকল অনিয়ম বন্ধে কমিশন বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরো কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। অনেক সময় মালামাল না দিয়ে বিল তুলে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও ওঠে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরো সতর্ক হওয়া উচিৎ। 
রেল দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও জনজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই খাতকে দুর্নীতি ও লুটপাটের জায়গায় পরিণত করা মানে জনগণের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া। বিদেশি অরিজিনাল যন্ত্রাংশের নামে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করে যারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় রেলের আধুনিকায়নের স্বপ্ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর জনগণকে দুর্নীতির ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

এমএসএম / এমএসএম

রায়গঞ্জে প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

রাণীনগরে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে দুই ভাইয়ের বসতবাড়ি পুড়ে ছাই

মনপুরায় জমি বিরোধের জেরে পুকুরে বিষ প্রয়োগ, মাছ নিধনের অভিযোগ

নওগাঁ-নাটোর মহাসড়কে এসপি তারিকুল ইসলামের বিশেষ টহল ও আত্রাই থানা পরিদর্শন

নরসিংদীতে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতিফলক ‘বাংলার ঈগল’-এর উদ্বোধন

পেকুয়া পৌর ভবনের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার

বিদেশি যন্ত্রাংশের নামে রেলে অর্থ লোপাটের ধুম

খালিয়াজুরীতে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জাল জব্দ

মধুখালীতে নাহিদ ইলেক্ট্রনিক্স এর আয়োজনে ঈদ স্পেশাল লাকি কুপন এর ড্র অনুষ্ঠিত

যমুনা সেতুতে ঈদ পরবর্তী সর্বোচ্চ যানবাহন পারাপার

হাটহাজারীতে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে দুস্থদের মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ছিনিমিনি খেলার ষড়যন্ত্র এদেশের মানুষ হতে দেবে না

মুকসুদপুর রাতের আঁধারে বসতবাড়ির দেয়াল ভাঙচুর ও গাছ কাটার অভিযোগ