ঢাকা সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

কক্সবাজার পুলিশ সুপার কার্যালয়

বাস কোম্পানির চাঁদায় চলে এসপি অফিসের চা খরচ


শাহেদ ফেরদৌস হিরু photo শাহেদ ফেরদৌস হিরু
প্রকাশিত: ৭-৬-২০২৬ রাত ৮:৪০

পর্যটন নগরী কক্সবাজারে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন প্রবেশ করে অন্তত ৭০টি পরিবহন কোম্পানির বাস। এসব বাসের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে ‘চা খরচ’ ‘ ‘পার্কিং ফি’ কিংবা ‘ম্যানেজমেন্ট খরচ’ এর নামে প্রতি মাসে প্রায় ৬ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে। 
একাধিক বাস কোম্পানির প্রতিনিধি, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং পুলিশ সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসের সংখ্যা ও কোম্পানির আকার অনুযায়ী প্রতি মাসে ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের ফোন করে তাগাদা দেওয়া হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির প্রতিনিধি জানান, প্রতি মাসের ১ থেকে ৫ তারিখের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে টাকা না দিলে রেকার চালক সুকর্ন এবং অনলাইন বাস টার্মিনাল (ওটিবি) এর এডমিন ফোন করে যোগাযোগ করেন। বাস কোম্পানির একজন প্রতিনিধি বলেন, প্রতি মাসেই নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে বিভিন্নভাবে চাপ আসে। পরে কলাতলী মোড়ে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক সদস্যদের কাছে টাকা পৌঁছে দিতে হয়। আরেকজন পরিবহন প্রতিনিধি বলেন, এটাকে সবাই এক ধরনের নিয়ম হিসেবেই ধরে নিয়েছে। নতুন কোনো কোম্পানি এলেও কিছুদিন পর তাদের কাছেও টাকা চাওয়া হয়। 
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং জেলা পুলিশ সুপার উভয়েই একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেন। তারা বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তাদের এই বক্তব্যকে দায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছেন অনেকেই। কারণ, অভিযোগের তীর যেখানে খোদ জেলা পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিকেই নির্দেশ করছে, সেখানে তদন্তের দায়িত্বও যদি একই প্রশাসনের হাতে থাকে, তাহলে সেই তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য হবে সেই প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অভিযোগ যখন পুলিশ সুপার কার্যালয়কেন্দ্রিক আর্থিক অনিয়ম ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে, তখন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তদন্তে সত্য উদ্ঘাটনের সম্ভাবনা খুবই সীমিত। তাদের মতে, “নিজেদের বিরুদ্ধে নিজেরা তদন্ত করলে স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। ফলে তদন্তের ফলাফল নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাবে। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে অর্থ আদায় করা হয়। কারও কাছ থেকে ৩ হাজার, কারও কাছ থেকে ৫ হাজার, আবার বড় পরিবহন কোম্পানির কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। বাস মালিক ও প্রতিনিধিদের অভিযোগ, আদায়কৃত অর্থের কোনো সরকারি রসিদ বা লিখিত হিসাব থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে ‘পার্কিং ব্যবস্থাপনা’ বা ‘ট্রাফিক সমন্বয়’-এর কথা বলা হলেও অর্থ গ্রহণের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নেই। একজন পরিবহন ব্যবসায়ী বলেন, যদি এটি বৈধ পার্কিং ফি হয়, তাহলে রসিদ কোথায়? সরকারি কোষাগারে টাকা জমা হওয়ার প্রমাণ কোথায়? তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এ ব্যবস্থার কারণে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপরও পড়ে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, বাস মালিকদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়। তার ভাষ্য, প্রায় ৬ লাখ টাকার মতো আদায় হয়। ভেতরে ভেতরে সবাই জানে এ টাকা আসে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। অনেকে এটাকে এসপি অফিসের চা-নাস্তার খরচ বলেও উল্লেখ করেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি সত্যিই কোনো সরকারি ফি আদায় করা হয়ে থাকে, তাহলে তা কোন বিধিমালার আওতায় নেওয়া হচ্ছে এবং কোথায় জমা হচ্ছে সেই তথ্য প্রকাশ করা উচিত। স্থানীয় সুশীল সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি বলেন, বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশ সদর দপ্তর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত করা প্রয়োজন। একজন নাগরিক নেতা বলেন, যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু অনিয়ম নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি গুরুতর উদাহরণ। আর যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, তাহলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার। জানা গেছে, কলাতলী মোড় দিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ইউরো কোচ, গ্লোডেন কোচ, গ্রীণ কোচ, হানিফ সুপার, হানিফ ভলভো, হানিফ ইউরো, বাংলা পরিবহন, হিমাচল, সুপার পরিবহন, জিদ্দা এক্সপ্রেস, হানিফ পরিবহন, সেন্টমার্টিন, কিশোরগঞ্জ ডিলাক্স, লাল সবুজ, দেশ ট্রাভেলস, লন্ডন এক্সপ্রেস মিয়ামি, এস সি ভিউ, রবি এক্সপ্রেস, আইকনিক এক্সপ্রেস, এস আল মিজান, আমার এক্সপ্রেস, এরাবিয়ান,এশিয়া এয়ারকন, হানিফ পরিবহন, আয়ান পরিবহন, বাঁধন, বিপুল এক্সপ্রেস, বলেস্বর পরিবহন, রয়েল কক্স, সেন্টমার্টিন ক্লাসিক, এবারগ্রীন, কক্স এক্সপ্রেস, তিশা, এয়ার ট্রাভেল, দোয়েল এক্সপ্রেস, আকুশী এক্সপ্রেস, ইমাদ পরিবহন, স্বাধীন পরিবহন, সৌদিয়া পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, মারছা, ইমপেরিয়াল এক্সপ্রেস সহ আরো অনেক বাস কোম্পানির কাছ থেকে নেওয়া হয় মাসোহারা। বরাবরের মতই অভিযোগ অস্বীকার করেন কক্সবাজার সদর ট্রাফিক পুলিশের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (এডমিন)। তবে বক্তব্য নেওয়ার পর বিভিন্ন জনের মাধ্যমে নিউজ বন্ধ করার জন্য মোটা অংকের টাকা নিয়ে তদবির করেন তিনি। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে আমরা ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছি। যদি এ ধরনের কোন সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে কক্সবাজার পুলিশ সুপার এ. এন. এম. সাজেদুর রহমানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে সংযোগ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা বলছেন, কক্সবাজারে পরিবহন খাতকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কথিত মাসোহারা ব্যবস্থার অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার পরিবহন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বক্তব্যে বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত। কারণ, রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগ শুধু একটি দপ্তরের নয়, পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

Aminur / Aminur

বাস কোম্পানির চাঁদায় চলে এসপি অফিসের চা খরচ

ডিপফেক ও এআই প্রযুক্তি চ্যালেঞ্জে এমএস-১৩ গ্যাং এর আদলে অপরাধীরা সক্রিয়

বিসিকের অসংতিপূর্ণ টেন্ডার কার্যক্রম!

কুরিয়ারে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে জাল টাকা

শুল্কফাঁকি দিয়ে অ’বৈধ বাজাজ সিএনজি আমদানির নামে শত কোটি টাকার মালিক এখন হাজী আব্দুর রশিদ বুলু

যৌন সহিংসতা - সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার তীব্র সংকটে বাংলাদেশ

প্রাণীসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপ দিতে কাজ করছে সরকার : শাহজামান খান

দলিল বাণিজ্যের অন্দরমহল

ঢাকার সড়কে "এআই নজরদারি": ডিজিটাল মামলার ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ট্রাফিক চিত্র

ব্লাডব্যাংকের নামে মরন ফাঁদ, মিছে বাঁচার আশা

জালিয়াতির মাধ্যমে বিআরটিএ’র দালাল রুবেল এখন কোটিপতি

পেঁয়াজ কেলেঙ্কারিতে স্টান্ড রিলিজের পর বহাল তবিয়তে বনি আমিন খান

জাগৃক এর প্রধান অফিস থেকে নথি গায়েব চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে অভিযুক্তকে বাঁচানোর চেষ্টা